শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গীতপ্রিয়তা

কেন তাঁর কণ্ঠে গান শুনলেই শ্রোতারা অন্য জগতের মানুষ হয়ে যেতেন? যেন তাঁরা সাক্ষাৎ ঈশ্বরের সান্নিধ্যে এসেছেন

শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গীতপ্রিয়তার কথা বহুজনবিদিত। শ্রীশ্রীমা বলছেনঃ ‘আহা, গান গাইতেন তিনি(ঠাকুর), যেন মধুভরা, গানের উপর যেন ভাসতেন! সে গানে কান ভরে আছে। এখন যে গান শুনি, সে শুনতে হয় তাই শুনি।’ তিনি নিজে গান গাইতেন, অপরকে গাইতেও উৎসাহ দিতেন। কথামৃতে দেখি তাঁর কথায় কথায় গান। কেন এত গান? কারণ গানের ভেতর দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মর্মকথা বলেছেন। অন্য কোন ভাষা দিয়ে যা প্রকাশ করা যায় না। শ্রীরামকৃষ্ণকে বুঝতে গেলে তাঁর কথা ও গান দুই-ই নিতে হবে। কথার চেয়ে গান যেন সুগভীর, যেন অতলস্পর্শী। বহু কথার পরিবর্তে গানের একটা লাইন বা কয়েকটা কথা যেন বেশী ভাব প্রকাশে সক্ষম। শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে ঐ কথাগুলি যেন আরও সজীব, এর সরল। গভীরতম যে অনুভূতি তা কোন ভাষায় কখনও প্রকাশ করা যায় না। কবিতা বা গানের ভেতর দিয়ে একটু-আধটু প্রকাশ পায়। গভীর অন্তস্তলে সাধক যা অনুভব করেন, তা কি কখনও অপরকে বুঝানো যায়? কিন্তু আকস্মিক ভাবে সেই সাধকেরই কণ্ঠে সেই ভাব গানের সুর ও লয়ের রূপ নেয়। সাধক কাউকে খুশি করার জন্যে ঐ গান গান না। ‘গাই গীত শোনাতে তোমায়’- যেন তাঁর ইষ্টদেবতাকে শোনাচ্ছেন। ঐ গান যদি সাধারণ এক ব্যক্তি গান, তাঁর সুর, তাল, লয় যতই নিঁখুত হোক, তা একটা গান মাত্র। এর বেশী আর কিছু নয়। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের মতো একজন সাধক যদি ঐ গান গান, তাহলে তার অন্তনির্হিত ভাবগুলি আবার সজীব হয়ে ওঠে। তার চেহারা তখন আলাদা। যেন এক শক্তির জাগরণ হল, যাঁরা তাঁর মুখে গান শুনেছেন, তাঁরাই উপলব্ধি করেছেন। গান ভাব মুখ্য; আবার ভাষা, সুর তাল-মানও চাই। এগুলি আঙ্গিক, কিন্তু এদেরও প্রয়োজন আছে, এগুলিও নিখুঁত হওয়া চাই, নচেৎ সর্বাঙ্গসুন্দর হল না। শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবরাজ্যের মানুষ, কিন্তু তিনিও বেতালা বা বেসুরো গান সহ্য করতে পারতেন না, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পেতেন। অথচ তিনি যে খুব সঙ্গীতশাস্ত্র জানতেন, তা নয়। সঙ্গীত মানে শুধু সঙ্গীত-বিজ্ঞান নয়। শুদ্ধ সুর, তাল, মান অথচ ভাব নেই- এমন গান গান নয়। এমন গান কখনও মনকে স্পর্শ করতে পারে না। শুদ্ধ বিজ্ঞান তার সঙ্গে ভাব- তবেই সার্থক সঙ্গীত। সাধারণত শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামীজীর গান খুব পছন্দ করতেন। তিনি এলেই দু-চার কথার পর তাঁকে গান গাইতে বলতেন। কিছুক্ষণ গান শোনার পর হয়তো ভাবস্থও হয়ে পড়তেন, চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু পড়ত। নেচেছেন, সকলকে নাচিয়েছেন। কিন্তু এমনও ঘটেছে, স্বামীজীর গান পছন্দ করলেন না। বললেন- ‘আলুনী।’ কেন আলুনী, কারণ ভাববিহীন। যে কারণই হোক স্বামীজী সেদিন হয়তো ভাবজগতের অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে পারেননি। বাইরের দেউড়ি থেকেই বিদায় নিয়েছেন। তাই শ্রীরামকৃষ্ণের আলুনী লেগেছে।

শ্রীরামকৃষ্ণের গানের মাধুর্য ভাবে। তিনি এমন আবেগ দিয়ে গান গাইতেন যে শুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত। তাঁর ভাবে সবাই অনুপ্রাণিত হত। তিনি কাঁদলে সবার চোখে জল। বলা বাহুল্য শ্রীরামকৃষ্ণের গানে যেন তাঁর অন্তর্জীবনের দরজা-জানালা খুলে যেত, তার ভেতর দিয়ে হঠাৎ শীতল বাতাস এসে শ্রোতাদের ‘তপ্তজীবন’কে আনন্দ ও তৃপ্তি দিয়ে জুড়িয়ে দিতে যেত। এ এক আধ্যাত্মিক অনুভূতি!

লোকগুরু শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি গান গাইতেন, শখের গান নয়। তিনি গান গাইতেন লোকশিক্ষার জন্যে। সকলের মধ্যে ঈশ্বরীয় ভাব জাগানোর জন্যে। যার যেটুকু অভাব সেটুকু পূরণ করে দেবার জন্যে। কেউ হয়তো একটা প্রশ্ন করেছে, একটা গানের ভেতর দিয়ে তার উত্তর দিয়ে দিলেন। এ শুধু প্রশ্নের উত্তর নয়। সুপ্ত শক্তিকে জাগানো। মন্ত্র। শক্তির সঞ্চার। ‘ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিঃ ছিদ্যন্তে সর্বসংশয়াঃ’- এমন শক্তি। মনের যে আঁক-বাঁক, তা দূর করে দেয়। সন্দেহ অবিশ্বাস চলে যায়, নূতন এক শক্তির প্লাবনে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দু-একটা উদাহরণ দিলে বক্তব্যটা পরিষ্কার হবে।

কথামৃত পঞ্চম ভাগ সপ্তম অধ্যায়। তারিখ ১৭ জুন ১৮৮৩। শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে। নিজের ঘরে। কর্মফল নিয়ে কথা হচ্ছে এক তান্ত্রিক ভক্তের সঙ্গে। তান্ত্রিক ভক্তের প্রশ্ন কর্মফল খণ্ডন করা যায় কিনা।

‘তান্ত্রিক ভক্ত- আমাদের উপায় কি? কর্মের ফল তো আছে?
শ্রীরামকৃষ্ণ- থাকলেই বা। তাঁর ভক্তের আলাদা কথা।

এই বলিয়ে গান গাইতেছেন-

মন রে কৃষি কাজ জান না।
এমন মানব জমিন রইল পতিত, আবাদ কল্লে ফলতো সোনা।
কালী নামে দাওরে বেড়া, ফসলে তছরূপ হবে না।
সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, তা কাছেতে যম ঘেঁসে না।।
গুরুদত্ত বীজ রোপণ করে, ভক্তি বারি সেঁচে দে না।
এক যদি না পারিস মন, রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না।।’

শুধু কথাগুলিই অর্থবহ নয়, কিভাবে এই গানটি শ্রীরামকৃষ্ণ গেয়েছেন, তা-ও অর্থবহ। কথা ও ভাব দুই দিয়ে তান্ত্রিক ভক্তিটির মধ্যে শক্তি সঞ্চার করেছেন। এ যেন এক পাত্র থেকে আরেক পাত্রে দুধ ঢালা।

শ্রীরামকৃষ্ণ ‘প্রেমপাথার’। শুধু এক বিন্দু প্রেম দিয়ে তান্ত্রিক ভক্তটির আত্মগ্লানি দূর করে দিতে পারতেন। কিন্তু ‘গোরা’ প্রেম কলসে কলসে ঢালে’। তাই ‘আবার গান গাইতেছেন-

শমন আসবার পথ ঘুচেছে, আমার মনের সন্দ ঘুচে গেছে।
(ওরে) আমার ঘরের নবদ্বারে চারি শিব চৌকি রয়েছে।।
এক খুঁটিতে ঘর রয়েছে, তিন রজ্জুতে বাঁধা আছে।
সহস্রদল কমলে শ্রীনাথ অভয় দিয়ে বসে আছে।।’

গানের পরে শ্রীরামকৃষ্ণ  বলছেন- ‘কাশীতে ব্রাহ্মণই মরুক, আর বেশ্যাই মরুক শিব হবে। যখন হরি নামে, কালী নামে, রাম নামে, চক্ষে জল আসে, তখনই সন্ধ্যা-কবচাদির কিছুই প্রয়োজন নাই। কর্মত্যাগ হয়ে যায়। কর্মের ফল তার কাছে যায় না।’ শ্রীরামকৃষ্ণ আবার একটি গান গাইলেন। তাঁর করুণা যেন উথলে উঠছে।–

ভাবিলে ভাবের উদয় হয়।
যেমনি ভাব, তেমনি লাভ মূল সে প্রত্যয়।
কালীপদ সুধাহৃদে চিত্ত যদি রয়,
যদি চিত্ত ডুবে রয়।
তবে পূজা হোম যাগ যজ্ঞ কিছুই কিছু নয়।

আরও একটি

ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়।
সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফিরে, কভু সন্ধি নাহি পায়।।
গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কেবা চায়।
কালী কালী বলে আমার অজপা যদি ফুরায়।।

এর পর শ্রীরামকৃষ্ণ গানগুলির মর্মার্থ বলছেন-‘তাঁতে মগ্ন হলে আর অসৎ বুদ্ধি, পাপবুদ্ধি থাকে না।

তান্ত্রিক ভক্ত-আপনি যা বলেছেন “বিদ্যার আমি” থাকে।

শ্রীরামকৃষ্ণ-বিদ্যার আমি, ভক্তের আমি, দাস আমি, ভাল আমি, থাকে। বজ্জাত আমি চলে যায়। (হাস্য)

তান্ত্রিক ভক্ত- আজ্ঞা, আমাদের অনেক সংশয় চলে গেল।

শ্রীরামকৃষ্ণ- আত্মার সাক্ষাৎকার হলে সব সন্দেহ ভঞ্জন হয়।’

এখানে দেখছি শ্রীরামকৃষ্ণ গানের মাধ্যমে তাঁর বাণী প্রচার করছেন। যা কথায় বলতে পারতেন, তা গানে বলছেন। বেদের ঋষিরা যেমন করেছেন। এ বাণীপ্রচার কত সার্থক, তা তান্ত্রিক ভক্তের শেষ উক্তি দিয়েই বুঝতে পারা যায়। শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের পর অর্জুন যেমন বলেছিলেন- ‘নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লদ্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত/ স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব,’ তেমনই এই তান্ত্রিক ভক্তটিও বলছেন- ‘আমাদের অনেক সংশয় চলে গেল।’

শ্রীরামকৃষ্ণ ছোটবেলা থেকেই সুকণ্ঠ ছিলেন। বহু ভজন-কীর্তন তখন পল্লী-অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, বাউল ও বহু প্রকারের লোকগীতি শুনতে পাওয়া যেত। শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রুতিধর ছিলেন। একবার একটা গান শুনলেই তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত। কথায় কথায় সেই সব গান বেরিয়ে আসত। যেখানে যে গান মানায়। পল্লীবাসীরা মুগ্ধ হয়ে শুনত সেই সব গান। আনন্দের হাট বসিয়ে দিতেন। সব রকম রসের গান গাইতেন। প্রাণ ঢেলে গাইতেন। ভক্তিরসের গান গাইলে তাঁর চোখ সজল হয়ে উঠত। শ্রোতাদেরও চোখ সজল হত। ‘যত্র ভাবস্তত্র হরিস্তস্মাদ্‌ ভাবো হি কারণম্‌।’ শ্রীরামকৃষ্ণ গানের ভেতর দিয়ে ভাবের বন্যা বইয়ে দিতেন। শ্রোতারা কিছু সময়ের জন্যে যেন অন্য জগতের মানুষ হয়ে যেতেন। যেন তাঁরা সাক্ষাৎ ঈশ্বরের সান্নিধ্যে এসেছেন। যেন বৈকুণ্ঠে এসে গেছেন। এই পরিবর্তন একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণই ঘটাতে পারতেন। স্পর্শমণি তিনি। যাদুকর। সব মতের মানুষকে তিনি যাদু করেছেন। গান তাঁর অন্যতম যাদুকাঠি। গানের ভেতর দিয়ে তাঁর ভাবকে অর্থাৎ তাঁর সত্তাকে সকলের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছেন। তাই তাঁর গানের শক্তি অপ্রতিরোধ্য।

(রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার প্রকাশিত স্বামী লোকেশ্বরানন্দ সম্পাদিত 'শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় সঙ্গীত'-বই -এর ভূমিকা )

Developed by DXDasia