
রবীন্দ্রনাথকে জানালেন, ‘এখানে আপনার এই যে এত ঘরবাড়ি হয় তার কলাকুশলী হিসেবে ওদের একটু ধরে রাখলাম’
রামকিঙ্কর বেইজ মানে ভারতের শিল্পকলার ইতিহাসের এক পালাবদলের যুগ। শান্তিনিকেতনে এসে রবি ঠাকুরের সান্নিধ্যে প্রথম যে বীজমন্ত্র তিনি পেয়েছিলেন তা হল – পিছনে ফিরে দেখিস না। সেই থেকেই শিল্পীর এগিয়ে যাওয়া। শুধু তাই নয় একই সঙ্গে একের পর এক প্রথা ভাঙার দুরন্ত প্রয়াস। সেটা এমন একটা যুগ যখন রাস্তার মোড়ে ভাস্কর্য বা মূর্তি রাখলে তা হত মূলত রাজা দেশনায়ক বা সেই জাতীয় কোনও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির। কিন্তু রামকিঙ্কর যখন চলার পথের ধারে মূর্তি বসাচ্ছেন তখন দেখা যাচ্ছে রামকিঙ্করের বিষয় হয়ে উঠেছে সাধারণ এক দল সাঁওতাল মানুষজন। এ এক দুরন্ত দিকবদল। তাঁর গুরু নন্দলাল বসু কিঙ্করবাবুর এই বিখ্যাত সাঁওতাল পরিবার ভাস্কর্যটির ছবি এঁকে রেখেছিলেন। পাশাপাশি আমরা যদি তাঁর ভাস্কর্যগুলির মাধ্যম দেখি তাহলেও লক্ষ্য করব এক অসামান্য দিকবদল। আগে ভাস্কর্য নির্মাণ বলতেই কাঠ পাথর বা ব্রোঞ্জ ঢালাইয়ের কথা ভাবা হত। কিন্তু সাঁওতাল পরিবার বা কলের বাঁশিতে উদ্ভাসিত হল নতুন মাধ্যমের নিজস্ব ভাষা। ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলের বিপুল খরার জন্য তখন দলে দলে সাঁওতাল মানুষগুলি কাজের খোঁজে বর্ধমানের দিকে যাত্রা করেছে। ছিন্নমূল মানুষের এই লেবার মাইগ্রেশন হয়ে উঠল রামকিঙ্করের বিষয়। রামকিঙ্কর জানতেন যে মোরামে ঢাকা খোয়াই এর চরাই-উৎরাই পেরিয়ে আসা এই মানুষগুলির চলার পথটিও যেমন রুক্ষ একই ভাবে তাদের জীবনযাত্রাকেও গ্রাস করেছে রুক্ষতা। জীবনের এই রুক্ষতাকে মার্বেল পাথরের পিছল পেলপ মাধ্যম দিয়ে প্রস্ফুটিত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি সিমেন্ট কাঁকরের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন তাদেরই পায়ের তলার মোরামের মাটিকে। ভাস্কর্য নির্মাণে মাধ্যম ব্যবহারে শুধু যে অভিনবত্ব এল তা নয়, পাশাপাশি মাধ্যম হয়ে উঠল শিল্পের ভাষা। রামকিঙ্করের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভাবনাগুলিই ছিল এই রকম। একবার রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের একটি বাড়ির দেওয়ালের দুপাশে রামকিঙ্কর সাঁওতাল নারী ও পুরুষের মূর্তির রিলিফ করলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানালেন, এখানে আপনার এই যে এত ঘরবাড়ি হয় তার কলাকুশলী হিসেবে ওদের একটু ধরে রাখলাম। এ-থেকেই রামকিঙ্করের মানবিক দিকটি সম্পর্কে আমরা একটি দিশা পাই।
মানুষটি প্রতিবাদীও ছিলেন। একবার শান্তিনিকেতনের মেয়েদের হোস্টেলের সামনে একটি মূর্তি করার বরাত পেলেন। খসড়ায় বানালেন একটি ফোয়ারা যাকে ঘিরে রয়েছে মৎস্যকন্যার দল। বিশ্বভারতীর কর্তাদের পছন্দ হল না অমন নগ্ন মৎস্যকন্যাদের ফোয়ারার কল্পনা। তারা তাঁর খসড়া বাতিল করে দিলেন। প্রচুর গঞ্জনাও জুটল রামকিঙ্করের কপালে। তিনি নকসার বদল ঘটালেন। দেখা গেল ওপর দিকটায় মোষের দল আর লেজের দিকটায় মৎস্যকন্যাদের লেজ। আজও মূর্তিটি অবিকল সেই রকমই আছে। কিন্তু আড়ালে রয়ে গেছে রামকিঙ্করের একটি ক্ষোভের কথা। গল্পটি এই রকম। একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে মূর্তিটি দেখিয়ে রামকিঙ্করকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন বিষয়টা কী? কিঙ্করবাবু উত্তরে জানিয়ে ছিলেন নিচের দিকটা আমার মর্জি আর উপর দিকটা কর্তাদের।
ঋত্বিক ঘটকও ঠিক একই প্রশ্ন করেছিলেন একটু ধমকের সুরে। কিন্তু উত্তরটা ছিল ভিন্ন।
