আজ ৩১ অগস্ট, খাদ্য আন্দোলনের শহিদ দিবস

খাদ্য এখন কোনও রাজনৈতিক দলেরই স্লোগান নয়

চালের দাবিতে কলকাতা অভিযান থেকে সুচিকিৎসার দাবিতে পথ অবরোধ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাবির এই যে বদলে যাওয়া, আর এই বদলের সঙ্গী যে রাজনীতি, তা আসলে পরিবর্তনের কথাই বলে। আর এই সময়টাও কম নয়। ৬০-এর দশকে চালের দাম বাড়লে আগুন জ্বলত গ্রাম বাংলায়। হাজারে হাজারে মানুষ হয়ে উঠত কলকাতামুখী আর আজ, অগুন্তি সমাজ কল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পের ফলে, ‘খাদ্য চাই’ এখন আর কোনও রাজনৈতিক দলেরই স্লোগান নয়। এখন মানুষ পথ অবরোধ করে সুচিকিৎসা, রাস্তার দাবি, নার্সিংহোমের অত্যাচার, পথ দুর্ঘটনা, বধূহত্যা, স্কুলে ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ, পুকুর বোজানো, জলা জমি ভরাট, কৃষিজমির ন্যায্য দাম, পরিবেশ দূষণ, শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে। এই যে আন্দোলনের হেতুগুলো বদলে বদলে যায়, তার কারণ, গতি অতি মন্থর হলেও, অনেক খারাপ জিনিস নিয়েও সমাজ বদলাচ্ছে। সমাজ ব্যবস্থার ‘অমানবিক সূচক’ সামান্য নিম্নমুখী হয়।

১৯৫৯ সালের ৩১ অগস্ট খাদ্য আন্দোলনের শহিদ দিবস। বাংলা অনেক দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিয়ে গেছে। মহামারি সহ্য করেছে। ইংরেজ বাংলাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল লুট চালিয়ে। তার পর দেশভাগ। রাতারাতি কলকাতার জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল, যার জন্য পরিস্থিতি প্রস্তুত ছিল না। খাদ্যের অভাবে নুয়ে পড়া বাংলার গরিব মানুষকে তখন বামপন্থীরা স্বপ্ন দেখাতে সফল হয়েছিল। বামপন্থীদের হাত ধরে কলকাতা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন কৃষকরা। ৩১ অগস্ট মনুমেন্টের নীচে জমায়েত ছিল খাদ্যের দাবিতে। তার পর ছিল আইন অমান্য। নিরস্ত্র ক্ষুধার্ত কয়েক লক্ষ মানুষকে নিয়ে সেই সন্ধ্যায় রাইটার্সের কাছে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সামনে আইন অমান্য করতে গেলে যে সরু রাস্তায় ভিড়ের চাপে জমায়েতের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, তা বাম নেতারা কেন ভেবে দেখেননি বলা মুশকিল। কেন পাঁচ ভাগে, পাঁচটি রাস্তা দিয়ে পাঁচটি মিছিলের আইন অমান্য করতে রাইটার্স যাওয়ার সিদ্ধান্ত আচমকা বদলে একটি মিছিল করা হয়েছিল, তার উত্তর পাওয়া যায় না। ওই সময় কারা পাথর ছুঁড়েছিল, কারা ঢিল মেরে রাস্তার আলো নিভিয়ে দিয়েছিল, তার উত্তর কোনও দিনই পাওয়া যাবে না। কৃষকরা এসেছিলেন দাবি জানাতে, আত্মহত্যা করতে না। ভিড়ের চাপে কর্ডন ভেঙে গেল। সন্ধে সাতটার পর লাঠি চলল।

পরের দিন স্টেটসম্যান লিখল, ‘আন্দাজ সন্ধ্যা ৭.২০ নাগাদ প্রায় ১২ জন শোভাযাত্রী পুলিশের বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে আসেন। ওই ফাঁকটা পুলিশ রেখেছিল যাতে একে একে গ্রেফতার বরণ করতে পারেন আইন অমান্যকারীরা। কিন্তু ওই ১২ জন নয়, দেখা গেল বিরাট জনতা পুলিশ বেষ্টনী ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করছে। তখন শুরু হয় লাঠি চার্জ।’

হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড লিখেছিল, ‘প্রথম দল সত্যাগ্রহীদের গ্রেফতারের পরে জনতা পুলিশ বেষ্টনীর ফাঁক দিয়া প্রবেশ করিলে পুলিশ লাঠি চার্জ করে।’

পরের দিনের খবরের কাগজে লেখা হল – বহু আহত, গুরুতর আহত ২০ জন। এই আন্দোলন টানা বেশ কয়েক দিন ধরে চলতে থাকল। যে আন্দোলনকারীরা দুধের গাড়িতেও আগুন দিলেন, ট্রাম-বাস পোড়ালেন, অ্যাম্বুলেন্সের চালককে পেটালেন তাঁরা নিশ্চয় কৃষক ছিলেন না। কত জনের মৃত্যু হয়েছিল? সব মিলিয়ে বলা হয় ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে ৮০ জনের নাম বহু খোঁজ খবর করেও পাওয়া যায়নি। তবে সংখ্যাটা নেহাত কম ছিল না। জ্যোতি বসুও বিধানসভায় তাঁর এই সংক্রান্ত বক্তৃতায় ৮০ জনের নামের তালিকা দেননি। এবং এটাও ঠিক, কোনও সরকারই যেমন রক্তের ভাষা ছাড়া আর কোনও ভাষা বোঝে না, ফলে এত জন কৃষকের মৃত্যুতে দেখা গেল বিধান রায়ের সরকার নড়েচড়ে বসল। দেখা গেল নানা জায়গা থেকে চাল সংগ্রহ করতে উদ্যোগী হতে। যা আগে করলে এতগুলো মানুষকে মরতে হত না। প্রফুল্ল সেনের টেলিগ্রামের পর টেলিগ্রামের কোনও জবাব দেয়নি যে দিল্লি, রক্তের ভাষাটা ঠিক বুঝতে পারলেন সেই নেতারাই। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করল, তারা ৫০ হাজার টন চাল, ৭০ হাজার টন গম পাঠাচ্ছে। রাজ্য নিজেও মধ্যপ্রদেশ থেকে ৩০ হাজার টন ধান আনার ব্যবস্থা করল। জোগান বেড়ে যাওয়ায় চালের দামও কমল। কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ তখন মন্তব্য করেছিলেন, কলকাতা কমিউনিস্ট হয়ে গেছে, আমরা পরের নির্বাচনে গ্রাম বাংলা থেকে জিতে এসে সরকার গড়ব। বামপন্থীদের তখন শক্তি বাড়ছে। তাদের অপপ্রচারও মানুষ বিশ্বাস করত তখন।

১৯৫২ সালের বিধানসভা ভোটে প্রফুল্লচন্দ্র সেন হেরে গেলেন। সেই প্রফুল্ল সেন, যাঁকে জেলে ইংরেজরা ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখত। দেশের জন্য যাঁর আত্মত্যাগ ছিল সমস্ত প্রশ্নের উর্ধ্বে। কেন হারলেন? কারণ তিনি ভোটের প্রচারে গিয়ে বলেছিলেন, ভারতের মতো দেশে খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে হলে শুধু ফলন বাড়ালে হবে না, পরিবার পরিকল্পনা করতে হবে। বামপন্থীদের প্রচার শুরু হয়ে গেল, প্রফুল্ল সেন মানুষকে খাদ্য দিতে পারবে না, উলটে আইন করে স্বামী স্ত্রীর সহবাস বন্ধ করে দেবে। ভোটে হেরে গেলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রফুল্ল সেন। আর একটি প্রচার বামপন্থীরা তাঁর সম্পর্কে করেছিল। সেটা হল, তিনি বেনামে কলকাতায় বিপুল সম্পত্তি কিনেছেন। ডালহৌসির স্টিফেন হাউস নাকি তিনি কিনে নিয়েছেন। ঘটনা হল প্রফুল্ল সেনের নিজের থাকার জন্য কোনও বাড়িই ছিল না। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কাটিয়েছেন মিডলটন স্ট্রিটে তাঁর এক বন্ধুর বাড়িতে।

কৃষকদের মৃত্যুর পর বিধান রায় বললেন ওরা জোর করে রাইটার্স দখল করতে এসেছিল। ঠিক যেমন জ্যোতি বসু ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ে মমতার জমায়েতে ১৩ জন যুবকের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পর বলেছিলেন।

বিধান রায়, যাঁর সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রিত্বের থেকে অলৌকিক ডাক্তারির গল্পই বেশি মুখে মুখে ঘোরে, তিনি এক জন উদার মনের সৎ রাজনীতিক ছিলেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। ভালো প্রশাসক, পরিকল্পনাকার, বাংলার রূপকার ছিলেন, এসব নিয়ে মতবিরোধ নেই। কিন্তু বিধান রায় জননেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন শহরের রাজনীতিক। বাংলার গ্রাম, বাংলার কৃষক তিনি কতটা বুঝতেন সন্দেহ হয়। এটা ঠিক বিধান রায় চাল চেয়ে বহু বার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লিখেছিলেন। জওহরলাল গুরুত্ব দেননি। তখন প্রফুল্ল সেন খাদ্যমন্ত্রী, জওহরলাল চাননি প্রফুল্ল সেনকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হোক, ফলে তিনি প্রফুল্ল সেনের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন না। ১৯৫৭ সালে বামপন্থীদের আসন সংখ্যা ৫৭ থেকে বেড়ে হয় ৮০। ১৯৫৮ সালে গঠিত হয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি। ১৯৫৯ সালের ৩১ অগস্ট যে জমায়েত কলকাতায় হয়েছিল, সেটা ছিল এই প্রতিরোধ কমিটিরই ডাকে।

বিধান রায় রাজ্য শাসন করতেন আমলাদের উপর নির্ভর করে। অন্য মন্ত্রীদের খুব একটা তেমন ভূমিকা ছিল না তাঁর মন্ত্রিসভায়। তাঁর দফতরের বনমন্ত্রী হেমচন্দ্র নস্করের কথায়, ‘আমরা সবাই ছিলাম কচ্ছপ মন্ত্রী। বাড়ি থেকে গুটি গুটি গাড়িতে চেপে রাইটার্সে আসি, আসা মাত্রই ডাঃ রায় আমাদের উল্টে দেন, আমরা হাত পা ছুড়তে থাকি, কিন্তু নড়তে পারি না। আবার পাঁচটার সময় তিনি আমাদের সোজা করে দেন, আমরা গুটি গুটি পায়ে গাড়িতে উঠে বাড়ি চলে যাই।’ বিধান রায়ের মৃত্যুর পর প্রফুল্ল সেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সাংবাদিকদের যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তাতে তিনিই প্রথম বললেন ’টিম’ হিসেবে তাঁর মন্ত্রিসভা কাজ করবে। তিনিই প্রথম মন্ত্রিসভাকে জেলায় জেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই সম্ভবত প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, বিধানসভায় বাংলায় বলতেন। তখন বেশ কয়েক বছর ধরেই খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন চলচিল বামপন্থীদের নেতৃত্বে। চালের দাম বেড়ে যাচ্ছিল, বিধান রায়ের সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। চালের চোরাকারবারীও আটকাতে পারেনি সরকার। খাদ্য সমস্যার কারণ যেমন ছিল দেশ ভাগের ফলে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, তেমনি ছিল বিরাট পরিমাণ চাষ জমি পাট চাষের জন্য ছেড়ে দেওয়া। কারণ দেশভাগের পর দেখা গেল, পাটকল সব এপারে, পাট চাষ হয় পূর্ব পাকিস্তানে। কেন যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাট কেনা নিয়ে তখন সরকারি স্তরে কোনও কথা হয়নি, তার উত্তর জানা নেই। পশ্চিমবঙ্গের পাটকল যদি পাট না পায়, প্রথমত লাখ খানেক শ্রমিক বেকার হবেন। দ্বিতীয়ত, পাট থেকে তখন বিদেশি মুদ্রা আসত। বাংলার এই গভীর সংকটে দিল্লি যে অবহেলা দেখাতে পেরেছে, তার কারণ, তখন বিধান রায় ছাড়া জওহরলালের উপর প্রভাব খাটাতে পারেন, এমন কোনও নেতা এই রাজ্যে ছিল না। আর বিধান রায়ের সব আর্জি যে তাঁর বন্ধু জওহর শুনতেন না তা তো প্রমাণিত। আর বিধান রায়ের যে এই ব্যাপারে দূরদৃষ্টির অভাবও ছিল তা নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই।

কেমন ছিল তখন আমাদের এই বাংলার অবস্থা? এই নিয়ে ১৯৫৫ সালে ইংরেজি কাজ স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক জি এ জনসন প্রধানমন্ত্রী জওহরলালকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘শহরের মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। জনসংখ্যা এবং বেকারি এই শহরকে মাঝে মাঝেই বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ছোটখাটো গাড়ি দুর্ঘটনাতেও বিরাট লোক জমে যাচ্ছে, শুরু হয়ে যাচ্ছে মারামারি’। জওহরলাল চিঠিটাতে তেমন গুরুত্ব দেননি। তবে সেটা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিধান রায়কে।

সেই কলকাতা আজও কি খুব অচেনা?

Developed by DXDasia