গোরুদের সঙ্গে বাঘেদের সামরিক চুক্তি

মানুষের মা হতে নারাজ গোরুর দল, হুমকি যুদ্ধের

আমার এক বন্ধু এক মিল্ক কোঅপারেটিভে প্রায় ৩০ বছর কাজ করে সদ্য রিটায়ার করেছে। সেই কোম্পানির ছিল প্রায় হাজার দুয়েক গোরু। গোরুদের সঙ্গে থাকতে থাকতে ভদ্রলোক গোরুদের ভাষা শিখে গিয়েছিলেন। শিখে গিয়েছিলেন মানে বলতে পারতেন না, কিন্তু বুঝতে পারতেন। তার কাছে গল্পটা শোনার পর থেকে বেশ ভয়ে ভয়ে আছি। গল্পটা তার মুখেই শোনা যাক।

রাতে শুয়ে আছি। ঘুম আসছে না। হঠাৎ গোরুদের কথা কানে এল। সবাই বলছে, চল, চল, দেরি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা কী দেখতে গোরুদের পিছু পিছু গেলাম। গিয়ে দেখি, মাঠে গোরুদের সভা। দেখলাম এক রোগা মতো গোরু, চশমা টসমা পরা। স্টিফেন হকিংয়ের ‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’-এর মতো একটা বই লিখেছে, নাম দিয়েছে, ‘বিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’। সে বইয়ের উদ্বোধন হল ওই সভায়। সভাপতি গোছের একটা গোরু বলল, আমাদের একটা জাতীয় সঙ্গীত চাই। সেটা আপাতত দুই লাইন লেখা হয়েছে। সেটাই এখন আমরা গাইব। তারপর, পরের সভায় যদি আরও লাইন লেখা হয়, তখন সেটা গাইব। এখন ওই দুই লাইন। বলতেই হাজার হাজার গোরু গেয়ে উঠল, ‘গো-দের গরব গো-দের আশা/ আমরি গো-দের ভাষা। বার দশেক এই দু’লাইন বেশ সুর করে গোরুর দল গাইতে থাকল। যতক্ষণ না সভাপতি গোরু বলল, ব্যাস ব্যাস এবার থামো। পরের বক্তাগোরু লেজ দুলিয়ে মঞ্চে উঠে বলল, আপনারা ওই ‘বিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ বইটা পড়বেন। একটা সুসম খাদ্য শৃঙ্খলের মধ্যে আমরা ছিলাম। কতগুলো অর্বাচীন আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে অসভ্যের মতো নাক গলাচ্ছে। আমাদের হিসি, গোবর নিয়ে কথা বলছে। লজ্জায় আমাদের মাথা কাটা যাচ্ছে। ব্যাটারা বলে কি না আমাদের ওদের মা হতে হবে! কেন রে? তোদের কী মা কম পড়েছে? আমরা নিজেদের বাছুর সামলে এমনিতেই সময় পাই না। তার উপর আবার ওই অসভ্য দুপেয়েদের মা! আমাদের বয়ে গেছে। তোরা বরং মোষ টোসকে মা কর, ওদের বিদ্যে বুদ্ধি কম, ওরা গদ গদ হয়ে মেনে নেবে। গোরু কি তোদের বাপের না কি যে যা ইচ্ছে বলবি? বিফ বন্ধ করে কী চাস তোরা?ভালোবাসা দেখাচ্ছিস! খাদ্য শৃঙ্খলটা ভেঙে দিলি। এর পর হাজার কোটি গোরু শহরে গ্রামে ঘুরে বেড়াবে। এক টুকরো জমি দেখলেই তো প্রোমটারি করার জন্য জিভ লক লক করে তোদের। এই হাজার হাজার কোটি গোরুর ঘাস খড় কোথ্থেকে আসবে শুনি? নির্বোধের দল! আমরা বাপু মার দাঙ্গা পছন্দ করি না বলে সেই কবে থেকে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে থাকি। দুধ দিই, বিনিময়ে ঘাস টাস খাই। ফুল বার্টার সিস্টেম। এর মধ্যে মা-ফা আসে কোথ্থেকে। যত্ত সব! পারিস তো দে না দু’টাকা কিলো পেপে, ফুলকপি, ভিন্ডি, বেগুন। তার বেলা নেই, বলে কি না আধার কার্ড করাবে গোরুদের! আয় না! শিং-এ সান দিয়ে রেখেছি। সিপিএম বলেছিল না লাইফ হেল করে দেব! আমরাও তাই করে ছাড়ব তোদের! অচ্ছে দিন, টচ্ছে দিন নিয়ে থাক। কোনও অসুবিধে নেই। বাড়াবাড়ি করিস না। বক্তার বক্তব্য শেষ হতেই হাত তালির মতো প্রবল ভাবে মাটিতে লেজ আছড়ে শব্দ করল গোরুর দল। দ্বিতীয় গোরুবক্তা বলতে শুরু করল তার পর। সে বলল, আমি সম্প্রতি সুন্দর বনে গিয়েছিলাম। সেখানে বাঘেদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা খুব ভয়ে ভয়ে আছে। তাদের ভয়, এবার জাতীয় পশু বাঘেদের দিন শেষ হতে চলেছে। গুজরাটের সিংহকে নাকি জাতীয় পশু করা হতে পারে। বাঘেরা বলল, এখন থেকে বাঘে গোরুতে এক ঘাটে জল খাবে। এনাফ ইজ এনাফ। ফের যদি বাঘ বা গোরুদের ব্যাপারে কেউ নাক গলায়, বাঘে গোরুতে এক হয়ে লড়বে। এই পর্যন্ত বলতেই জয়গোরু জয়গোরু বলে গোরুর দল চিৎকার করতে শুরু করল। হঠাৎ কে যেন বলে উঠল, এইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। যেই বলা, অমনি সব গোরু চোঁচা দৌড়ে যে যার গোয়ালে গিয়ে লক্ষ্মীগোরুর মতো জাবর কাটতে শুরু করল।

বুঝলাম গোটা দেশ একেবারে গো-বারুদের স্তূপের উপর বসে আছে। অপেক্ষা শুধু একটা দেশলাই কাঠির।

Developed by DXDasia