
কৃষিতে আধুনিকতা এসেছে, শিক্ষিতের হার বেড়েছে সত্তর শতাংশ।পালটে গেছে নকশালবাড়ি
শুধু মাত্র নকশালবাড়ি ব্লকেই এখন লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ। ১৯৬৭ সালে এই সংখ্যা প্রায় চল্লিশ শতাংশ কম ছিল। সেখানে এখন নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার বারো শতাংশ। ৬৭ সালে কৃষিকাজই ছিল প্রধান জীবিকা। এখন সময়ের নিয়মে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। তথ্য প্রযুক্তির যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে যাওয়াতে তার ঢেউ আছড়ে পড়েছে নকশালবাড়ি ও লাগোয়া বেঙ্গাইজোত, হাতিঘিষার মতো গ্রামগুলিতে। এখন সেই নকশালবাড়ি সংসদে গ্রাম সংখ্যা একশটির ওপর। আর সত্তরের দশকেও তা ছিল ত্রিশটির বেশি নয়। পঞ্চায়েতের সদস্য সংখ্যা ২২টি। আগে যেখানে দুতিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল এখন সেখানে ব্লকে প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭১টি। শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ৫৯টি, জুনিয়র হাইস্কুল ৯টি, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র ২টি, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ১২টি, কলেজ তৈরি হয়েছে একটি। হিন্দি নেপালি ভাষাভাষীদের জন্যও কলেজ তৈরির প্রয়াস শুরু হয়েছে। সেখানকার তৃণমূল নেতা অমর সিনহা দাবি করেন, বিগত ছ’বছরে নকশাল বাড়িতে যে পরিবর্তন হয়েছে তা বৈপ্লবিক। ১৯৬৭ সালের পর থেকে যে পরিবর্তন এসেছে তা ভাবা যায়নি। বরঞ্চ বামপন্থী নকশাল আন্দোলনের জেরে ৩৪ বছরের বাম শাসনে নকশালবাড়িতে বিশেষ বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা উন্নতি হয়নি বলেও অভিযোগ তোলেন অমরবাবু। তিনি জানান, ৩৪ বছরে সেভাবে গ্রাম উন্নয়ন হয়নি। কিন্তু বিগত ছ’বছরে প্রচুর পাকা রাস্তা হয়েছে। আগেতো সব কাঁচা রাস্তাই ছিল। পরিকাঠামোর উন্নতি হয়েছে অনেক। সবুজ বিপ্লবের জন্য কাজ শুরু হয়েছে। হাতিঘিষা এলাকা যেখানে নকশালপন্থীদের দূর্গ ছিল সেখানে সেঁচের বাঁধ দেওয়া হয়েছে মেচি নদীর ওপর। মনিরাম গ্রাম পঞ্চায়েতের কিলোরামে সেঁচের জন্য একটি ক্যানাল তৈরি হয়েছে। সবই কৃষকদের জন্য।
নকশালবাড়িতে কোনও দমকল কেন্দ্র ছিল না, সেটা তৈরি হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে একটি কম্যুনিটি হল। তফশিলী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি আবাসিক কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। বেঙ্গাইজোত, যেখানে শহিদ হওয়ার ঘটনা ঘটে, ৬৭ সালের ২৫মে সেই বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তথা নকশালবাড়ি কলেজে গভর্নিং বডির সভাপতি নৃপেন্দ্রনাথ বর্মন বলেন, গত দশ বছরে নকশালবাড়িতে সেখানকার মানুষের অর্থনৈতিক ও শিক্ষার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ অনেক সচেতন হয়েছেন। আগে তো এখানে কোনও পৃথক বিধানসভাই ছিল না। এখন একটি বিধানসভা হয়েছে। চা-বাগানে শ্রমিকদের হাজিরাতে পরিবর্তন হয়েছে। চা শ্রমিকদের ছেলেমেয়ে কলেজেও পড়ছে। জোতদারি সেই ব্যবস্থা নেই। আগে অনেকে চোরাকারবার করতো। নেপাল থেকে পণ্য এনে বাসে চেপে শিলিগুড়ি যেতো। এখন সেই চেহারাতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সীমান্তে কর্মরত এস এস বি এবং রাজ্য প্রশাসন সীমান্তে স্বনির্ভরতার অনেক প্রশিক্ষন দেওয়া করেছে। মহিলারা কেউ সেলাই শিখছে, কেউ বিউটি পার্লিরের কাজ শিখছে। তাছাড়া যুবকদের মোবাইল রিপেয়ারিং, কম্পিউটার সারাই সহ অনেক স্বনির্ভরতার কাজ হচ্ছে। তৈরি হয়েছে বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠী। ফলে তারা চোরাকারবার না করে পরিশ্রম করে মূল স্রোতে ফিরে এসেছে এবং আসছে। মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাতে আগের থেকে রোজগার বেড়েছে একশগুণ। স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতি সূত্রে জানানো হয়েছে, কৃষিতে আধুনিকতা এসেছে। আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতি এসেছে। তাতে ধান থেকে সব্জি চাষে ফলন বেড়েছে।
শিক্ষার হার আগের তুলনায় সত্তর শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু নকশালপন্থীদের কথায়, চিন্তা এখন সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ে। স্কুলে কোনওদিন যাননি সিপিআইএমএল কর্মী রাজু। তার কথায়, তিনি স্কুলে না গেলেও লেনিনের বই পড়েন, চারু মজুমদারের বই পড়েন। রিকশা চালানো ছেড়ে রাজু এখনও বিশ্বাস করে, সমাজতন্ত্র আসবে। তাই তার মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছেলেকে লেনিন-এর বই পড়াচ্ছে রাজু। তার বক্তব্য, সব দল ভোটের কথা বলতে আসে এখানে। কিন্তু গরিব কৃষক, শ্রমজীবীদের কথা কেউ বলে না। ১৯৬৭ সালে শহিদ হওয়া ধনেশ্বরীদেবীর ছেলে পবন সিংহ বলেন, বাইরে থেকে আসা লোকজন এখানে ঠিকার ভিত্তিতে চাষবাস করছে। আর পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। নকশাল নেতা চারু মজুমদারের ছেলে সিপিআইএমএল লিবারশনের জেলা সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার বলেন, তাদের কাছে এই সময় বড় উদ্বেগ হল অমিত শাহদের আরএসএস নকশালবাড়ি ও তার আশপাশের গ্রামে বিভিন্ন সামাজিক কাজে হাত দিয়েছে। তারা মহিলাদের মধ্যে শাড়ি বিলি করছে। তারা টাকা বিলি করছে। তারা আদিবাসীদের নিয়ে নাটক করাচ্ছে, নাচগান করাচ্ছে। যেটা বড় ভয়ঙ্কর। অমিত শাহরা সেখানকার সমাজের ভিতরে প্রবেশ করে যে লম্বা দৌড় শুরু করেছে তার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিবৃদ্ধিতে যেতে হবে।
