কামসূত্র থেকে বাবু কালচার : কুলস্ত্রী ও পতিতার বয়ান

মেয়েদের প্রথম দাবিই উঠেছিল যৌন স্বাধিকার ও পুরুষ নির্বাচনের অধিকার বিষয়ে

ময়টা ১৮৩৪/৩৫। কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, সে সময়ে তিনি এক কুলবধূর প্রেমে পড়েন। তাঁর ভাষায়— “যে কামিনীর মোহিনী মূর্ত্তি দিনযামিনী হৃদয়মন্দিরে অধিষ্ঠিত ছিল, সে মূর্ত্তিকে দর্শন ব্যতীত স্পর্শ করিতে বাঞ্চা হইত না।” কেননা তা নাকি ‘নির্মল রসে’ পূর্ণ হৃদয়ের বন্ধুতার মতো প্রেম। লুকিয়ে লুকিয়ে তার গান শুনতে তিনি ভালোবাসতেন, হোলিতে তার গায়ে রং লাগাতেন। কিন্তু সেই বধূ কার্ত্তিকেয়কে একদিন ‘অপবিত্র’ প্রস্তাব দেয়। তখন কার্ত্তিকেয়ের মনে হয়— “তাঁহাকে আমি মায়ের মতন জ্ঞান করিয়া থাকি…”। যৌনগন্ধী পরকীয়া এবং শরীরোত্তীর্ণ পরকীয়া প্রেমের এই বিভাজন তাঁর বোধিমূলের সংস্কার। সংস্কার কারণ দীর্ঘকাল যাবৎ লালিত হয়েছে এই চিন্তা। ফলে এ শুধু তাঁর নয়, ভারতীয় চেতনায় পুরুষতান্ত্রিক সংস্কার।

বাৎসায়ন কামসূত্র-এ চার রকমের মেয়েদের স্বীকৃতি দিয়েছেন— কন্যা, পুনর্ভূ, বেশ্যা এবং পরকীয়া। পুনর্ভূ (একাধিক বিয়ে) মেয়েরা একাধিক পুরুষ সঙ্গ করলে তারা বেশ্যাবৎ এবং বেশ্যাদের চতুর্বর্গ পুরুষার্থের মধ্যে কেবল অর্থ ও কাম লভ্য। অর্থাৎ বেশ্যাবৃত্তি ধর্মহীন। আর মেয়েদের কাছে (কন্যাদেরও) ‘মোক্ষ’ বলে কিছু নেই—তাদের চতুর্থ পুরুষার্থ হল স্বামীলাভ। এই কাঠামোর বাইরে পরকীয়া নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা মেয়েদের দিক থেকে তিনি করেননি। কিন্তু পুরুষরা পরকীয়া করতে পারে— সে মর্মে তিনি অনেকগুলি কারণ দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে পরকীয়া করবে যে মেয়েরা তাদের বিষয়ে বিস্তৃত না বললেও বোঝা যায় তারাও বেশ্যার পর্যায়ভুক্তই হবে। ধর্মশাস্ত্রে ও নীতিকথাগুলোতেও মেয়েদের যৌন ব্যভিচার নিয়ে নানাবিধ ওজর-আপত্তি এবং পুরুষকে সচেতন করতে বহু আখ্যান বোনা হয়েছিল।

মেয়েদের অব্জেক্টিফাই করার বিরুদ্ধে মেয়েদের প্রথম দাবিই উঠেছিল যৌন স্বাধিকার ও স্বাধীন পুরুষ নির্বাচনের অধিকার বিষয়ে। ১৮৩৫-এ শান্তিপুরনিবাসিনী প্রশ্ন তুলেছিলেন— “কেবল স্ত্রীলোকের সুখ সম্ভোগ নিষেধার্থে কি ধর্মশাস্ত্র”? এই সুখ এবং সম্ভোগ অবশ্যই যৌন সুখ এবং রতিক্রিয়ার সম্ভোগ।

কৌলিন্য ব্যবস্থা এবং তার উনিশ শতকীয় নবরূপ বাবু-সংস্কৃতিতে বহুস্ত্রী ভোগ ও বেশ্যাগমন ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। সেই পরিস্থিতিতে মেয়েদের অবস্থা ছিল সঙ্গিন। কুলীন স্বামীরা বছরের পর বছর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেত না (শ’খানেক স্ত্রী থাকলে সকলের সঙ্গে বছরে একবার না দেখা হওয়াই স্বাভাবিক)। এছাড়া বৃদ্ধ কুলীনের তরুণী ভার্য্যারা বিধবাও হত আখছার। অন্যদিকে শ্রোত্রিয় বা বংশজ ব্রাহ্মণরা প্রায়ই মেলের মেয়ে পেত না বলে সে সময়ে মেয়ে বেচা-কেনাও বেশ রমরমিয়ে চলছে। বাবুরাও কৌলিন্য-গর্বে না হোক অর্থগৌরবে নিজেদের কুলস্ত্রীদের ছেড়ে বেশ্যা পুষত। কিন্তু কুলস্ত্রীরা উপপতি গ্রহণ করলে তারা যথারীতি কুলভ্রষ্টা হত।

মেয়েদের অব্জেক্টিফাই করার বিরুদ্ধে মেয়েদের প্রথম দাবিই উঠেছিল যৌন স্বাধিকার ও স্বাধীন পুরুষ নির্বাচনের অধিকার বিষয়ে। ১৮৩৫-এ শান্তিপুরনিবাসিনী প্রশ্ন তুলেছিলেন— “কেবল স্ত্রীলোকের সুখ সম্ভোগ নিষেধার্থে কি ধর্মশাস্ত্র”? এই সুখ এবং সম্ভোগ অবশ্যই যৌন সুখ এবং রতিক্রিয়ার সম্ভোগ। ওই সময়েই চুঁচুড়া নিবাসিনীরা বলেছিল— “আমাদের কখন কিছু জানা শুনা নাই এবং বিদ্যা কি রূপ কি ধনাদি কিছু নাই এমত পোড়া কপালিয়াদের সঙ্গে কেবল ছাইর কুলের নিমিত্ত আমাদের বিবাহ দিতেছেন এবং যখন অতি বালিকা…” অর্থাৎ পুরুষ সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীন মত প্রকাশের দাবি করেছে। সেক্ষেত্রে পুরুষের রূপ-বিদ্যা-ধন সবই তাদের কাম্য। এর অভ্যন্তরীণ বয়ান হল মেয়েদের বাছার সময় পুরুষ যদি শাস্ত্রীয় গুণ মিলিয়ে দেখে তাহলে মেয়েরা ব্যবহারিক গুণ মিলিয়ে দেখবে না কেন? স্বামীর ধনে-বিদ্যায় জীবনের নিশ্চয়তা এবং রূপে যৌন আকর্ষণ দুই-ই তাদের দাবি। আকর্ষণ কি বিকর্ষণ তা বুঝবে তো তারাই— ফলে স্বামী নির্বাচনের অধিকার তাদেরই হওয়া উচিত।

সে সময়ের একাধিক কাব্য-আখ্যানে মেয়েদের প্রতিবাদী স্বর শোনা যায়। তার আগে পুরো মধ্যযুগের কাব্যে মেয়েরা স্বামীদের নিন্দা করত। সেটা ঐতিহ্যই ছিল। পুরুষের কলমে নারীদের সেই বয়ানের বাস্তব ভিত্তি থাকলেও তার প্রতিকারের দাবি স্পষ্টত শোনা যায়নি। উনিশ শতক এদিক থেকে আলাদা। ১৮০৩ সালে লেখা কালিপ্রসাদ কবিরাজের ‘চন্দ্রকান্ত’-এ দেখা যাবে চন্দ্রকান্তের স্ত্রী তিলোত্তমা স্বামীর গুজরাটে বাণিজ্যে গিয়ে পরনারী গ্রহণের সংবাদ পেয়ে নিজেই গুজরাটে চলে গেছে। ভেড়াকে যেভাবে গলায় দড়ি দিয়ে টেনে আনা হয়, সেভাবে সে চন্দ্রকান্তকে বীরভূমে টেনে এনেছে। বলেছে— “তুমি তো সুজন, সাধুর নন্দন, অধর্ম্ম এ কাযে জান। চিত্ররেখা পাশে, রমণীর বেশে, ছিলে তবে কি কারণ।। তব ব্যবহার, শুনিয়া আমার, ইচ্ছা হইল উপপতি। আমি হে তোমারে, জিন্যাছি বেপারে, বিবেচনা কর যদি।।” বাণিজ্যে গিয়ে তিলোত্তমা অর্থের বিনিময়ে তার স্বামীকে কিনে নিয়েছিল প্রায়। সে বলেছে চাইলেই উপপতি রাখতে পারত। মেয়েদের পক্ষে উপপতি রাখা সে সময়ে অনায়াসসাধ্য ছিল। একটি মেয়ে যে বাণিজ্য-বুদ্ধিতে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে, সংযমী হতে পারে তার বয়ানই এই কাব্যে রয়েছে।

তিলোত্তমা উপপতি না রাখলেও ‘দূতীবিলাস’-এর (১৮২৫) অনঙ্গমঞ্জরী শ্রীদেবকে উপপতি রাখে। তার স্বামী, এক নববাবু, বেশ্যাপ্রীতির জন্য যথারীতি কুলস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করত না সেভাবে। না পাওয়া সম্ভোগসুখ সে ‘রসিক যুবার’ থেকে মিটিয়ে নিয়েছে। বাৎসায়নের কাঠামোকে রেখে ভবানীচরণ এ-কাব্য লিখলেও এখানে অনঙ্গমঞ্জরী স্বামী বা সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত হয় না। অর্থাৎ তার চতুর্বর্গ পূরণ হয়। ভবানীচরণ অন্তত এভাবেই কামশাস্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছ। উনিশ শতকীয় ডিসকোর্সে মেয়েরা ধর্মশাস্ত্র বা কামশাস্ত্র অনুগ আচরণ করেনি। ‘নববিবিবিলাস’ (১৮৩১) কাব্যেও নববিবি তার বেশ্যাবিলাসী স্বামীর কাছে ফিরে আসেনি— তার স্বামী তাকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে চেয়ে সাধ্য-সাধনা করলেও সে ফেরেনি। সেখানে কোনো স্বাধীনতা নেই। দূতীবিলাসে নারীবেশী শ্রীদেব নাগর বলেছিল– “উপপতি করি যদি দূরে যায় দোষ”। কীসের দোষ?— কুলবধূর কূলচ্যুত হওয়ার ভয় আর থাকে না যখন সে বেশ্যা। বেশ্যার ধর্ম ও মোক্ষ নেই বলেই শাস্ত্র সেখানে শিথিল। তার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে উনিশ শতকীয় কুলবধূরা। যে কারণে ১৮৫৩ সালের জনগণনায় শুধু কলকাতায় বেশ্যার সংখ্যা ছিল যেখানে ১২,৪১৯— সেখানে ঐ সংখ্যার মধ্যে কুলচ্যুত স্ত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। দশ হাজার কুলস্ত্রী শুধু কলকাতাতেই জড়ো হয়ে বেশ্যাবৃত্তি নিয়েছে— ঘটনাটা মোটেই ছোটো কথা নয়।

মেয়েদের স্বাধীনতা, সমতা— সমস্ত দাবিই সে সময়ে যৌন স্বাধিকারের প্রশ্নটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বহুভোগ্য ব্যভিচারী পুরুষদের হাড়ে হাড়ে চিনেছিল বলেই তারা জানত কীভাবে তাদের বশ করতে হয় এবং আর্থিক সুবিধাটুকু কেড়ে নিতে হয়।

মেয়েদের স্বাধীনতা, সমতা— সমস্ত দাবিই সে সময়ে যৌন স্বাধিকারের প্রশ্নটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বহুভোগ্য ব্যভিচারী পুরুষদের হাড়ে হাড়ে চিনেছিল বলেই তারা জানত কীভাবে তাদের বশ করতে হয় এবং আর্থিক সুবিধাটুকু কেড়ে নিতে হয়। ধর্মের ভয়, কুলের ভয়, সমাজের লাজ— কিছুই যখন তারা মানছে না— এক মহিলা বলেছে— “যে স্ত্রীলোক পতি পরিত্যাগ করিয়া উপপতি লইয়া জবন ভূপতির হুজুরে হাজির হয় তাহার আরজেতে জাতিতে কি অধিকার থাকে।… পুরুষ তুমি ক্ষান্ত হও তোমাকে ও চাহে না।” অর্থাৎ পুরুষ কি তাদের চাইবে না, তারাই এরকম পুরুষ চায় না আর। এসবে পুরুষের টনক নড়ল। নবজাগরিত, আলোকপ্রাপ্ত উনিশ শতকীয় বাঙালি পুরুষ বলল— “পৃথিবীস্থ লোকেরদের সঙ্গে আলাপ কুশল না থাকিলে তাঁহারদের অত্যল্প কুকর্ম্ম করিবার সম্ভাবনা হয়, কিন্তু আমরা এই কথায় বিশ্বাস করি না। স্ত্রীলোকেরা কিছু মাত্র উপদেশ না পাওয়াতে এবং ঠিক মতামত বিষয় ও যথার্থ অযথার্থ বোধ শিক্ষা না পাইলে তাঁহারদিগের মন সৎপথে থাকিবে এমত আমরা বোধ করি না…” (যতিচিহ্ন লেখকের)

অর্থাৎ তাদের ধরে ধরে শিক্ষা দিতে হবে— কেমন শিক্ষা? নীতিশিক্ষা। তখনও পুরুষ মনে করছে— মেয়েদের কোনো বোধ নেই। শিক্ষা দিয়ে পুরুষের সঙ্গে কথা বলার উপযোগী করে তোলা এবং পুত্রসন্তান— ভবিষ্যতের নাগরিকদের বড়ো করা— এই দুই কারণেই তো সে আলোকায়নের কালে মেয়েদের শিক্ষা দিতে চাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল; যৌন স্বাধিকারের প্রশ্নটাকে বেমালুম উপেক্ষা করে। তখনও মেয়েদের অবজেক্টিফাই করেছে পুরুষ।

একুশ শতকেও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে পারদর্শী মেয়েদের নিয়ে পুরুষ যতখানি উল্লাস করে— যৌন স্বাধিকারের প্রশ্নকে নিয়ে কি করে? এটা কি একটা স্বরকে দাবিয়ে দিতে চাওয়াই নয়? কেন মেয়েদের পৌরুষই প্রমাণ করতে হবে? কার্ত্তিকেয়ের মতো, রোমান্টিক নারীদের পুরুষ যত প্রশ্রয় দেয়, স্বাধীনচেতা মেয়েদের কি সে হিসেবে বারোভোগ্যা মনে করে না? অপবিত্র?

_________________________ 
বিঃ দ্রঃ বাৎসায়ন, কৌটিল্যের সঙ্গে সমস্ত ধ্রুপদী স্মৃতি-তন্ত্র-পুরাণ-মহাকব্যে ‘বেশ্যা’ একটা বিশেষ পেশার মহিলাদের বোঝানো হত। ফলে পাঠকদের কাছে অনুরোধ – তাঁরা যেন এটিকে বিশেষ টার্ম হিসেবেই দেখেন।
_________________________
তথ্যসূত্র:
দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায়ের আত্মজীবন চরিত— কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায়
কামসূত্রম্— বাৎসায়ন (শ্রীপঞ্চানন তর্করত্ন অনূদিত)
সংবাদপত্রে সেকালের কথা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)— ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
চন্দ্রকান্ত— কালিপ্রসাদ কবিরাজ
দূতীবিলাস— ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পুরাতন বাংলা গদ্যগ্রন্থ সংকলন— অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদিত)
উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান— সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
বাঙালির বটতলা— অদ্রীশ বিশ্বাস ও অনিল আচার্য (সম্পাদিত)

 

Developed by DXDasia