‘মৃত মাইকেল মধুসূদন দত্ত’

‘অকপটে বাঙ্গালী, বাঙ্গালী কবির জন্য রোদন করিতেছে’

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 
আজি বঙ্গভূমির উন্নতি সম্বন্ধে আর আমরা সংশয় করি না—এই ভূমণ্ডলে বাঙ্গালি জাতির গৌরব হইবে। কেন না বঙ্গদেশ রোদন করিতে শিখিয়াছে—অকপটে বাঙ্গালী, বাঙ্গালী কবির জন্য রোদন করিতেছে।

যে দেশে এক জন সুকবি জন্মে, সে দেশের সৌভাগ্য। যে দেশে সুকবি যশঃ প্রাপ্ত হয়, সে দেশের আরও সৌভাগ্য। যশঃ, মৃতের পুরস্কার—জীবিতের যথাযোগ্য যশঃ কোথায়? প্রায় দেখা যায়, যিনি যশের পাত্র, তিনি জীবিতকালে যশস্বী নহেন; যিনি যশের অপাত্র, তিনি জীবিতকালে যশস্বী। সক্রেতিস্ এবং যীশুখ্রীষ্টের দেশীয়েরা, তাঁহাদিগকে অপমান করিয়া প্রাণদণ্ড করিয়াছিল। কোপরনিকস্, গেলিলীয়, দান্তে প্রভৃতির দুঃখ কে না জানে? আবার হেলি, সিওয়ার্ড মহাকবি বলিয়া খ্যাত হইয়াছিলেন। এ দেশে, আজিও দাশরথি রায়ের একটু যশঃ আছে। যে দেশের শ্রেষ্ঠ কবি যশস্বী হইয়া জীবন সমাপন করেন, সে দেশ প্রকৃত উন্নতির পথে দাঁড়াইয়াছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে যশস্বী হইয়া মরিয়াছেন, ইহাতে বুঝা যায় যে, বাঙ্গালা দেশ উন্নতির পথে দাঁড়াইয়াছে।

বাঙ্গালা প্রাচীন দেশ। যাঁহারা ভূতত্ত্ববেত্তাদিগের মুখে শুনেন যে, বাঙ্গালা নদীমুখনীত কর্দমে সম্প্রতি রচিত, তাঁহারা যেন না করেন যে, কালি পরশ্ব হিমাচলপদতলে সাগরোর্মি প্রহত হইত। সেরূপ অনুমানশক্তি কেবল হুইলর সাহেবের ন্যায় পণ্ডিতেরই শোভা পায়। কিন্তু এই প্রাচীন দেশে, দুই সহস্র বৎসর মধ্যে কবি একা জয়দেব গোস্বামী। শ্রীহর্ষের কথা বিবাদের স্থল—নিশ্চয়স্থল হইলেও শ্রীহর্ষ বাঙ্গালী নহেন। জয়দেব গোস্বামীর পর শ্রীমধুসূদন।

যদি কোন আধুনিক ঐশ্বর্য-গর্বিত ইউরোপীয় আমাদিগের জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের আবার ভরসা কি?—বাঙ্গালির মধ্যে মনুষ্য জন্মিয়াছে কে? আমরা বলিব, ধর্মোপদেশকের মধ্যে শ্রীচৈতন্যদেব, দার্শনিকের মধ্যে রঘুনাথ, কবির মধ্যে শ্রীজয়দেব ও শ্রীমধুসূদন।

<স্মরণীয় বাঙ্গালির অভাব নাই। কুল্লূক ভট্ট, রঘুনন্দন, জগন্নাথ, গদাধর, জগদীশ, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, মকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র, রামমোহন রায়, প্রভৃতি অনেক নাম করিতে পারি। অবনতাবস্থায়ও বঙ্গমাতা রত্নপ্রসবিনী। এই সকল নামের সঙ্গে মধুসূদন নামও বঙ্গদেশে ধন্য হইল! কেবলই কি বঙ্গদেশে? 

আমাদের ভরসা আছে। আমরা স্বয়ং নির্গুণ হইলেও, রত্নপ্রসবিনীর সন্তান। সকলে এই কথা মনে করিয়া, জগতীতলে আপনার যোগ্য আসন গ্রহণ করিতে যত্ন কর। আমরা কিসে অপটু? রণে? রণ কি উন্নতির উপায়? আর কি উন্নতির উপায় নাই? রক্তস্রোতে জাতীয় তরণী না ভাসাইলে কি সুখের পারে যাওয়া যায় না? চিরকালই কি বাহুবলই একমাত্র বল বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে? মনুষ্যের জ্ঞানোন্নতি কি বৃথায় হইতেছে? দেশভেদে, কালভেদে কি উপায়ান্তর হইবে না?

ভিন্ন ভিন্ন দেশে জাতীয় উন্নতির ভিন্ন ভিন্ন সোপান। বিদ্যালোচনার কারণেই প্রাচীন ভারত উন্নত হইয়াছিল, সে পথে আবার চল, আবার উন্নত হইবে। কাল প্রসন্ন—ইউরোপ সহায়—সুপবন বহিতেছে দেখিয়া, জাতীয় পতাকা উড়াইয়া দাও—তাহাতে নাম লেখ “শ্রীমধুসূদন।”

বঙ্গদেশ, বঙ্গ কবির জন্য রোদন করিতেছে। বঙ্গ কবিগণ মিলিয়া বঙ্গীয় কবিকুলভূষণের জন্য রোদন করিতেছেন। কবি নহিলে কবির জন্য রোদনে কাহার অধিকার?

(‘বঙ্গদর্শন’, ভাদ্র, ১২৮০)

একদিন দক্ষিণের বারান্দায় অবনীন্দ্রনাথ পাথর দিয়ে একটি ইঁদুর তৈরি করেছেন। এমন সময় সেটি বারান্দার রেলিং টপকে নিচে পড়ে যায়। অন্ধকারের জন্য সেটা খোঁজা যাচ্ছে না। খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অবনীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো বাড়ির বাগানে সেটিকে খুঁজছেন। এমন সময় বাদশা(সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর) এসে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কী খুঁজছ দাদামশাই? অবনীন্দ্রনাথ বলেন, কালকের ইঁদুরটি মনে হয় জ্যান্ত হয়ে গর্তে ঢুকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে স্যাঙাতরা নেমে পড়লো ইঁদুর খুঁজতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটা তখনের মতো না পাওয়া গেলেও গুরু জিনিসটা খুঁজে বার করার জন্য সকাল সন্ধ্যে সকল স্যাঙাতরা একবার করে জোড়াসাঁকো বাড়ির বাগান খুঁজে বেড়াত। যদি পাওয়া যায়। কারণ গুরু তাদের বলেছেন – ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই পেলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’  

একবার বাড়ির অবন দাদামশাইয়ের স্যাঙাতরা হাতে লিখে পত্রিকা বার করলে। নাম দেওয়া হল ‘দেয়ালা’। অবন দাদামশাই স্যাঙাতদের চুপি চুপি নির্দেশ দিলেন “যা গিয়ে বড় দাদামশাইকে(গগনেন্দ্র ঠাকুর) ধর।” যেমন বলা তেমন কাজ। স্যাঙাতরা গিয়ে ধরল গগন দাদামশাইকে। দাবি, তাদের পত্রিকায় বড় দাদামশাইকে একটা লেখা লিখে দিতে হবে। গগন দাদামশাই ফেলতে পারলেন না স্যাঙাতদের কথা। কলম ধরলেন। লিখেও ফেললেন একখানা গল্প। নাম দিলেন ‘দাদা-ভাইয়ের দেয়ালা’। পরবর্তী কালে এই গল্পটিই ‘ভোঁদর বাহাদুর’ নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সিগনেট প্রেস থেকে। গগনন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র এই মহৎ সাহিত্য কীর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু অবন দাদামশাইয়ের স্যাঙাত মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর সহচরদের দৌলতেই। 

অবনীন্দ্রনাথ তার গুরু রবিকা কাছ থেকে স্বদেশী আন্দোলনের যে বাণী পেয়েছিলেন সেগুলি তাঁর সাগরেদদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন নানা ভাবে। তিনি চারকোল, গঙ্গামাটি, নীলবড়ি, ভুসোকালি,এলামাটি, গেরিমাটি ও গুড়ো রং দিয়ে কীভাবে রং তৈরি করা হয় এবং তা দিয়ে কীভাবে ছবি আকঁতে হয় সেই রাস্তা দেখিয়েছিলেন সকলকে। তিন ভাই তাদের বিদেশী রং দিয়ে আঁকা ছবিগুলি জোড়াসাঁকো বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, লাইব্রেরি ঘরে থাকা বিদেশী পর্দাগুলি খুলে দেশীয় দ্রব্য দিয়ে ঘর সাজিয়ে ছিলেন। তাদের এই কর্মকাণ্ড তাঁদের স্যাঙাতদের মনে গভীর ছায়া ফেলেছিল। ফলে তারাও বড় হয়ে গোপনে কংগ্রেসের নানা কাজে যুক্ত হয়ে দেশের সেবায় নিজেদের নিযুক্ত করে।

Developed by DXDasia