
প্রতিমাদেবীর কথায় জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ পাহাড় ভালোবাসতেন না, নদী ভালোবাসতেন
মহানির্বাণের পথে যাত্রা করবেন এক অমৃতপুরুষ। সেই যাত্রার আগে তিনি নিজেই ছন্দে গেঁথে লিখে গিয়েছেন নিজের অন্তিম অনুষ্ঠানের প্রার্থিত চিত্র।
“অলংকার খুলে নেবে, একে একে বর্ণসজ্জাহীন উত্তরীয়ে
ঢেকে দিবে, ললাটে আঁকিবে শুভ্র তিলকের রেখা,
তোমরাও যোগ দিয়ো জীবনের পূর্ণ ঘট নিয়ে
সে অন্তিম অনুষ্ঠানে, হয়তো শুনিবে দূর হতে
দিগন্তের পরপারে শুভ শঙ্খধ্বনি।”
অন্তিম দিনে সত্যিই তাঁর দেহ সেজে উঠল শুভ্র ধুতি ও চাদরে। ললাটে আঁকা হল শ্বেতচন্দনের তিলক। গলায় রজনীগন্ধার গোড়ে মালা। হয়তো অলৌকিক শুভ শঙ্খধ্বনি বেজেছিল কোথাও! রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রা বলে কথা! পরিণত প্রবীণ রবীন্দ্রনাথের বাবামশাই হওয়া ও প্রতিমাদেবীর রবি ঠাকুরের মামণি হয়ে ওঠার কাহিনি এ লেখার মূল বিষয়।
প্রতিমাদেবী ও রথীন্দ্রনাথের বিয়ের গল্প সকলের জানা। তাঁদের বিচ্ছেদের উপাখ্যানও। কিন্তু তথাকথিত এই অসফল দাম্পত্যের সমান্তরালে প্রতিমাদেবী ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তৈরি হয় অন্য এক সম্পর্কের সেতু, যার ভরকেন্দ্র বাৎসল্য প্রতিবাৎসল্য। রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে প্রতিমাদেবীই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম অবলম্বন। সেই শেষ মায়ার আলো ছিল অন্যরকম। ১৯৪০ সালের অগাস্ট মাসে শারীরিক অসুস্থতার জন্য প্রতিমাদেবীকে কালিম্পং যাত্রা করতে হয়। তখন মনখারাপের মেঘের মতো ভেসে আসত প্রতিমাদেবীর বাবামশায়ের চিঠি— ‘তোমাদের বাড়িটা দেখি। শূন্য হাঁ হাঁ করছে। না আছ তুমি, না আছে রথী—প্রধান ব্যক্তি যে আছে সে হচ্ছে নাথু। নিদারুণ শরতের তাপ আকাশে এসেছে, কৃপার বর্ষণ কালো মেঘের ভিতর থেকে সমস্ত পৃথিবীকে অভিশাপ দিচ্ছে। হংসবলাকার দলে যদি নাম লেখা থাকত তাহলে উড়ে চলতুম মানস সরোবরের দিকে,’—এই চিঠির শেষে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তাঁর সম্বলের মধ্যে গোটা দশেক টাকা প্রতিমাদেবীর কাছে রয়েছে। তাতে কদিন চলতে পারে সেটা জেনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আসন্ন মংপুবাসের মেয়াদ ঠিক করবেন। পরে প্রতিমাদেবীর স্মৃতিকথন থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ একটা সময়ের পর বৈষয়িক সংশ্রব ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন থেকে কোনোদিন হাতে টাকা রাখতেন না। যদি কেউ কখনও প্রণামী দিয়ে যেত তখনই প্রতিমাদেবীকে ডেকে বলতেন, ‘তোমার ব্যাঙ্কে এটা জমা রাখো।’ তারপর মাঝে মাঝে সেটার হঠাৎ খোঁজ পড়ত। তখন যা প্রয়োজন, সেটা পেলেই ছোটো ছেলের মতো খুশি। আবার শান্তিনিকেতন বা অন্যের সম্বন্ধে বৈষয়িক ব্যাপার উপস্থিত হলে একজন উঁচুদরের বৈষয়িকের মতোই সব বুঝে পরামর্শ দিতেন।’ এ যেন ঠিক ছোটো ছেলে আর মায়ের গল্প।

প্রতিমাদেবী
প্রতিমাদেবীর কথায় জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ পাহাড় ভালোবাসতেন না। নদী ভালোবাসতেন। কারণ নদীর মধ্যে আছে একটা বিস্তীর্ণ গতিশীলতা। যদিও পাহাড়েও তিনি বাড়ি তৈরি করেছিলেন। নতুন নতুন বাড়ি তৈরি ছিল তাঁর শখ। প্রতিমাদেবী লিখেছেন, ‘তিনি সবসময় একটি কল্পিত বাসভবন মনে মনে গড়ে তুলতেন, তার সঙ্গে বাস্তব জগতের মিল হত না কোনোদিন, তখন তিনি আবার গড়তেন নতুন বাসার কল্পনা।’ ১৯৩০ সালে প্রতিমাদেবীকে লেখা একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ এক আশ্চর্য স্টুডিও-র কল্পনা করেছিলেন। সে স্টুডিও হবে ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে, শালবনের ছায়ায়—খোলা জানালার ধারে। বাইরে খাড়া একটা তালগাছ। পাতার কাঁপন লাগা রোদ্দুর এসে পড়েছে স্টুডিও ঘরের দেওয়ালে। কুড়ুচি ফুল, বাতাবি লেবুর গন্ধে ঘেরা সেই ঘর, জারল পলাশ মাদার, চামেলি লতা ঘিরে থাকবে ঘরটিকে। নদীতে লাল পাথরে বাঁধানো ছোটো ঘাট নামবে। পাশে থাকবে চামেলি লতা। মেঝেতে ঘন লাল রঙের জাজিম আর বাসন্তী রঙের দেয়াল। দূর থেকে ভেসে আসবে কোনো মিষ্টি গলার গান!’ এইসব কল্পনা আর ইচ্ছে আবার চাপা পড়ে যেত দায়িত্ব আর কর্তব্যের ভিড়ে।
প্রতিমাদেবী ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তৈরি হয় অন্য এক সম্পর্কের সেতু, যার ভরকেন্দ্র বাৎসল্য প্রতিবাৎসল্য। রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে প্রতিমাদেবীই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম অবলম্বন।
অসুস্থ শরীরেও রবি ঠাকুর হাজির হলেন তাঁর মামণি ওরফে প্রতিমাদেবীর কাছে সুদূর কালিম্পঙে, সঙ্গে সুধাকান্ত। প্রতিমাদেবী খুব বকুনি দিলেন সুধাকান্তকে, বললেন, ‘তুমি কোন্ সাহসে এই পাহাড়ে রাস্তায় বাবামশায়কে নিয়ে এলে, দরকার হলে আমাকে লিখলে আমি না হয় চলে যেতুম।’ আসলে মনখারাপ বা শারীরিক অসুস্থতার মুহূর্তে প্রিয়জনকেই কাছে চায় মানুষ। রবীন্দ্রনাথও বললেন, ‘বউমা, মৈত্রেয়ী লিখেছিল ওর ওখানে যেতে কিন্তু সেখানে যেতে সাহস হল না, আমি এখানেই এলুম। ডাক্তাররা বলেছেন আমার কখন কী হয়, তাই তোমাদের কাছে থাকাই ভালো।’ চিঠিপত্রেও অনর্গল কথা বলে যেতেন বউমার সঙ্গে। বলতেন সারাদিনের খাওয়া দাওয়ার গল্প—মস্ত একডালা মাখন চিনি সহযোগে, চায়ের সঙ্গে দুটি তোস রুটি, মিষ্টি। দুপুরে আতপ চালের সাদা ভাত, আলুসিদ্ধ, কচুসিদ্ধ, কোনো কোনোদিন ওলসিদ্ধ। সঙ্গে ঘোল। তিনটের সময় বাগানের আতা এবং আঙুরের রস। সন্ধে ছটার সময় ভূষিসমেত আটার দুই খণ্ড রুটি, সিদ্ধ আলুভাজা, এক পেয়ালা দুধ আর ফলের রস মিশিয়ে। এইসব বর্ণনার পরে আসে আসল কথা— ‘তুমি কবে এসে আমাদের ভার গ্রহণ করবে সে জন্য তাকিয়ে আছি।’
সারাজীবনের নির্ভরতা আর শেষবেলার এই আবদারের মধ্যে ফারাক আছে বিস্তর। ‘নির্বাণ’ বইটিতে প্রতিমাদেবী এঁকে রেখেছেন তাঁর বাবামশায়ের দ্বিতীয় শৈশবের চিত্র। কোনো কোনো দিন কালিম্পং শহরের পাহাড়ি ঠান্ডায় জানালা খুলে পর্বতের শৃঙ্গ দেখতেন রবীন্দ্রনাথ। তখন মামণি প্রতিমাদেবীর কাছে বাবামশায় রবি ঠাকুরের জুটত মৃদু বকুনি। — ‘বাবামশায়, নূতন ঠান্ডা, এখানে আপনি একটা গরম জোব্বা পরুন, কেবলমাত্র আলোয়ান এখানকার পক্ষে যথেষ্ট নয়।’ রবি ঠাকুর হেসে বলেছিলেন, ‘তোমরা বড় শীতকাতুরে, এ কি আবার ঠান্ডা।’ তারপর লিখলেন, ‘পাহাড়ের নীলে আর দিগন্তের নীলে/ শূন্যে আর ধরাতলে মন্ত্র বাঁধে ছন্দে আর মিলে।/ বনেরে করায় স্নান শরতের রৌদ্রের সোনালি।/ হলদে ফুলের গুচ্ছে মধু খোঁজে বেগুনি মৌমাছি,/ মাঝখানে আমি আছি,/ চৌদিকে আকাশ তাই দিতেছে নিঃশব্দ করতালি।/ আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ,/ জানে তা কি এ কালিম্পঙ।’ গভীর রাতে শরীর খারাপ লাগলেও প্রতিমাদেবী বাবামশায়ের কোলের উপর দিয়ে আসতেন কবিতার খাতা। হাতে দিতেন কফির পেয়ালা। তাঁর কথা শুনে ডাক্তারকে দেখতে আসার অনুমতি দিতেন। কালিম্পঙের পাহাড়ি পথ পার করে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আসা হল জোড়াসাঁকোয়। দোতলার পাথরের ঘরে রাখা হল তাঁকে। পাশে রয়েছেন প্রতিমাদেবী। অল্প চেতনা হতেই বললেন, ‘এ কোথায় আমাকে আনলে বউমা।’ প্রতিমাদেবী নিজেকে সংযত করে উত্তর দিলেন, ‘এ আপনার পাথরের ঘর।’ রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, পাথরই বটে, কী কঠিন বুক, একটুও গলে না।’

শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ
প্রতিমাদেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের সেবার জন্য একটি সেবক সেবিকা সংঘ গঠিত হয়েছিল। যখন রবীন্দ্রনাথ সুস্থ ছিলেন তখন মজা করে বলতেন, ‘মহাত্মাজী আমার চেয়ে ভাগ্যবান, তাঁর সেবক সেবিকার অভাব হয় না।’ কিন্তু রবি ঠাকুরের সেবক সেবিকারও অভাব হয়নি। যদিও সকলের সেবা তিনি গ্রহণ করতে পারতেন না। প্রতিমাদেবী লিখেছেন, ‘তাঁর মনের মতো সেবক হতে গেলে কতগুলি বিশেষ গুণ থাকা দরকার হত। সে ব্যক্তির স্পর্শ হবে কোমল, থাকা চাই তার ঈষৎ ইঙ্গিতেই বুঝে নেবার মতো প্রখর কল্পনাশক্তি, সে হবে সদা প্রফুল্ল, হাতের কাজে নিপুণ, উপরন্তু রহস্যালাপের সমজদার।’ শেষবেলায় তাঁর সেবার দায়িত্বে প্রতিমাদেবী ছাড়া ছিলেন নন্দিতা কৃপালনী, অমিতা ঠাকুর, রানি মহলানবিশ, মৈত্রেয়ী সেন, শ্রীমতী ঠাকুর, রানি চন্দ, সুরেন্দ্রনাথ কর, বিশ্বরূপ বসু, অনিলকুমার চন্দ, সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, সরোজরঞ্জন চৌধুরী, বীরেন্দ্রমোহন সেন প্রমুখ। দূরের অনেক বন্ধু দেখা করতে আসতেন তাঁর সঙ্গে। কৃতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ প্রতিমাদেবীকে জানিয়েছিলেন, ‘মামণি, আমার কাছে যাঁরা আসেন তাঁদের সময় ব্যর্থ যাবে না, আমার ক্ষমতা আছে প্রতিদানের। তাঁদের অধ্যাত্মলোকে আমার শেষ স্পর্শ রেখে যেতে পারব।' ‘শেষলেখা’-র কবিতায় তিনি লিখে গিয়েছেন, ‘আমি চাই বন্ধুজন যারা/ তাহাদের হাতের পরশে/ মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে/ নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।’
প্রতিমাদেবী দেখেছেন ধীরে ধীরে তাঁর বদলে যাওয়া চেহারা। শীর্ণ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তাতে তাঁকে ব্যাধিগ্রস্ত দেখাত না। তাঁর চোখের উজ্জ্বলতা একটি করুণায় পূর্ণ হয়েছিল। তাঁকে মনে হত তপঃক্লিষ্ট ঋষি, আধ্যাত্মিক জ্যোতির মধ্যে দিয়ে চলেছেন মহাপ্রস্থানের পথে, মুখে ঠিকরে পড়ত একটি প্রীতি ও শান্তির ধারা। বড়ো চুল আর রাখতে চাইতেন না বলে রুপোলি কেশগুচ্ছ কেটে দিতে হয়েছিল, চুল ছাঁটাতে প্রশস্ত কপালের গঠন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নাসার উপর দিয়ে অর্ধাস্যেররেখায় দার্শনিকের ছবি ফুটিয়ে তুলত। রোগশয্যায় কবির চেয়ে তাঁকে তখন এক দার্শনিক বলেই মনে হত। এক আশ্চর্য বন্ধন ছিল রবীন্দ্রনাথ ও প্রতিমাদেবীর। ৩০ জুলাই, ১৯৪১ সালে শেষ চিঠি লিখলেন বাবামশায় তাঁর মামণিকে—
যখন রবীন্দ্রনাথ সুস্থ ছিলেন তখন মজা করে বলতেন, ‘মহাত্মাজী আমার চেয়ে ভাগ্যবান, তাঁর সেবক সেবিকার অভাব হয় না।’ কিন্তু রবি ঠাকুরের সেবক সেবিকারও অভাব হয়নি। যদিও সকলের সেবা তিনি গ্রহণ করতে পারতেন না।
মা-মণি,
তোমাকে নিজের হাতে লিখতে পারিনে বলে কিছু লিখতে রুচি হয় না। কেবল খবর নিই আর কল্পনা করি তুমি ভালো আছ—অন্তত এখানকার সমস্ত দুশ্চিন্তার ভিতর থেকে দূরে থেকে কিছু আরামে আছ। কিছু তাপ এখনো তোমার শরীরে আছে সেটা ভালো লাগছে না। কেননা ক্ষুদ্র শত্রুর জেদটাই সবচেয়ে দুঃখজনক। আমাকে প্রত্যহই একটা না একটা খোঁচা দিচ্ছেই—বড়ো খোঁচার ভূমিকা স্বরূপে। শুনেছি বড়োর আক্রমণ তেমন দুঃসহ নয়, এইসব ছোটো ছোটোর উপদ্রব যেমন। —যাই হোক, এরও তো অবসান আছে এবং তারও খুব বেশি দেরি নেই। চুকে গেলে নিশ্চিন্ত থাকব।
—বাবামশায়।
শেষের সেদিন সত্যি এল। প্রতিমাদেবী শান্ত সমাহিত হয়ে বসে। বাইরে জনতার শোকপ্রবাহ। কে যেন এসে বললে, এইবার ওঁকে নিয়ে যাচ্ছে, শোকযাত্রা শুরু হবে। প্রতিমাদেবী দৌড়ে দেখতে গেলেন জানালা দিয়ে। শেষ দেখা হল না। একটা প্রকাণ্ড মানবসমুদ্রের ঢেউ তাঁকে গ্রাস করে নিল। তাঁর মহান আত্মা ব্যাপ্ত হল ভূমার নিরবচ্ছিন্ন স্তব্ধতায়। সেই সঙ্গে এই জন্মের মতো সমাপ্ত হল রবীন্দ্রনাথ আর প্রতিমাদেবীর বাৎসল্য প্রতিবাৎসল্যের এক অলৌকিক অধ্যায়।
______________
সহায়ক গ্রন্থঃ নির্বাণ, প্রতিমা ঠাকুর
