কলকাতার নতুন অতিথি ‘বর্ণালি’ পাখি

বর্ণালির বড় রঙিন লেজ দেখে নাকি ঈর্ষায় ভুগত ময়ূরও

এই বছরই এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এক বিশেষ অতিথির আগমন হয়েছিল শহরে। পক্ষী প্রেমিকদের চমকে দিয়ে, শহরের মাঝে রবীন্দ্র সরোবরের বাগানে।  পাখিটির নাম ‘ইন্ডিয়ান পিত্তা’। বাংলা নাম ‘বর্ণালি’। তার জন্য একটি দুটি নয় – প্রায় শ’খানেক ক্যামেরা নিয়ে পিছু নিয়েছিল পক্ষীপ্রেমিকদের দল।

মাত্র ১৮ থেকে ২০ সেমি লম্বা মোটা শরীর। নামের সঙ্গে সঙ্গত দিয়েছে তার গায়ের রং। যেন রামধনু আঁকা। গাঢ় নীল সবুজ কালো সাদা, গলার দিকটা হলুদ বাদামি। আর থুতনিটা ক্রিমসেন ব্রাউন রং-য়ের। পাখার উপরে ও লেজের গোড়ায় ক্রিমসেন রেডের ছোপ। এই রঙের ছটা দেখে মনে হয় যেন শিল্পী তাঁর তুলি দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছেন বর্ণালিকে।

শ্রীলঙ্কায় এই পাখি নিয়ে লোকপ্রচলিত গল্প শুনতে পাওয়া যায়। আগে এই পাখির নাকি বড় রঙিন লেজ ছিল। আর ময়ূরও নাকি সেই লেজ দেখে ঈর্ষায় ভুগত। একদিন এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ময়ূর পিত্তার কাছে রঙিন এই লেজ দেওয়ার আবদার করে। পিত্তা সেই লেজ ময়ূরকে দিয়ে দেয় কিন্তু বিশ্বাসঘাতকের মতো সেই লেজটি আর ফিরত না দিয়ে পিত্তার সঙ্গে বন্ধুত্ব ভেঙে দেয় ময়ূর। হতাশ হয়ে পিত্তা জঙ্গলের সবাইকে জানায়। কিন্তু কেউ তার প্রতিকার করে না। তখন পিত্তা সবাইকে জানায় যখন গৌতম বুদ্ধ আসবেন তখন তাঁর কাছে অভিযোগ করবে সে।

তামিলনাড়ুতে এই পাখি ‘আরুমানি কুরুভি’ অর্থাৎ 'সিক্স ও-ক্লক বার্ড' নামে পরিচিত। পালকের রঙের বাহারের জন্য ‘নবরং’ নামেও পরিচিত।

পিত্তার দেখা মেলে গভীর জঙ্গলে। জঙ্গলের মাটিতে শুকনো পাতা সরিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পোকা খুঁজতে এরা ভালোবাসে। তাদের দীর্ঘ ও দৃঢ় পা এই কাজে সহায়তা করে। খুবই লাজুক প্রকৃতির, তাই শব্দ শুনলেই নিঃশব্দে উড়ে যায় গাছের ডালে। এরা নিজের নিজের এলাকার বাসা বাঁধতে ভালোবাসে। রেন ফরেস্টই এদের প্রজনন স্থল। হিমালয়ের ঢালে অত্যধিক ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই উড়ে আসে দক্ষিণ ভারতে, শ্রীলঙ্কায়। এছাড়া বাংলাদেশ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতেও এদের দেখা মেলে। এই পাখি দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করতে অভ্যস্ত। তারপর শীত কমলেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আবার ফিরে যায় নিজের বাসস্থানে। এই ফেরার পথেই দেখা মেলে ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। 

পাখিটি ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়ান পিত্তা’, ‘পিত্তা’ শব্দটি এসেছে তেলেগু ভাষা থেকে। এর অর্থ ছোট পাখি। অনেক সময় জঙ্গলে এদের দেখা না পেলেও ডাক শোনা যায়। সাধারণত, সকাল ও সন্ধ্যা খুব উচু স্বরে টু-নোট হুইসেলে ডাকে।

কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরে পিত্তার দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি আমার। তবে ঠিক সময় পিত্তা দর্শনের সুযোগ এল এক বন্ধু মারফত। পিত্তার নাকি দেখা মিলেছে নদিয়াতে। কলকাতা থেকে প্রথমে ট্রেন, তারপর অটোয় চেপে আমরা পৌঁছোলাম গন্তব্যস্থলে। উঁচু উঁচু গাছে ঢাকা এই জঙ্গলের ঘনত্ব খুব বেশি। মাঝে মাঝে গাছের ফাঁক দিয়ে আলোর উঁকিঝুঁকি। জঙ্গলের ঘনত্ব বেশি হওয়ার জন্য সকালও প্রায়ান্ধকার। ছোটবড় কাঁটাগাছের ভিড়ে চলাফেরা করা খুব কঠিন। কিন্তু চারঘণ্টা ধরে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরেও পিত্তার দেখা পেলাম না। হয়তো পরিশ্রান্ত পিত্তা এগিয়ে গেছে তার আসল বাসস্থানের দিকে। সেদিনের মত ফিরে এলাম। ঠিক হল আবার আসব। 

দ্বিতীয় দিনের যাত্রা শুরু হল। সঙ্গে আমার বন্ধু অভিজিত রায় ও অভিজ্ঞ পক্ষীপ্রেমিক বিজয় অধিকারী। প্রথম দিনের ব্যর্থতায় মনের মধ্যে ঝড় বইছিল। আজ কি দেখা পাব? জঙ্গলে যখন পৌঁছলাম তখন সকাল ৮.৩০। প্রায় ২৫-৩০ মিনিট ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি কিন্তু পিত্তার দেখা নেই। মনে মনে ভাবলাম, ভাগ্য এখনও প্রসন্ন হয়নি। তবুও এগিয়ে চললাম। হঠাৎ আমাদের কানে এল একটি ডাক। মন আনন্দে নেচে উঠল। এ তো ইন্ডিয়ান পিত্তা’র ডাক! আমরা কাঁটাঝোপের মধ্যে দিয়ে পাগলের মতো এগিয়ে চলাম। মনে মনে বললাম, আজ দেখবই তাকে। কাছে যেতে যেতে শুনতে পেলাম, দু’জোড়া পিত্তা দুদিক থেকে ডাকছে। কিন্তু দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর ডাক বন্ধ হয়ে গেল। হতাশা আমাকে পেয়ে বসছে। কিন্তু হঠাৎই আরও উচ্চস্বরে ডেকে উঠল পিত্তা। আন্দাজ প্রায় ২০০ ফিট দূরের এক উঁচু গাছের মগডালে বসে। আমার সঙ্গী বলল তাড়াতাড়ি রেকর্ড শর্টটি নিয়ে নিতে। কিন্তু এত উঁচু গাছের ডালে পাখিটি বসে আছে যে, ছবি নিতে সমস্যাই হবে। পাখির গায়ের রঙের সঙ্গে নীল আকাশ যেন মিলেমিশে গেছে। মুহূর্তেই উড়ে গেল আরও ঘন জঙ্গলের দিকে। আমরাও ছুটলাম পিছু পিছু। ঘন জঙ্গলের কাঁটাঝোপ ও লতাগাছ আমাদের পথ আটকে দিল। হঠাৎ দেখি একটা বড় সাপ লতানো গাছ বেয়ে উঠে যাচ্ছে পাখির বাসার দিকে খাবারের সন্ধানে। ঠিক সেইসময়ই একটা পিত্তা উচ্চস্বরে ডাকতে ডাকতে অপেক্ষাকৃত নিচু ডালে এসে বসল। নিঃশব্দে এগিয়ে গেলাম। পিত্তার মনোরম ডাক ও অঙ্গভঙ্গি সত্যিই দেখার মত। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। 

পাখিটির গায়ের রঙের ছটায় মেঘলা পরিবেশেও জঙ্গলকে আলোকিত করছে। এই প্রথম আমি সামনে থেকে দেখলাম পাখিটিকে। একের পর এক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলাম। বেশ কিছুক্ষণ এ-ডাল থেকে অন্য ডালে ডাকাডাকি করে উড়ে গেল জঙ্গলের গভীরে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। সবকিছু যেন বায়োস্কোপের ছবির মতো ঘটে গেল আমাদের সামনে। মনকে আশ্বাস দিলাম, আবার দেখা হবে। মনে পড়ল রবি ঠাকুরের গান ‘চোখে আমার তৃষ্ণা…।’ গুনগুন করতে করতে এগিয়ে চললাম ফেরার পথে।

Developed by DXDasia