৯০ পেরিয়ে শিলিগুড়ির মিত্র সম্মিলনীর পুজো

এবারের পুজোয় কার্তিক-গণেশের পাপ্তি সোনার পৈতে

শিলিগুড়ি শহরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মিত্র সম্মিলনীতে এবার মা দুর্গার দুই সন্তান গণেশ ও কার্তিককে সোনার পৈতে পরানো হবে। বিভিন্ন সময় ক্লাবের সদস্য ও অন্য ভক্তরা পুজোর সময় মানত করে সোনার অলঙ্কার মা দুর্গার কাছে দিয়ে যান। সেই সব জমিয়েই এবারে ৯১তম বর্ষের পুজোয় মিত্র সম্মিলনী গণেশ ও কার্তিককে সোনার পৈতে পরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯২৭ সালে শুরু হওয়া মিত্র সম্মিলনীর পুজোর এবারের থিম সাবেকিয়ানা।

১৯০৯ সালে শিলিগুড়ি হিলকার্ট রোডের ধারে তৈরি হয়েছিল মিত্র সম্মিলনী। এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। রাজ্যের প্রয়াত প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি আনন্দময় ভট্টাচার্যের দাদু ছিলেন সুরেন্দ্রবাবু। সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের হাত ধরে জন্ম নেওয়া মিত্র সম্মিলনী ছিল তখনকার শিলিগুড়ির বঙ্গসমাজের মহামিলনের ক্ষেত্র। যদিও এর প্রথম নাম ছিল ফ্রেন্ডস অফ ইউনিয়ন। ১৪ কাঠা জমির ওপর শুরু হয় ক্লাবের কাজ। জমি দেওয়ার সময় সুরেন্দ্রবাবু শর্ত দিয়েছিলেন, প্রতি বছর সরস্বতী পুজো ও দুর্গা পুজো মিত্র সম্মিলনীতে করতেই হবে। সেই হিসাবে প্রথমে ৪০জন সদস্য নিয়ে শুরু হয় পুজো। এখন সেখানে সদস্য সংখ্যা দুশো।

সেই সময় শিলিগুড়িতে বিনোদন বলতে মিত্র সম্মিলনীর নাটক বিখ্যাত ছিল। প্রয়াত নকশাল নেতা চারু মজুমদার এক সময় মিত্র সম্মিলনীতে নাটক করেছেন। বিশের দশকে ‘সীতা’ নাটক মঞ্চস্থ করতে এখানে এসেছিলেন শিশির ভাদুড়ী। সেই সময় হ্যাজাকের আলোয় অভিনয় হত। মিত্র সম্মিলনীর বৈশিষ্ট্য হল নিয়মিত তাস খেলা, আড্ডা, নাটক ও অভিনয়। নাটক নির্বাচনের পর রিহার্সাল শুরু হলে শহরে সাড়া পড়ে যেত। বর্ধমানের মৃৎশিল্পীরা ডাকের সাজের প্রতিমা গড়ে দিতেন শিলিগুড়ির ঐ ক্লাবের জন্য। সেই সময় পুজোর তিনদিন শহরের মানুষ আর চা বাগানের বাবুরা সপরিবারে প্রতিমা দর্শন ও নাটক দেখতে আসতেন মিত্র সম্মিলনীতে। অনেকেই মোষের গাড়িতে চেপে তরাইয়ের চা বাগান থেকে শিলিগুড়ির সেই পুজো দেখে আসতেন। সপ্তমী ও নবমীর রাতে বিনা টিকিটে ডে লাইট ঝুলিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করা হত। সেই মিত্র সম্মিলনীর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক উদয় দুবে জানিয়েছেন, পুরানো নিয়ম মেনে তাঁরা এখন এক চালার ডাকের সাজের প্রতিমা তৈরি করেন। তবে তিনটি চালাকে নাটবল্টু দিয়ে টাইট করে এক চালায় করা হয়। নিয়ম মেনে ষষ্ঠীর বোধন হয়। তারপর অধিবাস। অধিবাসে মা দুর্গাকে সোনার গয়না পরানো হয়। সাবেকিয়ানা বজায় রেখে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে পুজো হবে। দশমীর দিন সিঁদুর খেলা হয় প্রথা মেনে। আর বারোটার পর দশমীর দিন প্রতি বছর বিসর্জন হয়। এবারেও তা হবে। এই পুজো মাত্র এক হাজার টাকা বাজেট নিয়ে শুরু হয়েছিল বলে উদয়বাবু জানান। আজ তার বাজেট আড়াই লক্ষ টাকা। রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। তবে এত বছর হল ঘর লাগোয়া বেদিতে প্রতিমা তৈরি হত। এবার তা হচ্ছে না। এক সময় কাঠ ও বেড়া দিয়ে এই ক্লাব শুরু হয়। পরে তা সংস্কার করে পাকা দোতলা করা হয়, তৈরি হয় হলঘরও। উদয়বাবু আরও জানিয়েছেন, নিয়ম মেনে এবারেও তাঁরা মহালয়ার দিন বসে আঁকো প্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন। বিজয়া সম্মিলনীতে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সেটা ৬ অক্টোবর। সেই অনুষ্ঠানে শ্রুতি নাটক হবে। সেখানে তিনজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। যাঁরা সংবর্ধিত হবেন তাঁরা হলেন সঞ্জয় চক্রবর্তী, প্রয়াত চারু মজুমদারের ছেলে অভিজিৎ মজুমদার ও দেবাশিস চক্রবর্তী।

Developed by DXDasia