গোরাদের হারানোর আনন্দে ভেন্ডারে চেপে গোয়ালন্দ

‘ইস্টবেঙ্গল মেলে’ চেপে হইহুল্লোড় করতে করতে তাঁরা পৌঁছোলেন গোয়ালন্দ স্টেশনে, অবশ্যই বিনা টিকিটে

সেদিন সারা শহর জুড়ে তুমুল উন্মাদনা। জায়গায় জায়গায় জটলা, গুঞ্জন, চাপা রোমাঞ্চ, কাজকর্ম সব ভন্ডুল হতে বসেছে। গতকাল থেকেই যেন, একটা রুদ্ধশ্বাস আবহাওয়া জারি হয়েছে চারদিকে। সবার চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করছে। আর এসব কিছুর মূলে রয়েছে একটি ফুটবল ম্যাচ। তার এক প্রান্তে রয়েছে বাঙালি খেলোয়াড়ের দল মোহনবাগান অন্যপ্রান্তে গোরাদের ক্লাব আর.ডি.সি.এল.আই।

স্বাভাবিকভাবে টিকিটের ভয়ংকর ক্রাইসিস। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও টিকিট মেলেনি অনেকের। তাদের হতাশা বলার মতো নয়। একজন কিন্তু আগে থেকেই এই সমস্যা আঁচ করতে পেরে নিজের আর বন্ধুবান্ধবদের জন্য একগোছা টিকিট আগেভাগেই জোগাড় করে রেখেছেন।

তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বন্ধুদের মধ্যে আছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, নৃপেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনেশরঞ্জন দাস, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ।

গেলেন তাঁরা খেলার মাঠে। খেলা শুরু হল। উত্তেজনায় টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নজরুল। পাশে বন্ধুবান্ধবরা। কিন্তু তাঁরা খুব সাবধানে দাঁড়িয়েছেন। কেননা কে না জানে খেলা দেখতে দেখতে নজরুলের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়ে যায় মাঝে মাঝেই। তিনি ভাবরাজ্যে ডুবে যান। উত্তেজনার মাথায় পাশের দর্শককে বল ভেবে ‘কিক’ করে দিয়েছেন কতবার। ‘গোল গোল’ বলে নামসংকীর্তনের ঢঙে দু’হাত মাথার ওপর তুলে পাইকপেয়াদা তুচ্ছ করে মাঠে নেমে গিয়েছেন।

সেদিন মোহনবাগান ৭-১ গোলে ধরাশায়ী করল গোরাদের দলকে। নজরুলের উচ্ছ্বাস আর বেঁধে রাখা যায় না। চিৎকার করতে করতে মাঝমাঠে মেনে গিয়ে সে কী তাথৈ নৃত্য। সঙ্গে চিৎকার করে গান। নাচ শেষ হলে বন্ধুদের নিয়ে হানা দিলেন খাবার দোকানে। সেদিন তিনি ‘সওগাত’ পত্রিকার অফিস থেকে টাকা পেয়েছেন। সেটার তো একটা হিল্লে করতে হবে। পেট পুরে খাবার পর হুজুগ তুললেন সবাই মিলে যাবেন চন্দননগর। বাড়িতে খবর দেওয়ার কথা কারওর মনেই থাকল না। চললেন চন্দননগর। কিন্তু সেখানে গিয়েও নজরুলের আশ মিটল না। বললেন ‘ঢাকা চলো’। সেই রাত্রেই সবাই দলবেঁধে হাজির হলেন শিয়ালদহ স্টেশনে। কিন্তু মুশকিল হল অবশিষ্ট যে টাকা নজরুলের কাছে ছিল তাতে ঢাকা ভ্রমণ সম্ভব নয়। বাকিদের কাছে পয়সাকড়ি কিছুই ছিল না। ‘ঘাবড়াও মত্‌’ নজরুল হুংকার ছাড়লেন। তারপর টিকিট চেকারের দিকে এগিয়ে গেলেন।

গৈরিকবসন পরা, দীর্ঘকেশী, ডাকসাইটে বিপ্লবী কবিকে দেখে চেকার তো প্রায় পায়ে লুটিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা হয়ে গেল। নজরুল বললেন, ‘আমরা ভেন্ডারে যেতে রাজি আছি।’ ‘ইস্টবেঙ্গল মেলে’ চেপে হইহুল্লোড় করতে করতে তাঁরা পৌঁছোলেন গোয়ালন্দ স্টেশনে, অবশ্যই বিনা টিকিটে।

এবার জাহাজযাত্রা। বাকিরা ভয় পেয়ে গেলেন, ওখান থেকেই পিছিয়ে আসবার কথা বললেন। কিন্তু নজরুলের পাগলামি তখন তুঙ্গে। একটামাত্র টিকিট কেটে আর একটা মাদুর কিনে নিয়ে উঠে পড়লেন জাহাজে। ডেকে মাদুর বিছিয়ে বসে ধরলেন গজল। বন্ধুরা পাশে বসে হাততালি দিতে লাগলেন।

ভিড় জমতে লাগল ওই উদাত্তকণ্ঠ গায়ককে ঘিরে। একপাশে বেশি ভিড়ের চাপে কাত হয়ে পড়ল জাহাজ। রেগেমেগে নেমে এলেন কাপ্তেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিও ওই গজলের সুরে ধরাশয়ী হয়ে গেলেন। আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন জাহাজের অন্য কর্মীরা ও স্বয়ং টিকিট চেকার। গান গাইতে গাইতে একটামাত্র টিকিটেই প্রায় আট-দশজন পৌঁছে গেলেন ঢাকা। সেখানে গিয়ে উঠলেন বুদ্ধদেব বসুর এক আত্মীয়ের বাড়িতে। কিন্তু নজরুল নামে নয়, বেলুড়মঠের ‘রামানন্দ বাবাজি’র ভেক ধরে। যে হুজুগ শুরু হল খেলার মাঠে, তা গিয়ে শেষ হল ঢাকায়।

সাহিত্যিক বিমল মিত্রের বন্ধুর বাড়িতে নজরুলের গানের জলসা বসেছে। তাঁর সঙ্গে আছেন উমাপদ ভট্টাচার্য ও নলিনীকান্ত সরকার। সন্ধেবেলা আসর শুরু হল। আবার ভাবের জগতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন কবি। গানের পর গান গেয়ে চলছেন। রাত বারোটার কিছু পরে ভিড় হালকা হতে লাগল। উমাপদ ও নলিনীকান্তও চলে গেলেন। কিন্তু নজরুল রয়ে গেলেন। কেবল সে রাতটাই নয়। রাতের পর রাত। একটা ঘোরের মধ্যে অবিশ্রান্ত গান গেয়ে চললেন তিনি। শেষপর্যন্ত একজঙ্কে দায়িত্ব নিয়ে মনে করিয়ে দিতে হল যে এটা তাঁর বাড়ি নয়। ইতিমধ্যে সেখানে পনেরো দিনের বেশি থাকা হয়ে গিয়েছে। সংবিৎ ফিরে পেয়ে কবি তড়িঘড়ি হারমোনিয়াম নিয়ে বেরিয়ে গেলেন সেই অচেনা বাড়ি থেকে।

প্রথম সন্তান বুলবুলের মৃত্যুতে শোকে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন কবি। বেশভূষা এলোমেলো, উশকোখুশকো চুল। পথে পথে ঘুরতেন আর চেনা-অচেনা সবাইকে জিজ্ঞেস করতেন ‘বুলবুলকে তুমি কোথাও দেখেছ। একবার আমাকে দেখাতে পারো। একবার। মাত্র একবার।’ একদিন এক ভদ্রলোক বললেন, ‘চলুন আজ বুলবুলকে দেখাব।’ বলে তিনি নজরুলকে নিয়ে একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকলেন। অনেকটা সময় তাঁরা কাটালেন ওই ঘরের ভেতর। যখন বেরিয়ে এলেন, তখন কবির মুখ উজ্জ্বল। তিনি তৃপ্ত। অন্ধকারে বুলবুলের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে।

গ্রামাফোনের বিখ্যাত তবলা বাজিয়ে রাসবিহারী শীল একদিন এলেন নজরুলের কাছে হাত দেখাতে। হাসিমুখে তাঁর হাতখানি হাতে নিলেন কবি। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মুখ কালো আর কঠিন হয়ে উঠল। রাসবিহারী উদ্‌বিগ্ন কিন্তু নজরুল কিছু বললেন না। এক সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই নিউমোনিয়ার জ্বরে হঠাৎ চলে গেলেন রাসবিহারী শীল।

তবে কি তাঁর কররেখায় মৃত্যুর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখে সেদিন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন নজরুল। প্রত্যক্ষদর্শী শিল্পী আঙুরবালাদেবী অবশ্য তেমনটাই বিশ্বাস করতে ভালোবাসতেন।

(সুদীপ বসু রচিত ‘খেয়ালগাথা’ বই থেকে সংগৃহীত, প্রকাশক-ধানসিড়ি)

Developed by DXDasia