
ভারত সফরের আগেই ম্যান্ডেলা জানিয়েছিলেন, কলকাতায় আসতে চান
দীর্ঘ ২৭টি বছর জেল খাটার পর ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেলেন মানুষটি। ততদিনে গোটা পৃথিবীর কাছেই তিনি একজন আইকন। না, শুধু কালো মানুষদের কাছে নয়, সমস্ত বঞ্চিত-অত্যাচারিতদের কাছেও তিনি অনুপ্রেরণা। এমনকি প্রথম বিশ্বও তাঁর মুক্তি চেয়ে উত্তাল হয়েছে। গোটা লন্ডন ছেয়ে গেছে ‘ফ্রি ম্যান্ডেলা’ পোস্টারে। নিজের আত্মজীবনী ‘‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’-এ ম্যান্ডেলা লিখেছেন, সেই সময় অনেকেই ভাবতেন ‘ফ্রি’ বুঝি তাঁর নাম। একজন বন্দি মানুষের সঙ্গে মুক্তি এভাবেই বিরোধাভাসে জড়িয়ে যাচ্ছিল বারবার।
আর জড়িয়ে যাচ্ছিল গান। তাঁকে নিয়ে গান বেঁধেছেন জেরি ড্যামার্স। ম্যান্ডেলার মুক্তি চেয়ে গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ব্রুস স্প্রিংস্টিন, বব ডিলান, মাইলস ডেভিস, হার্বি হ্যানকক, বনি রেইট, পিটার গেব্রিয়েল, রিঙ্গো স্টার-রা। ম্যান্ডেলার মুক্তির পর ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে তাঁর সংবর্ধনা। ড্যামার্স গাইলেন। ম্যান্ডেলার ভালোও লাগল সেই গান। কিন্তু গানে একটি তথ্য ভুল আছে যে। গানে লেখা– জেলে তাঁকে ছোটো মাপের জুতো পরতে দেওয়া হত। “এটা ভুল, জেলে ঠিক মাপেরই জুতো পরতে দিত ওরা আমায়।” হাসতে হাসতে বলেছিলেন ম্যান্ডেলা।
ম্যান্ডেলা তখন এক উন্মাদনার নাম। সেই উন্মাদনার আঁচ পেয়েছিল কলকাতাও। ১৯৯০ সালের ১৮ অক্টোবর, কলকাতার কাছে এক স্বপ্নের দিন। ইডেন গার্ডেনস কানায় কানায় ভর্তি। নেলসন ম্যান্ডেলার সংবর্ধনা। গান শুরু হল “উই শ্যাল ওভারকাম”। কী আশ্চর্য, প্রবাদপ্রতিম মানুষটাও যে গাইছেন, গলা মেলাচ্ছেন সেই গানে। গোটা দেহ দুলে উঠছে তাঁর। কলকাতার আবেগ তাঁর চারপাশে মুগ্ধতার ঘোর বুনে দিয়েছিল। ভারত সফরে আসার আগে প্রশ্ন করা হয়েছিল তাঁকে—দিল্লি ছাড়া আর কোন কোন শহরে যেতে চান তিনি? ম্যান্ডেলা বলেছিলেন দুটি শহরের নাম– কলকাতা আর বেনারস। কলকাতার নাম কেন বলেছিলেন ম্যান্ডেলা? এই শহর তাঁকে কোনো ডাক পাঠাত? উত্তরটা হয়তো ১৮ অক্টোবরের সেই ঐতিহাসিক দিনেই পেয়ে গেছিলেন সবাই। কলকাতাবাসী সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিল, ম্যান্ডেলা তাঁদেরই একজন। আপন। বড়ো আপন।
প্রায় তিরিশ বছর আগের সেই দুপুর, লক্ষ মুখের সারিকে কি জাপানি অক্ষর মনে হয় আজ কলকাতাবাসীর? কলকাতা অনেকখানি বদলেছে নেলসন। আপনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কলকাতায়, ইতি-উতি অতর্কিতে এখন অন্য স্লোগান শোনা যায়। “উই শ্যাল ওভারকাম’’ গাইলে সহজে শরীর দুলে ওঠে না কারো। তবু, ইতিহাস পুঁজের মতো জমে থাকে শহরের স্মৃতিতে, আনাচে-কানাচে। আপনি তো লড়তে শিখিয়েছিলেন। কারাগারের অন্ধকার একাকীত্বে উন্মাদ হননি এক আশ্চর্য জেদে। এই সময়টার বুকেও সেই জেদ ফিরুক নেলসন। দুঃসময়ের মধ্যেও বেঁচে থাকার জেদ। আপনি তো ভালোবাসতেন এই শহরকে। এই দেশকে। তৃতীয় বিশ্বের এই মানুষগুলোকে।
আপনার ১০১তম জন্মদিনে অনুপ্রেরণার আলো ছাড়া আর কীই বা চাওয়ার থাকতে পারে আমাদের!
