মিরিক জিতে পাহাড়ে পা তৃণমূলের

পুরভোটের ফল, বিজেপির পালে নেই কাঁথির হাওয়া

রাজ্যের ৭ পুরসভার ভোট নিয়ে তরজা আদালত পর্যন্ত পৌছেছিল। অবশেষে সেই ভোট হয়ে গেল ১৪ মে ২০১৭ রবিবার। ভোটগণনা হলো ১৭ মে। প্রথেমই চোখ রাখা যাক কিছু তথ্যের দিকে।

এই চার পুরসভার প্রথম তিনটি দার্জিলিং জেলায় ও কালিম্পং পুরসভা নবগঠিত একই নামের জেলায় পড়ে। এই চার পুরসভার সবকটিতেই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা প্রকৃতপক্ষে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল, আগেরবার ভোট হয়েছিল ১১ ডিসেম্বর ২০১১-তে।

প্রথমে পাহাড়ের কথায় আসি। বিধানসভা ভোটের সময় চারটি পুরসভাই দার্জিলিং জেলায় ছিল। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (জিজেএম)-কে সব বিরোধীরা অর্থাৎ সিপিআইএম, কংগ্রেস ও বিজেপি সমর্থন করেছিল। ফলে লড়াই হয়েছিল জিজেএম ও টিএমসি-র মধ্যেসরাসরি। দার্জিলিং বিধানসভার মধ্যে ওই নামের পুরসভাটি ছাড়াও কিছু গ্রামাঞ্চল পড়ে। একই কথা কালিম্পং বিধানসভার জন্যও প্রযোজ্য। কালিম্পং-এ জিজেএম ছেড়ে বেরিয়ে আসা এক নেতা হরকা বাহাদুর ছেত্রি-কে সমর্থন করেছিল টিএমসি। হরকা বাহাদুর বর্তমানে নিজের দল গড়ে এই পুরভোটে লড়েছেন।  মিরিক ও কার্শিয়ং পুরসভা দুটিই কার্শিয়ং বিধানসভায় পড়ে, সঙ্গে রয়েছে কিছু গ্রামাঞ্চলও। ২০১৬ সালে ভোটপ্রাপ্তি এরকম। আবার ২০১৭-র পুরভোটে বিজেপি জিজেএম-কে সমর্থন করেছে।

২০১৬ বিধানসভা ভোট থেকেই এটা পরিষ্কার, পাহাড়ে জিজেএম-এর একছত্র আধিপত্যের দিন শেষ।

এবার আসি অন্য তিন পুরসভার কথায়। রায়গঞ্জ ও ডোমকল পুরসভা ওই নামেরই বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে, যদিও পুর এলাকার থেকে বড় গ্রামাঞ্চল কেন্দ্রগুলিতে রয়েছে। রায়গঞ্জে বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থী জেতে। ডোমকলে বাম-কংগ্রেস জোট হয়নি, চতুর্মুখী লড়াইয়ে সিপিএম প্রার্থী জিতে যায়। পূজালি পুরসভাটি বজবজ বিধানসভার মধ্যে পড়ে, এটি ছাড়াও আরেকটি পুরসভা ও গ্রামাঞ্চলও বজবজ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। আমরা একটা আন্দাজ পাবার জন্য ২০১৬ সাএলর বিধানসভা ও ২০১৭ সালের পুরভোটের ফল তুলনা করে দেখব।

প্রথমেই পাহাড়ের কথায় আসি। পাহাড়ে এবারের ফল খুবই তাৎপর্যবাহী। গত তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে পাহাড়ে ভোটই হয়নি। যখন সুবাস ঘিসিং-এর আধিপত্য ছিল, সেই সময় থেকেই। এটা খুবই নজরকাড়া বিষয় যে বামফ্রন্ট ওই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে পাহাড়ে যাতায়াতই বন্ধ করে দিয়েছিলেন বাম নেতারা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে সেই একচেটিয়া কারবারটা ভেঙে দিয়েছেন। কতবার যে তিনি পাহাড়ে গেছেন, সভা করেছেন, পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল গেছেন, তা আমাদের মনে আছে। মনে আছে পাহাড়বাসীরও। তার ফলেই সেখানে ফিরে এসেছে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সুস্থ পরিবেশ।

মিরিকের জয়ের পিছনে অবশ্য এ ছাড়াও রয়েছে জমির পাট্টাদান সংক্রান্ত তৃণমূলের ঘোষণা। যাদের বসবাসের জমির উপর কোনও আইনি অধিকারই নেই, তারা আশায় বুক বেঁধে মমতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সেই তুলনায় কালিম্পং-এর ফল তৃণমূলের পক্ষে কিছুটা হতাশাজনক। নতুন জেলা ঘোষণার পর যে উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা ধরা গেল না হয়ত কিছটা কৌশলগত ভুলেই। হরকা বাহাদুর ছেত্রির সঙ্গে বোঝাপড়া করে বিধানসভা ভেটা লড়েছিল তৃণমূল। সেই সমঝোতা বজায় থাকলে কালিম্পং-এও হারতে পারত মোর্চা। দার্জিলিং ও কার্শিয়ং-এ যা হবার ছিল, তাই হয়েছে। তবে পাহাড়ের সর্বত্রই তৃণমূল যে দাপটে লড়ে গেছে, সেটা যেন নজর না এড়ায়।

সমতলে ডোমকল পুরসভার ফল সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য রাজনীতির প্রতিফলন। সংখ্যালঘু ভোট যে ব্যাপকভাবে তৃণমূলমুখী, সিপিএম ও কংগ্রেস থেকে প্রস্থান এখন যে অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, সেটাই আবার প্রমাণিত হলেভচ্চ। একই কথা রায়গঞ্জ ও পূজালির জন্যও খাটে।

সমতলের তিন পুরসভা ভোটের ব্যাপারে নানা অভিযোগ উঠেছে। কয়েক জায়গায় মারামারি যে হয়েছে, তা তো দেখাই গেছে। কিন্তু তাই বলে এই ফলের পুরোটাই ভুয়ো, এমন মতের সঙ্গে একমত হলে ঠকতে হবে। এর আগে কোচবিহার লোকসভা বা সম্প্রতি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা উপভোটও আমরা দেখেছি। সেখানে কিন্তু সিপিএম ও কংগ্রেসের ভোট বিজেপিতে গিয়ে বিজেপির ভোট ২৮-৩০ শতাংশ উঠে গিয়েছিল। উপনির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও বিজেপির সেই উত্থান তৃণমূল ঠেকাতে পারেনি। এবার পুরভোটে কিন্তু বিজেপির সেই দাপটটা মিইয়ে গেছে। ভোট শতাংশতেও তা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, হয়ত, বিজেপির সবথেকে বাড়বাড়ন্ত আমরা দেখে নিয়েছি; আরও ওঠাটা আর না-ও হতে পারে।

Developed by DXDasia