
একজন নিভৃতচারিণী সংগীতশিল্পী, যাঁকে কেউ মনে রাখেনি
‘বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, গীতিতে’, ‘আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই’, ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’, ‘শোনো গো দখিন হাওয়া প্রেম করেছি আমি’ -এমন সব বহুলশ্রুত গানের গীতিকারের নাম আমরা এতো কম শুনলাম কেন?
তখনও দেশভাগের ক্ষত পুরোপুরি নিরাময় হয়নি। নিজেদের ভাষা, নিজেদের আত্মসম্মানের জন্য প্রাণপন লড়াইয়ে নেমেছিলেন পূর্ব বাংলার মানুষ – স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার লড়াই। বাঁধনহারা হাসি-কান্না সঙ্গে নিয়ে অতঃপর সেই স্বাধীনতাও এলো। ১৯৭১ সালে জন্ম নিল স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’। সে বছরই পুজোয় শচীনকর্তা গাইলেন একটি আনন্দঘন স্ফূর্তির গান–
“আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই
বাংলাদেশের ঢোল,
সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না
বাংলা মায়ের কোল।”
গানটি প্রকাশ করে গ্রামোফোন কোম্পানি (HMV)। নিজের সুরে গেয়েছিলেন শচীন দেববর্মণ (SD Burman)। আর গীতিকার- মীরা দেববর্মণ (Meera Dev Burman)। এই মীরা দেববর্মণ হলেন এমন এক হতভাগ্য প্রতিভা, যিনি ‘না আমারে শশী চেয়ো না’, ‘বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছ দোলা’, ‘বিরহ বড়ো ভালো লাগে’, ‘রাতের আদরে ভিজাইয়া আদরে’, ‘শোনো গো দখিন হাওয়া প্রেম করেছি আমি’, ‘ও-ও বাঁশী ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা পান খাইয়া যাও’, ‘নিটোল পায়ে ঝিনিক পায়েলখানি বাজে’ – সিনেমা ও সিনেমার বাইরে একাধিক কালজয়ী সব গান লিখেছিলেন। এস ডি, আর ডি-র পাশাপাশি 'এম ডি' হিসেবে তাঁকেও তো চিনতে পারতো লোকে? এমন সব বহুলশ্রুত গানের গীতিকারের নাম আমরা এতো কম শুনলাম কেন?
মাতৃভূমির টানে, স্বাধীন বাংলাদেশকে মন ভরে উপভোগ করবেন বলে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন মীরা। যখন ফিরছিলেন গ্রামের পুকুর পাড় দিয়ে, দেখলেন একটি চোদ্দ-পনেরো বছরের মেয়ে পুকুর পারে বসে হাপুশ নয়নে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি বলল –সদ্য বিয়ে হয়েছে, ভাই আসবে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। সকাল থেকে অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত সে, ভাইয়ের আর দেখা নেই। তৈরি হল মন আকুল করা কথা ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া আমার ভাই ধনরে কইও নাইয়র নিত আইয়া’। লোকজীবন-মাটির কথাই ছিল তাঁর গান লেখার ভিত্তিপ্রস্তর।
বাংলা গানে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অনেক মহিলা এসেছেন৷ কিংবদন্তি শিল্পী তাঁরা৷ কিন্তু, বাঙালি মহিলা গীতিকার বা সুরকার হিসেবে ইতিহাস ঘাঁটলে হয়তো এক-দু’জনের নাম পাওয়া যাবে৷ সেই এক-দু’জনের একজন মীরা। সেই সময়ের নিরিখে একাধিক হৈচৈ ফেলে দেওয়া গানের পদকর্তা হয়েও তাঁর মূল্যায়ন হয়নি। কেন হয় এরকম? মীরা মহিলা বলেই কি শচীনদেব ও রাহুলদেবের প্রভূত খ্যাতির পাশে তিনি ম্লান হয়ে গিয়েছেন?

বাংলা গানের গীতিকার, সুরকার এবং কম্পোজার যাকে আমরা বলি, সেই হিসেবে আমরা প্রথম পাই মৌসুমী ভৌমিককে। একবার কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য এক সাক্ষাৎকারে তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন বাংলা গানে মহিলা গীতিকার, সুরকার, কম্পোজার এত অল্পসংখ্যক কেন, থাকলেও তাঁরা কোনঠাসা কেন? দীর্ঘ পরম্পরা নিয়েই বলা যায়, বৈষ্ণব পদাবলী—তার পদকর্তা কোনও মহিলা নন৷ একমাত্র চন্দ্রাবতীর রামায়ণ৷ তার পরেও আমরা যখন অন্য গান, বাউল সংগীতে ঢুকি সেখানে বাউলানি প্রচুর যাঁরা গান করেন৷ কিন্তু পদকর্তা হিসেবে তাঁদেরকে পাওয়া খুবই দুষ্কর৷
“যে কোনও আর্ট ফর্মে মেয়েরা থাকেন না এমন নয়, আমার মনে হয় মেয়েরা যে ভাবে রয়েছেন সেটা অনেক সময় একটু আড়ালে৷ সব সময় ভনিতাটুকু পাওয়া হয় না মেয়েদের৷ তার মানে এই না যে মেয়েরা কিছু সৃষ্টি করেননি৷ যদি আমরা লোকগানের দিকটাই দেখি, তা হলে মেয়েদের গানের যে জগৎটা, সেই গান সব তৈরি হয়েছে মুখে মুখে, মেয়েদের জীবন থেকে সেই গান সব উঠে এসেছে৷ সেই সব গানে ভনিতার কোনও বিষয় নেই৷ সেইগুলো তো কমিউনিটির গান৷ সেইগুলো তো মেয়েরা যূথবদ্ধ ভাবে একযোগে গায়৷ সে গান জীবন যাপনের একটা অংশ৷ আমার মনে হয় আর্টের ব্যাপারটা মেয়েদের জীবন থেকে আলাদা করে একটা আর্টিস্ট হিসেবে নিজের একটা স্টেজ তৈরি করা, বা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা, এ ব্যাপারটা ওই ভাবে হয়ে ওঠেনি৷ তবে মেয়েদের নিজেদের আর্টিস্টিক ফুলফিলমেন্টের ব্যাপারটা, সেটা আমার ধারণা সব সময়ই থেকেছে৷ তারই ভিতর দিয়ে চন্দ্রাবতীর মতো একজন কেউ হয়তো বেরিয়ে আসে৷” বলেন মৌসুমী।
বিয়ের আগে ছিলেন মীরা দাশগুপ্ত। জন্ম তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) কুমিল্লা জেলায়। দাদু রায় বাহাদুর কমলনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন ঢাকা হাইকোর্ট-এর চিফ জাস্টিস। ছোটোবেলাতেই বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন দাদু দিদিমার সঙ্গে। সংগীত গুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন; কীর্তন ও ঠুমরী শেখেন সংগীতাচার্য ধীরেন্দ্রনাথ দেবের কাছে; ১৯৩০ সালে আনাদি দস্তিদারের কাছে শেখেন রবীন্দ্র সংগীত এমনকী শান্তিনিকেতনে অমিতা সেনের কাছে নৃত্যচর্চাও করেন। তাই, সুর-তাল-ছন্দ ছিল তাঁর নখদর্পণে।

১৯৩৭ সালে শচীন দেববর্মণের সঙ্গে দেখা। ভালোলাগা এবং বিয়ে ১৯৩৮ সালে। ত্রিপুরা রাজ পরিবারভুক্ত হওয়ায় শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল সাড়ম্বরে। শচীন এসেছিলেন ঘোড়ায় চড়ে, হাতে ছিল তারবারি। বসেছিল নহবতখানা, বাজিয়েছিলেন আলি হুশেন খাঁ। ১৯৩৯ সালের জুন মাসে জন্ম হল ‘আর ডি’র – রাহুল দেববর্মণের (RD Burman)। ইতিমধ্যে শচীন দেববর্মণ বম্বে চলে যাবেন বলে মনস্থির করেন। দেববর্মণ দম্পতির জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। বম্বেতে ফয়াজ মহম্মদ খানের কাছে আবার তালিম নিতে শুরু করলেন মীরা। ১৯৪৫ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও (বম্বে) থেকে অডিশন পাশ করে ঠুংরি ও গজল পরিবেশন করতেন। বম্বে আইপিটিএ-র সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। বম্বের সাংস্কৃতিক জগত তখন প্রগতিশীলতার কেন্দ্র। সেই সময় দুটি নাটক ‘শান্তি’ ও ‘নয়া প্রভাত’-এর জন্য গানও লেখেন। শচীন দেববর্মণের সঙ্গে অনেক গানের রেকর্ডও করেন –আজ দোল দিল কে (১৯৪৬), তুম হ বড়ে চিতচোর (১৯৪৬), কেন হায় স্বপ্ন ভাঙ্গার আগে (১৯৪৯), কালি বদরিয়া ছা গয়ে, ডালি ডালি ফুল (১৯৪৮), কে দিল ঘুম ভাঙ্গায়ে (১৯৪৯)। ‘নয়া জমানা’, ‘তেরে মেরে স্বপ্নে’, ‘শর্মিলি’, ‘অভিমান’, ‘বারুদ’, ‘প্রেম নগর’ – এই জনপ্রিয় সিনেমাগুলির সহযোগী সংগীত পরিচালক ছিলেন মীরা।

এত কিছুর পর কী পেলেন মীরা? কিছুই না। শেষ জীবন তো খুবই দুঃখজনক। শোনা যায়, ১৯৭৫ সালে এস ডি’র মৃত্যু পর্যন্ত বম্বের বাড়ি জেটে থাকতেন। তারপর ছেলের সঙ্গে থাকতেন ভদ্রাসন মেরি ল্যান্ডে। জীবিতাবস্থায় ১৯৯৪ সালে চলে যেতে দেখলেন একমাত্র কৃতী সন্তান রাহুল দেববর্মণকে। সীমাহীন শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। কেবল এসডি’র গান শুনলে সম্বিত ফিরে নড়ে চড়ে উঠতেন। ভাসির একটি ওল্ড এজ হোমে তার মৃত্যু হয় ২০০৭ সালের, ১৫-ই অক্টোবর।

একটা তো প্রতিষ্ঠিত সত্য আছেই যে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের যে কোনও জায়গায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া খুব সহজ নয়৷ তাই সে তার নিজস্ব জগতের মধ্যেই তার তৃপ্তিটা খুঁজে পায়৷ তার সুযোগই বা কত৷ শুধুমাত্র গানের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের দেশে কি মহিলারা ছবি আঁকেন না? শিল্পী মীরা মুখোপাধ্যায় যেমন বলছেন, ‘আমি নিজেকে নারীশিল্পী বলে মনে করি না৷ আমি একজন শুধু শিল্পী’৷ কিন্তু এই সমাজ সেভাবে ভাবতে শেখেনি। তাই, মেয়েদের জীবনটা অনেক দিক থেকেই বাঁধা। এক ধরনের গণ্ডিতে যেমন বাঁধা, তেমনই সেই গণ্ডির ভিতর এক ধরনের পরিপূর্ণতার ব্যাপার থাকে, তৃপ্তির ব্যাপার থাকে৷ তার পর তার বাইরে যারা বেরিয়ে যাবে, যারা ওই তৃপ্তির জগতের ভিতরে বাঁধা থাকবে না, তারা তখন নিজের তৃপ্তির জায়গাগুলো অন্য সব জায়গায় খুঁজে নিতে চেষ্টা করবে৷ হয়তো তখনই সে তার নামটা নিজের কাজের সঙ্গে জুড়ে দেবে৷ এই পরিচয় চাওয়াটা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার একটা অংশ৷ আমি একটা জগতে প্রতিষ্ঠিত হলাম, আর একটা জগৎও আমার হল৷ মীরা দেববর্মণ একজন জাত সংগীতশিল্পী হয়েও, সংসার-সমাজ সামলাতে গিয়ে তাঁর আর নিজের জগৎ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
তথ্যসূত্রঃ
নন্দিতা ভট্টাচার্য
বাংলা লাইভ ডট কম
এই সময়