আমার অন্তর্যামী স্যার

‘তোমার কথা সব সময় বলেন – কোন গন্ডগ্রাম থেকে একা লড়ে উঠে এসেছে ছেলেটি’

এই বন্ধ্যা সময়ের ধূসর দিগন্ত থেকে চলে গেলাম কৈশোরের শিবিরে। বায়াস্কোপের ছবির মত দিন ….পর পর হাজির হচ্ছে বাক্স থেকে বের করা জামা কাপড়ের গায়ে মাখা ন্যাপথালিনের সুবাস নিয়ে। চোদ্দটি গ্রামের একমাত্র স্কুল- নাম তার "চতুর্দ্দশ পল্লী হাই স্কুল" – আমার মায়ের নামের জমিতে শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণের একমাত্র মাইলফলক।

মনে পড়ছে মুকুল স্যারের কথা। ১৫১৬ কিলোমিটার দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে স্কুল শুরু হবার এক- দেড় ঘণ্টা আগে আসতেন শুধু আমাকে additional math করাবার জন্য- দু বছর!তারপর স্যারের সাথে কোনো দিন দেখা হয়নি – এমনই এই পোড়া প্রফেশন! তারপর ইলেভেন টুয়েলভ। হাবড়া হাই স্কুলের কেমিস্ট্রির ডি সি (দিলীপ চ্যাটার্জি)স্যার। উনি না থাকলে আমার মত গেঁয়ো ভূত কোনোদিনও ডাক্তার হতে পারত না।

তখন জ্যোতি বসুর অন্ধকারের যুগ। প্রতিদিন তুমূল লোডশেডিং। হিজল পুকুরে স্যারের বাড়ি সন্ধ্যেবেলা পড়তে যেতাম। স্যার নিজে হাত পাখা দিয়ে প্রতিদিন আমাকে হাওয়া দিতেন। আমি তো লজ্জায় মরে যেতাম। খুব অস্বস্তি হতো। কোনোরকম আপত্তি করলেই খুব জোর ধমক খেতাম, " তোমাকে যা করতে দিয়েছি সেটা কর।" অগত্যা…।

হঠাৎ আমি হাবড়ায় স্যারের বাড়ির কাছাকাছি প্র্যাকটিস করতে লাগলাম এই কিছু দিন আগে থেকে। তাও alternate রবিবার। বুকের মধ্যে স্যারের জন্য অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে লাগলো। তার সাথে অপরাধবোধও। কতকাল হলো কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি !

২৩ মাসের মধ্যে এক ভদ্রলোক রুগী হিসেবে এসে আমাকে অবাক করে দিলেন। বললেন- ডি সি স্যার পাঠিয়েছেন আমাকে, বলেছেন তোমার রোগ যখন সারছে না তুমি সুরজিৎকে দেখাও। ও আমার ছাত্র। খুব বড় ডাক্তার হয়েছে । আমি কান্না আর থামাতে পারলাম না। কোনো মতে জিজ্ঞেস করলাম- স্যার কেমন আছেন ?আপনি চিনলেন কি করে? উনি বললেন, "আমরা বন্ধু । রিটায়ার করার পর থেকে পাশের ক্লাবে রবিবার আমরা রেগুলার আড্ডা দিতাম। কিন্তু ডি সি এখন আর আসতে পারেন না কারণ, ওনার স্ত্রী rheumatoid arthritis- এ বহু বছর শয্যাশায়ী, তাঁর সেবাতেই দিনরাত এক করে ফেলেছেন বছরের পর বছর ।" আমি হঠাৎই বলে ফেললাম স্যার কে বলবেন, আমি আজ চেম্বার শেষে যাবো । ভদ্রলোক যাওয়ার আগে ফোন নম্বর দিয়ে বললেন উনি তোমার কথা খুব বলেন।"

একটা পুরো যুগ যেন আমার ভেতরে উথালপাথাল করছে ! কোনো রকমে শেষ করলাম চেম্বার। অবর্ণনীয় একটা অনুভূতি, আধা অভিসারী আধা উদভ্রান্ত,হয়তো বা অন্য কিছু। প্রত্যয় ছিল বাড়িটা একবারে চিনে ফেলবো। ভুল! অবশেষে লোহার গেটের কাছে পৌঁছতেই দেখি অধীর আগ্রহে পাজামা আর ফতুয়া পরিহিত স্যার! লন পেরোতেই বললেন "এসো"।প্রণাম করতেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি কান্না চেপে ধরা গলায় বললাম স্যার আমার খুব অন্যায় হয়েছে এতদিন আপনার খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। উনি আমাকে মৃদু ধমকের সুরে বললেন, "তোমার যা দায়িত্ব তা কি বুঝিনা? মানুষের সেবা করছো। আর কি চাই।"

দোতলার ঘরে গেলাম। একটা বিশাল আলমারি কেমিস্ট্রি বইয়ে ঠাসা। অনেক বই ই আমার চেনা। স্যারের স্ত্রী শুয়ে খাটে উঠে বসে এমন অভর্থনা করলেন যেন কত যুগের চেনা এই বান্দা!

অতঃপর খাওয়ানোর পালা। গুরুমা বললেন," কখন থেকে তোমার পথ চেয়ে বসে আছেন তোমার স্যার। বাজার থেকে কত কী এনেছেন। আমি তো অথর্ব-জানোই। আর এই মানুষটিকে আশাকরি তোমরা চেনো। ওনার বাৎসল্য সত্যিই তারিফ করার মতো। আমাকে তো তোমার স্যারই বাচিঁয়ে রেখেছেন। তোমার কথা সব সময় বলেন – কোন গন্ডগ্রাম থেকে একা লড়ে উঠে এসেছে ছেলেটি।"

যাই হোক, অনেক কষ্টে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার আবদার খণ্ডন করলাম। তারপর যা হলো তা আমি যতদিন বাঁচবো শেষ নিঃশ্বাস অবধি মনে রাখবো। স্যার প্রায় জোর করেই আমাকে আবার চেয়ারে বসালেন। তারপর, নিজের হাতে আমাকে খাওয়াতে লাগলেন- যতই আপত্তি করি ততই বলেন " এই মিষ্টি খুব ভালো-খাও, এই আমটা অন্য রকম খেয়ে দ্যাখো, এটা আমি নিজে হাতে ধরে এনেছি।"

আমের কথায় মনে পড়ল ঘটনাটা গত বছরের গ্রীষ্ম কালের ছিল। তার মাস তিন/চার বাদেই স্যারের স্ত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। স্যার প্রচন্ড ভেঙে পড়েছেন। একদিন বাড়িতে গিয়ে দুজনে জড়াজড়ি করে প্রচুর কেঁদেছি। একজন বয়স্ক মানুষ এমন কাঁদতে পারেন সত্যি ই ভাবিনি- সেদিন চূড়ান্ত nihilistic কথা বলছিলেন। আমি নিরুপায় হয়ে বিজ্ঞের মত অনেক সান্ত্বনা দিলাম। শ্রাদ্ধে আর যাওয়া হয়নি- এমনই অধম আমি, এমনই নিষ্ঠুর এই পেশা! আমার বোনের মৃত্যুর দিনও তাই হয়ে ছিল।

কয়েক মাস আবার কেটে গেল দেখতে দেখতে। কেমন আছেন আমার স্যার-রূপী ভগবান? জানিনা।

এত বছরের অনিচ্ছাকৃত বিস্মৃতি স্যার যখন ক্ষমা করে পরম যত্নে আমায় বুকে টেনে নিতে পারেন, পরম যত্নে নিজের হাতে ৫৬ বছরের ছাত্র কে খাওয়াতে পারেন- নিশ্চয়ই আমাকে আরেকবার ক্ষমাও করবেন আমার অন্তর্যামী স্যার।

Developed by DXDasia