সাহিত্যসভায় প্রবেশ করেই সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠতেন নজরুল – ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’

বেলঘরিয়ার ইতিহাস নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে করতে হঠাৎই উঠে এসেছিল নজরুল-প্রসঙ্গ। বিভিন্ন বই, প্রবন্ধ ঘেঁটে ও স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিসৌজন্যে পেয়েছিলাম বেশ কিছু ঘটনা। নজরুলের দরাজ দিল যে বেলঘরিয়াকে আপন করে নিয়েছিল, জানার পর এক অদ্ভুত আনন্দ পেয়ে বসেছিল আমায়।

১৯২৬-২৭ সালে, কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় ফেরার পথে নজরুল প্রায়ই হাজির হতেন বেলঘরিয়ায়। স্থানীয় বন্ধু ও কবিদের সঙ্গে আড্ডায় মজলিশে মেতে উঠতেন তিনি। কবি চণ্ডীচরণের বাড়িতে জমে উঠত আড্ডা। এছাড়াও, কামারহাটি পৌরসভার কমিশনার বৈদ্যনাথ ঘোষালের বাড়িতে একটি সাহিত্যসভা আয়োজিত হত, নাম ‘রসচক্র’। নজরুল সহ কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকরা প্রায়ই আসতেন সেখানে। প্রবেশ করেই সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠতেন নজরুল – ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’। এবং গানে কবিতায় অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে সভার মধ্যমণি হয়ে উঠতেন অচিরেই।

তাঁর জনপ্রিয়তা বেলঘরিয়া সহ আশেপাশের প্রতিটি জনপদেই ছিল তুঙ্গে। চণ্ডীচরণ মিত্রের উদ্যোগে বেলঘরিয়া মিডল ইংলিশ স্কুলে(বর্তমান বেলঘরিয়া হাই স্কুল) আয়োজিত বাৎসরিক ভোজ ও কবিসম্মেলনে নজরুল ছাড়াও গোলাম মোস্তাফা, নরেন্দ্র দেব, জলধর সেন, বুদ্ধদেব বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাশ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রমুখের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।

আরেকটি তথ্য পাই – অসুস্থ অবস্থায় নজরুল একবার আপনমনে বি টি রোড ধরে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ও গতিপথ সম্ভবত তাঁর নিজেরও জানা ছিল না। চল্লিশের গোড়ায় সেই শেষ-দুপুরবেলায় ট্রাফিকের ফাঁদে পড়ে লরিতে চাপা পড়বার মতো অবস্থা হয়েছিল তাঁর। বেলঘরিয়ার পুলিশ চৌকিতে তাঁকে চিনতে পেরে নিয়ে যান ছাত্ররা। সেখানেই কবি বিশ্রাম করতে থাকেন। পরে খবর পেয়ে টেলার্স হস্টেলের ছাত্ররা গিয়ে মোটরে কবিকে কলকাতার বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

আমরা জানি, বুলবুল মারা যাওয়ার পরেই নজরুল মানসিকভাবে অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে ওঠেন। সাংসারিক অভাব, প্রমীলাদেবীর অসুস্থতা তাঁকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয় আরও। যার পরিণতি বরদাচরণ মজুমদারের কাছে তাঁর যাতায়াত বা তারাশঙ্করের গ্রাম লাভপুরে উপস্থিত হয়ে একটি বিশেষ পুকুরে স্নান করে ‘অলৌকিক ঔষধ’ সংগ্রহ। অফুরন্ত সৃষ্টির মধ্যেই এইসব মানসিক অস্থিরতাই যে তাঁকে বেলঘরিয়ার পথে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

’৪১এ মারা গেলেন চণ্ডীচরণ মিত্র। ’৪২এ তো চিরতরেই অসুস্থ হয়ে গেলেন কবি। বেলঘরিয়া ও পারিপার্শ্বিক আড়িয়াদহ, পানিহাটি, বরানগর প্রভৃতি জনপদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্পর্কেও ছেদ পড়ে তারপর।

তবু, কিছু থেকে যায়। ফিরে-ফিরে আসে। সেটুকুই সম্বল, বেলঘরিয়া-সহ আশেপাশের শহরতলির। আর মনে-মনে গর্ব – কবির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল একদিন…

_________

তথ্যঋণ –
১। ব্যারাকপুরের সেকাল-একাল, দ্বিতীয় খণ্ড / সম্পাদনা – কানাইপদ রায়
২। ‘আজকের কাদম্বরী’ পত্রিকা, চণ্ডীচরণ মিত্র সংখ্যা / সম্পাদনা – সঞ্জয় ব্রহ্ম
৩। কামারহাটি পৌরসভা – শতবর্ষের স্মারক গ্রন্থ / সম্পাদনা – অমরনাথ ভট্টাচার্য
৪। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য / ডঃ সুশীল ভট্টাচার্য
এছাড়াও স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির স্মৃতিচারণ

Developed by DXDasia