
তিনি উর্দু গজল, আরবি ফারসি শব্দ ও ছন্দ যোগ করে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন
নজরুলের গান নিয়ে কাজ করছেন মাসুদা আলম কল্পনা এবং খয়রুল আনম শাকিল। কবির জন্মদিনে শিল্পী দম্পতির মুখোমুখি বঙ্গদর্শন।
প্রশ্ন: একটা প্রশ্ন না করে পারছিনা। আপনারা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে নজরুল সংগীত চর্চা করছেন। কবিকে আপনারা কী দৃষ্টিতে দেখেন?
শাকিল: আসলে নজরুল কিন্তু অনেক বড় মাপের সঙ্গীতজ্ঞ, কবি ও সাহিত্যিক। একবার ভেবে দেখুন, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী বাঙালি সমাজের বিচিত্র সামগ্রিক রূপটিকে তিনি যত সহজে আত্মস্থ করেছিলেন, এমন দৃষ্টান্ত বাঙালিদের মধ্যে পাওয়া কঠিন। একদিকে শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন, অপরদিকে অপূর্ব সব ইসলামী গান লিখেছেন। সেই সাথে তিনি উর্দু গজল, আরবি ফারসি শব্দ ও ছন্দ যোগ করে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু আমরা নিজেদের চিন্তার সীমাবদ্ধতায় হয়তো সেই নজরুলকে যথাযথভাবে বুঝতে পারিনি, তার কদর করিনি। পাকিস্তানের সময়ে তাঁকে মুসলিম কবি বলে একটা খণ্ডিত রূপে দেখার চেষ্টা চলেছে।
কল্পনা: সেই চেষ্টা এখনো সম্পূর্ণ চলে গিয়েছে, এই কথা আমরা আজও বলতে পারিনা। তাই আমাদের সব সময়ই চেষ্টা করা উচিৎ নজরুলের এই নানামুখী প্রতিভা আর পরিচয়কে আরো বেশি বেশি করে তুলে ধরা, মানুষকে আরো সচেতন করা।
প্রশ্ন: আপনারা নিজেরা এই বিষয়ে কী করছেন?
শাকিল: দেখুন, নজরুলের তো বিশাল রচনা সম্ভার। আমরা নজরুল সংগীত শিল্পী, আমরা তার গান নিয়ে কাজ করাতে মনোযোগ দিয়েছি। নজরুলের গান যেন শুদ্ধভাবে, শুদ্ধ সুরে গাওয়া হয়, এই হলো আমাদের চেষ্টা।
প্রশ্ন: এটা তো খুব ভাল কাজে হাত দিয়েছেন। ঠিক কীভাবে আপনারা এগুচ্ছেন, একটু বিস্তারিতভাবে বলবেন কি?
কল্পনা: আমাদের নজরুল সংগীত শিল্পীদের একটা সংগঠন হয়েছে, বাংলাদেশ নজরুল সংগীত সংস্থা যার সাথে আমরা দুজনেই সম্পৃক্ত আছি। এখানে দেশের অনেক স্বনামধন্য শিল্পীরা রয়েছেন।
খালিদ হোসেন সভাপতি আর শাকিল সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া সংগঠনে রয়েছেন ইয়াকুব আলী খান, সালাউদ্দীন আহমদ, লীনা তাপসী খান, কবি নাত্নী খিলখিল কাজী, জোসেফ কমল রড্রিগস, সেলিনা হোসেন, করিম হাসান খান এবং আরো অনেকে।
প্রশ্ন: কোন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন কি?
শাকিল: হ্যা, হ্যা, অবশ্যই। ঘরে বসে বিলাপ করে কি কোন লাভ আছে? সেজন্য সংস্থার পক্ষ থেকে আমরা নিবিড় কর্মসুচি গ্রহণ করেছি এবং অনেকটা অগ্রসরও হয়েছি।
কল্পনা: আমরা একেবারে সরেজমিনে এই বিষয়ে কাজ করছি। এর মধ্যেই আমাদের সংস্থা থেকে কয়েক ধাপে কয়েক একাধিক শিল্পীর দল নিয়ে যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশালে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছি। আগামীতে আগরতলা, কুমিল্লা সিলেট রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাবার কথাও হচ্ছে।
প্রশ্ন: এতো অনেক কাজ।
শাকিল: নজরুলের গান রক্ষা করতে হলে একটু পরিশ্রম তো করতেই হবে। আমাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো নজরুলের শুদ্ধ বাণী ও সুর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল অবধি পৌঁছে দেওয়া। যারা নজরুলের গান করেন বা শোনেন, তাদের সঠিক বাণী ও সুর সম্বন্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এই কাজে সহায়তা করতে আমাদের সংস্থা শুদ্ধ বাণী ও শুদ্ধ সুরে গীত নজরুলের গানের একটা সংগ্রহশালা তৈরি করছে। আদি স্বরলিপি ও শুদ্ধসুরে গাওয়া গানের সূত্র ও YouTube লিঙ্ক সবার জন্য তুলে দিচ্ছি।
প্রশ্ন: আপনারা ঢাকা শহরের সব বড় বড় শিল্পীরা বিভিন্ন শহরে যাচ্ছেন, এটা তো খুব আনন্দের কথা। অভিজ্ঞতাটা কেমন একটু জানাবেন?
শাকিল: খুবই সুন্দর এবং শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। আসলে ঢাকায় থাকতে থাকতে আমরা ভুলে যাই, যে ঢাকা শহরটাই গোটা বাংলাদেশ নয়। এই সব জায়গায় গিয়ে যেটা ভাল লাগছে, যে আমাদের অজান্তে দীর্ঘদিন ধরে নজরুলভক্ত সংস্কৃতিসেবীরা নজরুল সংগীত চর্চা করছেন। অনেক তরুণ প্রতিভাধর সুকণ্ঠ গায়ক ও গায়িকাও আমরা দেখছি। তাদের সঠিক সুর ও বাণীতে নজরুলের গান শেখবার আগ্রহ প্রচুর |
কল্পনা: আরেকটা কথা বিশেষভাবে বলতে হয় – বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আমরা যে আতিথেয়তা আর ভালবাসা পেয়েছি, তাতে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। আমাদের এখন নানা জায়গায় নতুন সাথী হয়েছে, যারা শুদ্ধ নজরুল সংগীত চর্চাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেবেন।
শাকিল: সেইসাথে আমরা বিভিন্ন এলাকার প্রশিক্ষকদের সাথেও মতবিনিময় করছি, তাদের হাতে শুদ্ধ সুর ও বাণীর আদি গানের স্বরলিপি গুলো তুলে দিচ্ছি যাতে তাঁদের মাধ্যমে তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা শুদ্ধভাবে নজরুলের গানগুলো কণ্ঠে ধারণ করে| এইসব ছেলেমেয়েরা এতদিন দিক নির্দেশনা পাচ্ছিল না, আমরা এখন এদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করব। আজকের ছেলেমেয়েরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারে খুবই স্বচ্ছন্দ, সবাই Facebook, YouTube ব্যবহার করতে জানে।
কল্পনা: আমরা যেখানেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, সবখানে আগ্রহীদের আমাদের সংস্থার Facebook পাতায় সদস্য করে নিচ্ছি। এতে কেউ যদি কোন গানের সঠিক সুর বা বাণী সম্বন্ধে জানতে চান, আমরা সহজেই সেই তথ্য পাঠাতে পারছি। এর উপরি পাওনা হলো আমাদের আরো শত শত সদস্যরা ঐ গানটির শুদ্ধ রূপ সম্বন্ধে জানতে পারছেন।
