পাখির খোঁজে মংলাজোড়ি

শুধু ছবি তুলতেই নয়, সপরিবারে ঘুরেও আসা যায় উইকএন্ডে

ওড়িশার চিল্কা লেকের নাম কে না শুনেছে! তার পাশেই অবস্থিত মংলাজোড়ি (Mangalajodi) জলাভূমি। শীত পড়তে না পড়তেই এখানে শুরু হয়ে যায় নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা। জলাশয়ের মুখেই রয়েছে মংলাজোড়ি গ্রাম। আগে পরিযায়ী পাখিদের শিকার চলত অনবরত। এইসব পাখিদের মাংস বিক্রি হত ভুবনেশ্বর সহ ওড়িশার বিভিন্ন জায়গায়। ফলে বিপর্যস্ত হচ্ছিল পাখির দল। সেই সময় পাখিদের রক্ষায় উদ্যোগ নেন এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী নন্দকিশোর ভূজবল। তাঁর একক প্রচেষ্টায় গ্রামবাসীদের সংগঠিত করে তৈরি করলেন গ্রাম পঞ্চায়েত। পাখি সম্পর্কে জ্ঞান ও পরিবেশ রক্ষার নানা প্রশিক্ষণ দিলেন গ্রামবাসীদের। তৈরি করলেন একটি এনজিও। যার নাম ‘মংলাজোড়ি পাখি সুরক্ষা সমিতি’। এরাই এখন গাইড হিসাবে পক্ষিপ্রেমিকদের সঙ্গে জলাশয়ে ঘুরে দেখান। এবারে আমার পাখির খোঁজে গেলাম মংলাজোড়ি।

সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতে ভুবনেশ্বর থেকে NH5 দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। টানগিটাউন থেকে বাঁদিকে ঘুরে কিছু গ্রাম ও সবুজ বনবীথির মধ্য দিয়ে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যস্থল মংলাজোড়ির ‘Godwit Eco Cottage’-এ। এটাও এই ‘মংলাজোড়ি পাখি সুরক্ষা সমিতি’ সংস্থার প্রতিষ্ঠান। এদের কাছেই রয়েছে বোটম্যান, গাইড ও নৌকার সুব্যবস্থা। দু’দিকে সারি করা মাটির ঘর ও খড়ের ছাউনির কটেজ। রয়েছে শৌচালয়সহ গরম জল ও আধুনিক ব্যবস্থা। টেন্টে থাকার ব্যবস্থাও আছে। আছে ‘জাকানা’ রেস্টুরেন্টে ইকো শাক-সব্জির আয়োজনে খাবারের ব্যবস্থা। আমরা লুচি, ফুলকপির তরকারি, সেদ্ধ করা ডিম ও কলা  দিয়ে প্রাতরাশ সারলাম। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জলাভূমির দিকে।

 

Brahminy kite

পথে গ্রামের বাড়িঘর ও জীবনযাত্রার কিছুটা দেখা পেলাম। কেউ বা মাছধরার জাল বুনতে ব্যস্ত কেউ নৌকা সারাতে।  বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা পৌঁছে গেছে জলাভূমির দিকে। এর দুপাশে দেখা পেলাম নানা জাতের পাখি। আমরা সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলাম জলাভূমির ঘাটে। যেন তাড়াতাড়ি নৌকা নিয়ে যেতে পারি জলপথে।

Glossy ibis

সারি দিয়ে বোটগুলি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাইড ও মাঝি যাত্রা শুরু করার জন্য তৈরি। ঘাটের কিনারাতেই দেখলাম Great Egret, Black-tailed Godwit, Black-winged Stilt পাখিরা চারিদিকে নিজের মনে খাবার সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। এই জলাভূমির অন্য বৈশিষ্ট্য – এখানে নৌকাগুলিতে সুন্দর বসার ব্যবস্থা ও ওপরে ছাউনি লাগানো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাভূমিতে বিচরণ করা যেতে পারে। শুধু পাখিপ্রেমিক নয়, অনেকে সপরিবারে ঘুরতেও এসেছেন সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে নৌবিহারে।

Greater painted-snipe

আমাদের নৌকা এগিয়ে চলেছে। আর মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছে Black-headed Gull, কখনও উড়ে এসে ছো মারছে জলে। সঙ্গে গোটা কয়েক Barn Swallow। নৌকার পাশে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা Black-winged Stilt খানিকটা স্থির হয়ে। আরও কিছুদূরে এগোতেই পৌঁছলাম প্রশস্ত জলাভূমিতে। প্রায় একশোর বেশি হবে নানা পাখির মেলা। Black-tailed Godwit, Black-winged Stilt, ঝাঁকের মাঝে Purple Heron, Great Egret, Broze-winged Jacana, Grey-headed Swamphen পাখির দল। সবাই খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। একটা Grey-headed Swamphen দেখলাম পানা মুখে নিয়ে দৌড়াতে। আমার গাইড জানাল, এরা সম্পূর্ণ ভেজেটেরিয়ান। এই জলাভূমিতে নৌকায় ভেসে যতই এগিয়ে যাচ্ছি, দেখা পাচ্ছি নতুন নতুন পাখিদের।

Grey heron

মাটির ঢিপির উপর দেখলাম প্রায় ১৫ থেকে ২০টার মত Oriental pratincole নিজেদের ভুবনে। কিছুদূর এগোতেই দেখা পেলাম Northern Pintail-এর দলের। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০-এর মতো হবে। আমাদের দেখেই একে একে উড়ে যেতে শুরু করল। কী অপূর্ব দৃশ্য, ফ্রেমবন্দি করতে থাকলাম। সামনেই দেখলাম Northern Shoveler দম্পতি জলক্রীড়াতে ব্যস্ত। এভাবে আমাদের নৌকা এঁকেবেঁকে পানা জলাজঙ্গলের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগল। কিছু ডিঙি নৌকাকে দেখলাম মাছ ধরতে। জলাভূমিতে রয়েছে প্রচুর মাছ চিংড়ি ও কাঁকড়া যা পাখিদের আকর্ষণ করে। মাঝে দূরে বাঁধের উপর গাইড দেখাল বসে আছে bramony kite। নৌকা কাছে যেতেই উড়ান দিল অন্যত্র। আমিও প্রস্তুত। ফ্রেমবন্দি করলাম উড়ন্ত পাখির ছবি। আমার সকালের ভ্রমণ আনন্দময় হল।

Grey-headed swamphen

দুপুরে খাবারে ডাক আসতেই ফিরে এলাম ঘাটের দিকে। খাবার শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর আবার রওনা দিলাম পাখিদের মেলায়। এবার চললাম জলাভূমির অন্যদিকে। সূর্য ক্রমশ পশ্চিমের দিকে হেলে পড়ছে। সামনে আকাশজুড়ে উড়ে যাওয়া পাখিদের ছায়া পড়ছে জলে। একটা কাস্তে বক পানার মধ্যে ঘুরে বেড়াছে। খানিকটা এগোতেই দূরে স্থির ও বিস্তৃত জলাশয়ের দিকে গাইড আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। দেখলাম তিন জোড়া Ruddy Shelduck (চখাচখী) ঘুরে বেড়াছে আপন মনে। মঙ্গোলিয়া এদের প্রজনন ভূমি। অত্যধিক শীত এড়াতে এরা এই সময় অল্প শীতের মংলাজোড়িতে চলে আসে। মুহূর্তে আমরাও ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করলাম। কিছুটা ঘাসকাদার জমিতে দেখা পেলাম Common Snipe-এর। এটি একটি winter visitor, Yellow Wagtail, Red-wattled lapwing, Little ringed Plover কাদায় তিরিতিরি করে নেচে যাচ্ছে। আমরাও একে পর এক পছন্দ মতো ছবি তুলতে থাকলাম।

Knob-billed duck

ধীরে আকাশের রঙ লালচে হতেই নৌকা চলল ঘাটের দিকে। পাখিদের দলও সশব্দে রওনা দিচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। নৌকায় বসে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখে ফিরে এলাম আমরা। এখন পরের দিনের অপেক্ষায়।

সারাদিনের পাখির দেখার নেশায় আমরা পরিশ্রান্ত। তাছাড়া খুব ভোরে পাখিদের আনাগোনা দেখার জন্য উঠতে হবেই সকাল সকাল।

আমাদের দলের ওড়িশার বন্ধু রাতের খাবারের জন্য সযত্নে আয়োজন করেছে চিল্কার তাজা কাঁকড়া ও চিংড়ি মাছ। আর এই সব খাওয়া হবে ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে। এখনে শীতটা খুব বেশি না হলেও জলাভূমির থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস বেশ ভালো লাগছে। হাফ জ্যাকেটা গায়ে দিয়ে আমরা চললাম হোটেলের পিছনের বাগানে। গনগনে আগুনে শুরু হল বারবিকিউ – সরষে, পেঁয়াজ, টমেটো ও লেবু কাঁচালঙ্কার রসে ভেজানো পার্শে মাছ। সঙ্গে টমেটো, বেগুন ও ক্যাপসিলঙ্কা আগুনের উপর সাজানো হল। তার সঙ্গে চলতে থাকল সারাদিনের পাখি দেখার অভিজ্ঞতার কথা। এই মাছ খাওয়ার স্বাদ যেন অন্যরকম। মনে থাকবে অনেকদিন।

 

খুব সকালে লেমন টিতে চুমুক দিতে দিতেই চোখে পড়ল জাকানা রেস্টুরেন্টে ঝোলানো একটি ছবির উপর। ছবিতে একটি Purple Heron মুখে একটা ব্যাঙ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটি আমার মন ছুঁয়ে গেল। বন্ধুদের বললাম আজ আমি এই রকম একটা ছবি তুলব। উঠে পড়লাম গাড়িতে।

Northern pintail

ঘাটে পৌছেই নৌকা নিয়ে সোজা জলাশয়ের দিকে। তখন সকাল ৬.৩৫। আগের দিনের তুলনায় আজ কুয়াশা অনেকটা কম। অনেক দূর থেকেই পাখিদের দেখা যাচ্ছে। কিছুদূর এগোতেই গাইড আমাকে ইশারা করল। দেখি একটি Purple Heron কিছু একটা মুখে নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাঁদিক দিয়ে উড়ে গেল। ক্যামেরায় বন্দি করলাম উড়ন্ত পাখির ছবি। ছবি পেলাম মুখে মাছ নিয়ে। সকালে পাখিদের খাওয়ার সময়। মুহুর্তেই গাইড আমাদের ইশারা করল – ‘স্যার, ইলেভেন ও’ক্লক’। এটা কিন্তু ঘড়ির সময় বোঝাতে নয়, এটি একটি কোড ওয়ার্ড। এর মানে ঘড়ির কাঁটার পজিশন অনুযায়ী তাকাতে হবে। কথা বলা বারণ তাই এই সব কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়। অনেকটা দূরে দেখি আর একটি Purple Heron কিছু একটা মুখে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে। আমি ছবিটা তুললাম। ক্যামেরার লেন্সে ভাল করে চোখ রাখতেই দেখলাম একটা মস্ত বড় ব্যাঙ শিকার করেছে সে। ক্লিকের পর ক্লিক করতে থাকলাম। সকালের ইচ্ছা পূর্ণ হল। বন্ধুরা অভিবাদন জানাল।

Purple heron

 

Red-wattled lapwing

এখানে পাখির ছবি তুলতে হলে দলকে দুটি ভাগ করে নিলেই ভালো। এর ফলে দল বেঁধে ভিন্নদিক থেকে প্রতিমুহূর্তের পাখির ছবি তোলা সম্ভব। আমরাও চারজনের দলকে দুটি নৌকায় ভাগ করে নিয়েছিলাম। একটি নৌকায় দুজন ও গাইড।

দেখা পেলাম তিনরকমের মাছরাঙার – হোয়াইট ব্রেস্টেড, কমন ও পাইড কিংফিশার, মাছ ধরতে ব্যস্ত। দেখা পেলাম বেশ কয়েকটা Grey Heron। আমাদের গাইডের অভিজ্ঞতার আর এক নিদর্শন – এই বিস্তৃত জলাশয়ে কোথায় কী পাখি থাকে তা ওদের নখদর্পণে। নৌকাটি নিয়ে এল জলাশয়ের মাঝে থাকা কাদার ঝোপঝাড়ের কাছে। পেলাম Greater Painted-Snipe ও Ruddy breasted crake। Painted Snipe এর পুরুষ ও স্ত্রীকে একসঙ্গে সচরাচর দেখা পাওয়া যায় না। এটাও আমাদের প্রাইজ ক্যাচ। ঘাটে কাছে পৌছাতেই পেয়ে গেলাম Yellow bittern ও Eurasian reed warbler। নৌকা ঘাটে এসে বাঁধল, যাত্রা শেষ। একে একে নেমে এলাম সকলে।

Ruddy shelduck

মংলাজোড়ি আগেও এসেছি। কিন্তু প্রতিবারই নতুন অভিজ্ঞতা হয় আমার। পাখিদের আনাগোনায় কমবেশি পরিবর্তন হলেও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে এলাকার। ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনার জন্য স্থানীয় জেলে পরিবারগুলিই খুলেছে কিছু দোকান। ডাবের জল, চিপস, বিস্কুট খাবারের সঙ্গে পেয়ে যাবেন টাটকা মাছের স্বাদও। চিংড়ি, কাঁকড়া, পার্শে ছাড়াও আছে আরও নানা মাছ। আবার আমার ওড়িশার বন্ধুর কারিগরি। দোকানদার ভালোবেসে সুযোগ দিলেন নিজেদের মত স্বাদের মাছ ভেজে খাবার। রান্না করা আমার আরেকটা শখ। তাই শুরু করলাম দু’বন্ধুতে। বন্ধুরা একে একে চিংড়ি ও কাঁকড়া ফ্রাই শেষ করতে ব্যস্ত। এদিকে বেলা এগিয়ে যাচ্ছে। গাইড মাঝিরা নৌকা বেঁধে রাখছে বাঁশের খুঁটিতে। আবার যেতে হবে যে। আন্তরিকতা বিনিময় করে আবার আসব এই প্রতিজ্ঞা করে আমরাও রওনা দিলাম ভুবনেশ্বরের পথে। পাখির সঙ্গে সঙ্গে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি যুক্ত হল আমার জীবনে।

 

Developed by DXDasia