‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ কালিদাসের মেঘ আসিয়া আমাদিগকে ঘরছাড়া করিয়া দিল

৩০৮ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের কোনও এক দিন রবীন্দ্রনাথ যখন ‘নববর্ষা’ লিখছেন, তাঁর জীবনে ভাইরাস জর্জরিত বিধিনিষেধের চৌকাঠ ছিল না। তবু তিনিও যেন অদৃশ্য-অমোঘ কোনও বিধিনিষেধের চৌকাঠ পেরিয়ে বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন আষাঢ়ের প্রথম দিনে, মেঘদূতের সঙ্গে। “পূর্বমেঘে বৃহৎ পৃথিবী আমাদের কল্পনার কাছে উদঘাটিত হইয়াছে। আমরা সম্পন্ন গৃহস্থটি হইয়া আরামে সন্তোষের অর্ধনিমীলিতলোচনে সে গৃহটুকুর মধ্যে বাস করিতেছিলাম, কালিদাসের মেঘ ‘আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে’ হঠাৎ আসিয়া আমাদিগকে সেখান হইতে ঘরছাড়া করিয়া দিল।” এমনই আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দের পয়লা আষাঢ়ে আমরা বোধহয় আক্ষরিক অর্থে সেই আকাঙ্ক্ষাই করছি – যেন কয়েদখানা থেকে মুক্তির ডাক এসেছে।

মহাকবি কালিদাস তাঁর ‘মেঘদূতম্’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহী যক্ষ মেঘকে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সেই বার্তা সঞ্চারিত হয়ে চলেছে প্রতিটি বিরহকাতর মনে, যুগ যুগ ধরে। তবে, বিরহ যে সবসময় প্রিয়ার জন্যই অনুভূত হবে, এরকম কোনও ‘গ্যারান্টি’ নেই। আসলে, পাঠকের মনকে কবি বিরহের বেগে বাইরে টেনে আনেন, অথচ সেই প্রক্রিয়া মন্থর। যে চরম জায়গায় মন পৌঁছে যেতে চায়, তার সুদীর্ঘ পথটিও মনোহর, সে পথকে উপেক্ষা করা যায় না।

বর্ষায় অভ্যস্ত পরিচিত সংসার থেকে সরে গিয়ে মন ক্রমাগত বাইরের পথে বেরিয়ে পড়তে চায়, পূর্বমেঘে কালিদাস আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকেই জাগিয়ে দেয়, অন্য এক পৃথিবীতে নিয়ে যায়, যে পৃথিবীর ক্ষয়ক্ষতি নেই

বর্ষায় অভ্যস্ত পরিচিত সংসার থেকে সরে গিয়ে মন ক্রমাগত বাইরের পথে বেরিয়ে পড়তে চায়, পূর্বমেঘে কালিদাস আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকেই জাগিয়ে দেয়, অন্য এক পৃথিবীতে নিয়ে যায়, যে পৃথিবীর ক্ষয়ক্ষতি নেই। সে পৃথিবীতে আমাদের পরিচয়ের প্রাচীরে বাধা পায় না কল্পনা। কারণ সে পৃথিবী কল্পনার। কল্পনার অজানা পৃথিবীর সঙ্গে নতুন পরিচয়, এই হল পূর্বমেঘ।

আষাঢ়ের মেঘ প্রতি বছর যখনই আসে, নতুনত্বে ভরপুর ও পুরাতনত্বে পুঞ্জীভূত হয়ে আসে। পুরাতন ঝরে যায়, জন্ম হয় নতুনের। রবীন্দ্রনাথেরও মেঘদূত ছিল, আমাদেরও আছে। একবিংশ দশকেও কালিদাসের এই কাব্যের কোনও বিকল্প নেই। বর্ষার যাবতীয় অন্তর্বেদনা চিরকালীন ভাষায় লেখা হয়ে আছে তাতে।

কালিদাস উজ্জ্বয়িনীর প্রাসাদশিখর থেকে যে আষাঢ়ের মেঘ দেখেছিলেন আমরাও সেই মেঘ দেখছি, পরিবর্তমান মানুষের ইতিহাস তাকে ছুঁতে পারেনি, ভাইরাস-ভ্যাকসিন-আশা-নিরাশার উর্দ্ধে সে। আষাঢ়ে মেঘ হলো পথিক, সে আসে যায়, থেমে থাকে না–“…আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/ পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/ নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে…আবার আষাঢ় এসেছে আকাশ ছেয়ে।”

Written by