
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যখন সারা দেশে লড়াই তীব্র হচ্ছে
বামেদের সত্যিই বিধি-বাম। দেশে যখনই কোনো সংকট-সময় আসে, তখনই তারা এক একটি ‘ঐতিহাসিক ভ্রান্তি’-র বোমা ফাটায়। তা সেই ১৯৪২, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে হাল আমলের ১৯৯৬, ২০০৮, এমনকী চলতি বছরে সীতারাম ইয়েচুরিকে সাংসদ হওয়া থেকে বঞ্চিত করা পর্যন্ত। কেউ মনশ্চক্ষে দেখতেই পারেন, ভুলের মালা পরে প্রকাশরা মেতেছে আজ মরণ রঙ্গে।
সাম্প্রদায়িকতা যখন আসে, অনেক সময়েই তা মধুর মধুর বাঁশি বাজিয়ে আসে। অনেক মানুষ মনে করতে থাকে, ঠিকই তো, ওদের বড্ড বাড় বেড়েছে। আবার অন্যরা হয়তো ভাবছে, নাঃ এদের সঙ্গে থাকা যায় না। আমরা আমাদের সম্প্রীতির ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু এমনটাই আমাদের ইতিহাসে হয়েছে। আর সেই অভিঘাতেই ভারত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আজ আক্ষেপের কথা শোনা গেলেও যা গেছে, তা আর ফিরে আসার নয়। কিন্তু কিছু মানুষ যে সেই দুর্ভাগ্যের কথাও ভুলে যায়, এটাই আশ্চর্যের। আর তাই আমরা আবার দেখছি, দেশে প্রায় একই ধরনের বিপজ্জনক সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিচ্ছে। কিন্তু অতীতের তুলনায় আজকের পরিস্থিতির ফারাক হলো, বিপদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও সমান শক্তি নিয়ে সবল হচ্ছে। এটাই আশার কথা।
আশার কথা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটকে কেন্দ্র করে, আজ সেই সুরে সুর মেলাচ্ছে বহু বহু মানুষ। এই মুহূর্তে একটি বিশেষ সিনেমা নিয়ে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সিনেমা শিল্পী তথা কলাকুশলীরা কিছুক্ষণের জন্য কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করছেন। শাবানা আজমির মতো শিল্পীরা মুখর হচ্ছেন। এর আগে সরব হয়েছেন আরও অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। আসলে খেলাটা হচ্ছে অন্য কারণে। সবাই জানে, গুজরাতে ও হিমাচল প্রদেশে বিধানসভা ভোট সামনে। গুজরাত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্য। এখানেই তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী হবার আগে পর্যন্ত। বারবার এই রাজ্যে মোদিবাবুদের দল জিতলেও এবার কিন্তু তারা শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী। বিজেপি বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি অনেকটাই একজোট হতে পেরেছে, ফলে বেশ কঠিন লড়াইয়ের সামনে পড়তে হচ্ছে খোদ মোদিবাবুকেই। তাই সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলতে হচ্ছে।
কেবল সিনেমা-থিয়েটার নিয়েই নয়, আরও বড়ো মাপের আগুন নিয়েও খেলাধুলো শুরু হয়ে গিয়েছে। আরএসএস-এর প্রধান ব্যক্তি হঠাৎই বলে বসেছেন, অযোধ্যায় রামমন্দির হবে। এই কথা বলার কোনো কারণ ছিল না। আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন। এ নিয়ে মধ্যস্থতা করার চেষ্টাগুলিও তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। কিন্তু ক্ষমতার লোভ এতটাই যে দেশের আইন-আদালত, সংবিধান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যদি গোল্লায় যায় তো যাক, গদি চাই। গুজরাতে গদি চাই, হিমাচলে গদি চাই, সারা দেশ বিরোধীশূন্য করে সব গদি চাই। তাতে যদি লক্ষ মানুষের লাশের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়, তাতেও কুছ পরোয়া নেই। এটাই আজকের দিনের দিনলিপি। কিন্তু এই চক্রান্তকারীরাই কি শেষ কথা বলবে? প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তর নির্ভর করে অনেক কিছুর উপর, এবং প্রশ্নের মতো উত্তরটা মোটেও সহজ নয়।
যেমন ধরুন, এটা সহজেই ভাবা যায়, দেশ দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে, প্রথম ভাগে ধর্মনিরপেক্ষরা, আর ভিলেন সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা। তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর কী করা উচিত? তারা যদি মনে করে দেশ সত্যিই বড়ো বিপদের সামনে, তাদের এক হওয়া উচিত, একসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা করা উচিত। আমরা কি তেমন দেখছি? একটি বিশেষ সিনেমা চলতে দেওয়া হবে না বলে যখন সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা হুঙ্কার ছাড়ছে, যখন মাথার দাম ঘোষণা করা হয়ে যাচ্ছে, সারা দেশে কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, যিনি বললেন, এ রাজ্যে ওই ছবি প্রদর্শনে কোনো বাধা নেই। এতবড় সাহস ওই সব দাঙ্গাবাজদের, যে তারা মমতাকেও আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু মমতাই একমাত্রকেন? সারা দেশের মধ্যে কি এ রাজ্যেই অ-বিজেপি সরকার আছে? না তো! এ রাজ্যে যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী বলে দাবি করে, সেই সিপিআইএম-এর তো দুটো রাজ্যে সরকার! প্রশ্ন জাগে কেন কেরালার মুখমন্ত্রী বা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী এমন কথা বলছেন না! কেন তারা বেশ দিব্যি আছেন, ফাইভ-স্টার হোটেলে সিপিআইএম ও বিজেপি নেতারা বৈঠক করছেন ( কেরালায়), একটু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হচ্ছে, আর আসল ব্যাপারে সবাই চুপ। প্রশ্ন জাগে, যখন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে শারীরিক আক্রমণের শাসানি দেওয়া হয়, বিরাট বিরাট তাত্ত্বিক বাম নেতারা মুখে কুলুপ আঁটেন কেন? আজ, কাল, যে কোনো একদিন তাদের কাজকর্ম, তাদের মুখপত্রের লেখালিখিদেখলেই জানা যাবে, তাদের সব আক্রমণ কেন্দ্রীভূত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। বিজেপির বিরুদ্ধে না বললে কেমন দেখায়, তাই কোনোরকমে একটু বলে নিয়ে আবার সেই অন্ধ মমতা বিরোধিতা। ওদের মনের ভিতরটা আর গোপন রাখা যাচ্ছে না, বেরিয়ে আসছে। তা হলো, বিজেপি কাঁটা দিয়ে মমতা কাঁটা তুলে ফেল। এই রাজনীতিই একদিন ভারতে সর্বনাশ ডেকে এনেছিল, তা থেকে আর যে-ই শিক্ষা নিক, সিপিআইএম যে নেয়নি, তা কিন্তু স্পষ্ট। দুপুরবেলায় খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে লেনিনের বই খুলে কেউ বলছেন এটা রাত, কেউ বলছেন দিন। সব মিলিয়ে দলটার অবস্থা ‘‘যায় যায় দিন, বসে বসে দিন, জানি না এখন রাত কিবা দিন’’
কেবল কী তাই? ইদানিং ভোটেও যেন কেমন একটা আঁশটে আঁশটে গন্ধ। কিছুদিন আগে কোচবিহার লোকসভা উপভোটে বামভোট নেমে গেল ৬ শতাংশের কাছাকাছি, আর বিজেপি দ্বিতীয় শক্তি হয়ে গেল। এতে আপনাদের নৌকা ভাসবে তো কমরেড!
লোকসভা নির্বাচনের ঢাক বাজতে আর বছরখানেক দেরি। সারা দেশ প্রস্তুত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কোনঠাসা করবার জন্য। এ লড়াই আদর্শের লড়াই, দেশকে এক রাখার সংগ্রাম। এই যুদ্ধে হারা যাবে না। তাই কথাটা সোজা সাধারণ মানুষের কাছেই নিয়ে যেতে হবে। ভোট নষ্ট হয়, এমন কিছু করবেন না। যাদের জেতা তো দূরের কথা জামানতও থাকা নিয়ে সংশয় আছে, তাদের ভোটটা দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির সুবিধা করে দেবেন না। সব ধর্মনিরপেক্ষ ভোট জমা হোক এক বাক্সে, কোন বাক্সে সেটা আপনি বুঝে নিন। সেখানেই আপনার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা নিরাপদ থাকবে। তা না হলে আপনি যতই মার্কস-লেনিন আওড়ান না কেন, ইতিহাসের বিচারে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সহায়তাকারী হিসাবেই আপনার নাম লেখা থাকবে।
