মেঘনাদবধকাব্য, রবিনসন ক্রুসো, গীতগোবিন্দ – তরুণ রবি এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলতেন

তরুণ রবীন্দ্রনাথের লেখাপড়ার ভুবন কেমন ছিল?

রবি ঠাকুরের বিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের গণ্ডি মোটেই ভালো লাগত না। ছোট্টবেলায় সোমেন্দ্রনাথ আর সত্যপ্রসাদকে স্কুল যেতে দেখে রবীন্দ্রনাথ নাকি কান্না জুড়েছিলেন। তখন সত্যি জানতেন না, পরে স্কুল না যাওয়ার জন্যও কাঁদতে হতে পারে। প্রথম ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডমিতে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপর আবার নর্মাল স্কুলে গেলেন শিশু রবি। স্কুলের কিছু চেনা থিয়োরিতে পড়ানো রবীন্দ্রনাথের দুর্বোধ্য লাগতো। যেখানে সমবেত উচ্চারণে , ‘Full of glee, singing merrily, merrily, merrily’— পরিণত হত ‘কলোকী পুলকী মেলালিং মেলালিং’ ধ্বনিতে। শিক্ষকদের প্রবল পরাক্রম আর চার দেওয়ালে বদ্ধ শিক্ষা — রবীন্দ্রনাথকে বিদ্যালয় অনুরাগী করে তুলতে পারেনি। আসল লেখাপড়া হয়েছিল বাড়িতে। আজ বলি, তরুণ রবীন্দ্রনাথের পছন্দের কিছু বইপত্র নিয়ে। 

উনিশ শতকের জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বহুপাঠের এক সহজ ও সাবলীল ধারা ছিল। রবীন্দ্রনাথও গ্রন্থকীটের মতোই প্রাচীন ও নবীন বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে অনায়াসে পরিচিত হবেন, এই ভাবনাও অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সঙ্গত। ১৮৬৪ সাল থেকে তাঁর গৃহশিক্ষার সূচনা হয়। বয়স তখন চার। মাধবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে প্রথম রবীন্দ্রনাথের লেখাপড়া শুরু হয়। তার আগে ভৃত্যদের গুরুমশাইগিরির মধ্যে দিয়ে রামায়ণ ও মহাভারতের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছিলেন তিনি। ‘সচিত্র শিশুবোধক’ বইটি বেশ ছোটোবেলায় পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৮৬৬ সালে রবীন্দ্রনাথের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল হরিনাথ শর্মার রচনাবলী, নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা জ্ঞানাঙ্কুর এবং কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের লেখা ‘সদ্ভাবশতক’। ভৃত্যদের রেড়ির তেলের আলোয় ভরা মাদুরপাতা গল্পের আসরে হঠাৎ হঠাৎ হাজির হতেন কিশোরীনাথ চট্টোপাধ্যায়, শুনিয়ে যেতেন দাশু রায়ের পাঁচালির পৌরাণিক গল্প। কোনো কোনোদিন মায়ের সখী শুভঙ্করী দেবীর মার্বেল কাগজের ছেঁড়া মলাট দেওয়া মলিন বইটা কোলে নিয়ে পৌরাণিক, মহাকাব্যিক বিষাদ ভর করত রবির মনে। মেঘাচ্ছন্ন  বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ত  অপরাহ্ণ আকাশের ম্লান আলো। 

বৈদিক সাহিত্যের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের ছিল আবাল্য পরিচয়। দেবেন্দ্রনাথের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ পড়ে ফেলেছিলেন সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরন্যক, উপনিষদ। পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে ‘ব্রাহ্মধর্মগ্রন্থ থেকে উপনিষদের শ্লোক ব্যাখ্যা করে আবৃত্তি করাতেন। কিশোর বয়সে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সঞ্জিবনী সভার সদস্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে লাল রেশমে জড়ানো বেদমন্ত্রে একখানা পুঁথি সভ্যদের অবশ্যপাঠ্য ছিল। তাঁদের দীক্ষাও হয়েছিল ঋকমন্ত্রে। উনিশ শতকের সদ্য প্রকাশিত রচনাগুলিও নিবিষ্ট মনে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছিলেন সেই সময় বাংলা সাহিত্যের কলেবর কৃশ ছিল। তাই নাকি পাঠ্য, অপাঠ্য সব বই-ই তিনি শেষ করেছিলেন। এই সূত্রেই মেঘনাদবধকাব্য, একত্রে বাঁধানো বিবিধার্থ সংগ্রহ, আরব্য উপন্যাস, পারস্য উপন্যাস, বাংলা রবিনসন ক্রুশো, সুশীলার উপাখ্যান, রাজা প্রতাপাদিত্য রায়ের জীবনচরিত, বেতাল পঞ্চবিংশতি প্রভৃতি তখনকার সময়ের বইগুলি তিনি আন্তরিকভাবে পড়ে ফেলেছিলন। ‘অবোধবন্ধু ’ পত্রিকাটিও খুব আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন। বড়ো, চৌকো এই বইটি বুকে নিয়ে শোবার ঘরে তক্তপোশের ওপর চিৎ হয়ে কত ছুটির মধ্যাহ্ন কাটিয়েছেন তিনি। ‘অবোধবন্ধু’ পড়ার সূত্রেই বিহারীলালের কবিতার সঙ্গে পরিচয়। আবার একইভাবে ‘বঙ্গদর্শন’ পড়তে গিয়ে পরিচিত হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার সঙ্গে। এই নিছক আনন্দের জন্য যে সাহিত্যপাঠ, তা যেন সরল বাঁশির সুরে তাঁর মনের মধ্যে মাঠের এবং বনের গান বাজিয়ে তুলত।

বাড়ির মেয়েদের সংগ্রহ করা বইগুলিও পড়ে ফেলতেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ। সেসব বইয়ের তালিকাও নেহাত মন্দ নয়। মানভঞ্জন, প্রভাস মিলন, দূতীসংবাদ, কোকিলদূত, রুক্মিণীহরণ, পারিজাতহরণ, গীতগোবিন্দ, প্রহ্লাদচরিত্র, রতিবিলাপ, বস্ত্রহরণ, বাসবদত্তা, অন্নদামঙ্গল, হাতেমতাই, গোলেবকায়লি, লয়লামজনু, কামিনী কুমার ইত্যাদি।

কিশোর বয়সে অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীর প্রভাবে বৈষ্ণবপদাবলী, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, শাক্তপদ, হরু ঠাকুর, রাম বসু নিধুবাবু, শ্রীধর কথক, ইত্যাদি কবিওয়ালাদের প্রতি তাঁর আগ্রহের অভাব ছিল না। প্রাচীন কাব্যসংগ্রহ, মহাজন পদাবলী সংগ্রহ, চণ্ডীদাসকৃত পদাবলী, রামেশ্বরী সত্যনারায়ণ, গোবিন্দদাসকৃত পদাবলী ইত্যাদি পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে গঙ্গানদীর উপর বোটে চড়ে বেড়াতে বেড়াতে ‘গীতগোবিন্দম’ কাব্যের সঙ্গে পরিচয় হয় রবীন্দ্রনাথের। কালিদাসের কাব্যের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। গৃহশিক্ষক জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে ‘কুমারসম্ভব’ এবং রামসর্বস্ব পণ্ডিতের কাছে শকুন্তলা পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মেঘদূত, সংস্কৃত বহু নাটকও পড়ে ফেলেছিলেন। ঠাকুর পরিবারে সবরকম বই খুব সহজলভ্য ছিল। 

তরুণ রবি বিদ্যালয়মুখী শিক্ষা সেইভাবে গ্রহণ করতে না পারলেও তরুণ বয়সে বিচিত্র সব বিষয়ে লেখাপড়া করেছিলেন আপন মনে। পরে তাঁর জ্ঞানের পরিধি বাড়বে, কিন্তু এই তরুণ বয়সের অর্জিত জ্ঞান তাঁর মনের আলো হয়ে তাঁকে পথ দেখাবে আজীবন।

 

Developed by DXDasia