‘প্রধানমন্ত্রীর কি জামা কাপড় নেই? সর্টস পরে কেন?’

জাগুলিয়া কেন আজ কেন সাতসকালে এমন করে জেগে উঠল বোঝা যাচ্ছে না। কোন ডেসিবেলের তোয়াক্কা না করে গাঁ গাঁ করে মাইক বাজছে। সব ছাপিয়ে ভাঙা রেকর্ডের মত একটা কথাই বার বার বেজে চলেছে ‘অদ্যই শেষ রজনী’। ভাদ্রমাসের মাঝামাঝি সময়ে কীসের শেষ রজনী এবং কেন ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। এক সময় ঘোষপাড়ার মাঠে সার্কাসের তাঁবু পড়ত। সেখানে শেষ সাতদিন এই কথাটাই শোনা যেত দর্শকদের অনুরোধে –‘অদ্যই শেষ রজনী’। এই ভরা বর্ষায় সার্কাসের কোনও কথাই উঠছে না।

বেলা একটু বাড়তেই ধাঁধাটা খোলসা হল। পদ্মনিধি মণ্ডল পদ্মফুলের পতাকা উড়িয়ে আর সঙ্গে যোগাসনে উপবিষ্ট নরেন্দ্র মোদীর ফ্লেক্স টানিয়ে বলে চলেছে ‘অদ্যই শেষ রজনী’। মোবাইলে আধার নম্বর ঢোকান। পাশ থেকে একজন বলল, আধারে মোবাইল। পদ্ম তেতে উঠে বলল ওই হল। ঢোকানো দিয়ে কথা।

এতক্ষণে পদ্মনিধি গতে এল। ‘ভারতমাতার সু-সন্তান নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি নাগরিক মরার পর যাতে স্বর্গে যেতে পারে এই জন্য আধার কার্ড চালু হয়েছে। আধার হল জিলিপি ভাজার হাতার মত। সমাজ জীবনের সব দুর্নীতি ছেঁচে তুলে ফেলে দেবে। তখনই সবাই পূর্ণবান হবে। অদ্যই শেষ রজনী।

 
সাতসকালে পদ্ম-র এই গাঁগাঁ ভাষণে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তিরিক্কি মেজাজে শয়নকক্ষ থেকে উঠোনে লাফিয়ে পড়ল পাঁচু ঘোষ। জমানা বদলের পর পঞ্চানন ওরফে পাঁচুকে সবাই ঘাসফুল ঘোষ বলেই ডাকে। সংক্ষেপে ঘেসো ঘোষ। আমি গোল কিপার। আমাকে ফাঁকি দিয়ে বল ঢোকাবি।

এমন সময় পদ্মনিধির অটো থেকে গান বেজে উঠল। ‘হৃদমাঝারে রাখবো/ ছেড়ে দেবো না’। আধার কার্ড বা নরেন্দ্র মোদী যাকেই পাবলিক হৃদমাঝারে রাখুক তাতে দলের কোনও ক্ষতি নেই। এই গান কানে পৌছতেই ঘেসো ঘোষ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। এখন আর দেরি নয় ধর গো তোরা/ হাতে হাতে ধর গো। উঠানে দাঁড়িয়েই ঘেসো চেঁচিয়ে উঠল – পদ্ম তোদের গরু মারা বিদ্যে আজ আমি কাজে লাগাব।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘেসো ঘোষের অটো পথে নামল। সামনের ফ্লেক্সে ঘাসফুলের ছবি। মাঝখানে একটি গরু। তার মুখে শ্লোগান ‘মোবাইল নাই/ আধার চাই’।  একেবারে তলায় সৌজন্যে পঞ্চানন (ঘেসো) ঘোষ। সেই অটোতে গান বাজছে ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে তখন আপনি…’।

সাতসকালে ঘুম ভাঙা বাঙালি পলেটিশিয়ানদের ধাতে নেই। পদ্ম আর ঘেসোর কলরবে ঘুম চটকাল মলয় মিত্রের। গোটা এলাকায় অনেক দিন ধরেই তিনি মাকু মিত্তির নামে পরিচিত। গর্জাতে গর্জাতে মাকু বলল – ঘেসো তুই গোলকিপার, পদ্ম রাইট আউট। কিন্তু ভুলে যাচ্ছ না আমি সেন্টার ফরোয়ার্ড। তুই পদ্মকে আটকাবি। সেই ফাঁকে আমি গোলে বল গলাব। ওলা উবেরের ম্যাপে জাগুলিয়ার বগালামুখী মন্দিরও ঢুকে পড়েছে। আধারের হাত ধরে এবার সিআইএ-র ক্যামেরা বাসরঘরে ঢুকবে।

পড়তি বাজারে মাকুর হাতে তেমন কোনও মুখ নেই। একবার ভেবেছিল কার্ল মার্কসের ছবি রাখবে অটোর সামনে। কিন্তু তাতে অনেকে চুল দাড়ি সমেত পাড়ার জগা পাগলা বলে ভুল করতে পারে। গণসঙ্গীত ছাড়া মাকুর কোনও কিছুতেই রুচি নেই। তার অটোতে গান বাজল – ‘মাউন্টব্যাটন সাহেবও/ তোমার সাধের ব্যাটন কার হাতে থুয়া গেলাও’।

একটা সময় ফুটবল খেলার জন্য জাগুলিয়ার স্পোর্টিং ক্লাবের খুব নামডাক ছিল। সেই সময় দলের তিন তারকা হল পঞ্চনন, পদ্ম আর মলয়।  যেদিন জেলার সেরা ট্রফি জগত্তারিণী মেমরিয়াল শিল্ড নিয়ে তারা পাড়ায় ঢুকেছিল ব্যান্ড বাজিয়ে সেদিনই পাড়ার তিন কন্যা কল্পনা, মালতী আর চামেলির মন কেড়ে নিয়েছিল ওরা তিনজন।

সেদিন ওদের সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। ওরা তখন হরিহর আত্মা। মাইকের সামনে সেন্টার ফরোয়ার্ড মাকু বলেছিল ‘গোল আমি করেছি কিন্তু পদ্ম তোলাই পাশটা না দিলে, আমি তা পারতুম না।’ পদ্ম বলেছে – ‘পাঁচু যদি তিনটা গোল না আটকাতো তাহলে আমরা গো-হারান হারতাম। জবাবে পাঁচু বলেছিল – গোল আটকানোই গোলকিপারের কাজ। কিন্তু আমরা জিতেছি। পদ্ম আর মাকুর জন্য।

প্রেমের সুবাস ধামাচাপা দেওয়া যায় না। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই তিন ছেলে আর তিন মেয়ের অভিভাবকরা বৈঠকে বসেন। স্থির হয় গোত্র আর পাল্টি ঘর মিলিয়ে তিনটি বিয়ে পাকা করা হবে। সেই ছকেই একই লগ্নে কল্পনা+মাকু, মালতি+ঘেসো, আর চামিলী+পদ্ম-কে তিন দোলনায় দুলিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের মতে এটাই ভারতের প্রথম গণবিবাহ। এখন তিন জনেই স্বামীদের দলের মহিলা নেত্রী।

বেলা বাড়তেই জাগুলিয়া ত্রিমুখী প্রচারে বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। সকলেরই লক্ষ্য শপিং মল। সেখানে চীরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভোডাফোন আর এয়ারটেলের অফিস। পদ্ম’র মিছিল যখন এগোচ্ছে রাস্তা থেকে প্রশ্ন উড়ে এল – ‘প্রধানমন্ত্রীর কি জামা কাপড় নেই? সর্টস পরে কেন?’

–ওরে গাধা, যোগাসনেই মুক্তি।

তৃণমূলের মিছিল এগোতেই একজন হেঁকে উঠল – ‘ঘেসোদা তুমিও গরু ধরলে!’

-উল্লুক সাবজেক্টটা বোঝার চেষ্টা কর। ওরা বলেছিল গরুর কানে আধার ঝোলাবে। কোথায় সেই কার্ড?

বাম মিছিল এগোতেই আবার প্রশ্ন – ‘মাকুদা তোমার ফ্ল্যাগের তারা কোথায় খসে পড়ল?’

-আর মানুষ হবি কবে? এটা আমাদের পার্টির ফ্ল্যাগ। এতে কেবল কাস্তে হাতুড়ি। আমরা তারা ছড়াই ভোটের বাজারে।

মিছিল এগোতেই শুরু হল ত্রিমুখী ভাষণ। দেখতে দেখতে পদ্মের পাশে এসে হাজির হল সকেট চট্টপাধ্যায়। ঘেসো ঘোষ উসখুস করছিল। তাকে অভয় দিয়ে হাজির হল দেবাদিত্য। মাকুও পিছিয়ে নেই। এই পড়তির বাজারে মুখ রাখতে সে পুরনো আমসত্ত্ব বরুণ মজুমদারকে জুটিয়েছে।

সর্বদলীয় চোখ মারা হজম করে সকেট আহ্লাদে আটখানা। মেয়েরা দেবাদিত্যর শরীরের যে-কোনও জায়গা ছোঁয়ার জন্য হুটোপুটি করছে। বরুণ মজুমদার বলে চলেছেন এই আহ্লাদ চিরদিনের নয়।

এই সময় মাকু লক্ষ্য করল, ঘেসোর বউ মালতী মন দিয়ে তার ভাষণ শুনছে। পদ্মের বউ চামেলি শুনছে ঘেসোর ভাষণ। আর মাকুর বউ কল্পনা হাঁ করে তাকিয়ে আছে পদ্মের দিকে। তিনজনের চোখেই একই ভাষা – কতদিন দেখিনি তোমায়।

আসলে এই তিনটে বিয়ে যখন হয় তখন মেয়েদের পছন্দের কথা কেউ আমলে আনেননি। গোত্র আর পাল্টি ঘরের গেরোয় পুরো ব্যাপারটা অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য সমাবেশের উত্তেজনা তুঙ্গে উঠল। কারণ পরের বউয়ের আগ্রহ দেখে উৎসাহী হয়ে তিন জনেই ভাষণের তুবড়ি ছোটাল।

এই গরম কীর্তন যখন চলছে তখন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভোটাফোন আর এয়াটেলের লোকাল এজেন্টরা একটি বিষয়ে এক মত হল, ‘ব্যবসা কাল হবে, আজ ঝাঁপ বন্ধ কর।’

Developed by DXDasia