
আজ ভগিনী নিবেদিতার প্রয়াণ দিবস
১৮৯৮ এর ডিসেম্বরে আমেরিকান দূতাবাসে নতুন ব্রাহ্মবন্ধুদের আমন্ত্রণ করে একটা পার্টিতে নিবেদিতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন সারা বুল। সেদিন মুখোমুখি আলাপ হয় নিবেদিতার সাথে জগদীশচন্দ্রের। প্রথম আলাপেই নিবেদিতার মনে হতে থাকে এই মানুষটার সাথে তার মনের অনেক মিল। নিবেদিতার বয়স তখন ৩১ আর জগদীশের ৪০। কালক্রমে সেই পরিচয় পরিণত হয় বন্ধুত্বে। এক ব্যতিক্রমী বন্ধুত্ব ছিল জগদীশ ও নিবেদিতার, ছিল এক অচেনা গভীর সম্পর্ক।
প্রথম পরিচয়ের দিন কথা প্রসঙ্গে ব্রাহ্মদের অদ্বৈত-তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নিবেদিতা। উত্তরে জগদীশচন্দ্র জ্ঞিজ্ঞেস করেন, “বিজ্ঞানের প্রমাণ চান অদ্বৈত-তত্ত্বের পক্ষে?
“হ্যাঁ চাই।”
“জ্ঞান আর বিজ্ঞানের অনুভব যে অভিন্ন তা বিশ্বাস করেন?”
“উপনিষদে তো সেরকম ইঙ্গিতই আছে।”
জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান-প্রতিভা দেখে নিবেদিতা মুগ্ধ হন। তিনি বুঝতে পারেন পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে জগদীশচন্দ্রের গবেষণার গুরুত্ব অসীম। অবলা বসুর সাথেও বেশ ঘনিষ্ঠতা হয় নিবেদিতার। অবলা শিক্ষিতা, সমাজ-সচেতন, স্ত্রী-শিক্ষার উন্নতির জন্য প্রচুর কাজ করছেন দেখে খুবই ভালো লাগলো নিবেদিতার। সময় সুযোগ পেলেই তিনি জগদীশের বাড়িতে গিয়ে অবলা ও জগদীশের সাথে কথা বলেন। উৎসাহ দেন জগদীশের বিজ্ঞানচর্চায়।
জগদীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই নিবেদিতা বুঝতে পারেন যে হিন্দুধর্মের প্রবল প্রচারক স্বামী বিবেকানন্দের সাথে রবীন্দ্রনাথ বা জগদীশচন্দ্রের সম্পর্ক খুব একটা মাখামাখি পর্যায়ের নয়। বিবেকানন্দের অনেক নীতির সাথে এঁদের মতের মিল নেই। নিবেদিতাকে বিবেকানন্দ কাজ দিয়েছিলেন হিন্দুধর্ম প্রচারের। অথচ নিবেদিতা ঘনিষ্ঠভাবে মিশছেন রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্রের মতো ব্রাহ্মদের সাথে। এ নিয়ে তাঁর মনের মধ্যে সামান্য অপরাধবোধও কাজ করছিল।
তিনি ভাবলেন ব্রাহ্মসমাজের শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়কে রামকৃষ্ণ আন্দোলনের পথে আকৃষ্ট করতে পারলে- অন্তত করার চেষ্টা করলে কেমন হয়। তাতে তাঁর মেলামেশার ব্যাপারটাতে আর দোষের কিছু থাকবে না। স্বামী বিবেকানন্দর কাছ থেকে এব্যাপারে অনুমতি আদায় করেন নিবেদিতা। ১৮৯৯ সালের ২৩ জানুয়ারি বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে পরামর্শ দেন, “Make in roads into the Brahmos.”
বিবেকানন্দের অনুমতি পেয়ে নিবেদিতা ব্রাহ্মবন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেন একটি টি-পার্টিতে। নিমন্ত্রিতদের তালিকায় একেবারে প্রথমদিকে ছিলেন জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসু। ১৮৯৯ সালের ২৩ জানুয়ারি নিবেদিতার বাগবাজারের বাড়িতে টি-পার্টিতে রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, প্রসন্নকুমার রায়, মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, সরলা ঘোষাল, স্বর্ণকুমারী দেবী- সবাই এসেছিলেন। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ সেখানে তাঁর ‘in road’ বানানো শুরুই করতে পারেননি। প্রবল ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বে ও উচ্চমার্গের তাত্ত্বিক আলোচনায় বিবেকানন্দের রামকৃষ্ণ-কথামৃত খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি।
নিবেদিতা বুঝতে পারেন ব্রাহ্মদের মধ্যে তাঁর হিন্দুত্বের প্রভাব খাটানোর আবেগী ইচ্ছাটা বাস্তবসম্মত ছিল না।
ব্রাহ্মদের সাথে ধর্মীয় যোগাযোগ স্থাপনের ইচ্ছাটা বাদ দিলেও জগদীশচন্দ্রের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরো গভীর হলো। সম্পর্কটা কীভাবে গভীর হলো সেটাই একটা রহস্য। বৈজ্ঞানিক ধর্মের মতোই হয়তো opposite attracts – বিপরীত মেরুর প্রতি আকর্ষণ!
প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান থেকে ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা’ এই আইরিশ ভদ্রমহিলার সাথে ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের বিশ্বাসের কোন মিল নেই। তাছাড়া জগদীশচন্দ্র এমন গোঁয়ার, বদমেজাজী এবং ঠোঁটকাটা যে কোন আলগা ভদ্রতার ধার ধারেন না। এদিকে নিবেদিতাও ছেড়ে কথা কইবার মানুষ নন। তাই দু’জনই অকপট যে কোন ব্যাপারে। ব্যক্তিত্বের সংঘাত হয়, অথচ এই দুই প্রবল ব্যক্তিত্ব কীভাবে কাছাকাছি এলেন!
নিবেদিতার চিঠি থেকে জানা যায়, জগদীশচন্দ্র মার্গারেটের ‘নিবেদিতা’ নামটাই পছন্দ করেননি।
“আপনাকে মিস নোবলের পরিবর্তে সিস্টার নিবেদিতা বলে ডাকতে আমার কষ্ট হয়।”
“কেন?”
“নাম বদলের ফলে মনে হচ্ছে আপনার মানবিক সম্পদে টান পড়েছে। নাম বদল করে আপনি নিজেকে সংকীর্ণ করে ফেলেছেন- যা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।”
একথা শুনে নিবেদিতার খুব খারাপ লাগে। কষ্ট পান। কিন্তু কিছু বলতেও পারেন না। কষ্টের কথা বন্ধু মিস্ ম্যাকলাউডকে লিখে জানান, “একটা দুঃস্বপ্নের মতো তার কথাগুলো আমাকে তাড়া করে ফিরছে। আমি যাকে ভালবাসি, বিশ্বাস করি, তাদের কেউ কি কখনো আমাকে সংকীর্ণমনা মনে করেছে? তোমরা কখনও করেছো, তুমি বা সারা?”
জগদীশচন্দ্র যতই আঘাত দিচ্ছেন ততই যেন আকৃষ্ট হচ্ছেন নিবেদিতা তাঁর প্রতি। জানতে চাচ্ছেন কোথায় কোথায় অমিল আছে তাঁর আর নিবেদিতার?
জগদীশচন্দ্র অকপটে জানিয়েছেন –“তোমাদের স্বামীজি যে রামকৃষ্ণকে দেবতা বানিয়ে দিচ্ছেন দেখেই বিরক্ত লাগছে আমার।”
“রামকৃষ্ণ কি দেবতা হবার যোগ্য নন?”
“দেবতা! রামকৃষ্ণ! সংকীর্ণ ছাঁচে গড়া এক মানুষ, যিনি মেয়েদের প্রায় আধা-শয়তানী বলে মনে করতেন, আর মহিলা দেখলেই মূর্চ্ছা যেতেন!!!!!!”
রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের প্রতি জগদীশচন্দ্রের এই মনোভাব জানার পরেও নিবেদিতার রাগ হয়নি। কেবল ছয়টি বিস্ময়সূচক চিহ্ন দিয়ে নিজের অনুভূতি জানিয়েছেন।
নিবেদিতার এত পরমতসহিষ্ণুতার বদলেও জগদীশচন্দ্র নিজের মতবাদ একটুও নরম করেননি। তাঁর আসলেই খুব বিরক্তি লাগছিলো বিবেকানন্দের সাম্প্রতিক কাজকর্মে। অথচ ইংল্যান্ডে থাকতে তিনি বিবেকানন্দের বক্তৃতা শুনে শিহরিত হয়েছিলেন। বিবেকানন্দ যখন বলেছিলেন, “আমার জীবনের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌরুষ আনা”- বেশ ভালো লেগেছিলো তাঁর। কিন্তু যখন দেখলেন যে সেই তেজদীপ্ত মানুষটি রামকৃষ্ণকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করতে শুরু করেছেন, কালী পূজার ধ্যানে মগ্ন হচ্ছেন – তাঁর মনে হলো ‘বীরনায়ক’ থেকে বিবেকানন্দ পরিণত হচ্ছেন একজন সাধারণ ধর্মগুরুতে।
নিবেদিতা এ ব্যাপারে জগদীশচন্দ্রের সাথে কেন কোন তর্ক করেননি তাও এক রহস্য। অথচ তিনি খুবই আবেগপ্রবণ। তাঁর গুরুর সমালোচনা তিনি বিনাতর্কে মেনে নেয়ার মানুষ নন। এ ব্যাপারে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৮৯৯ সালের ১০ জানুয়ারি প্রসন্নকুমার রায়দের সাথে চা-পান ও ডিনার করার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ ও তার আন্দোলন সম্পর্কে বিরূপ সমালোচনা করায় মেজাজ খারাপ করে ঝগড়া করেছিলেন নিবেদিতা। তবে জগদীশচন্দ্রের বেলায় কেন নয়? কেন এত সহনশীলতা? কেন জগদীশের কটুবাক্যও মিষ্ট মনে হয় নিবেদিতার?
তার উত্তর নিজেই দিয়েছেন তিনি মিস ম্যাকলাউডের কাছে লেখা চিঠিতে- “I love that man.”
( ‘মুক্তমনা’ ব্লগে প্রকাশিত প্রদীপ দেব রচিত প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশ )
