
বিয়ে না আইএস-এর দস্য সংগ্রহ, তদন্ত করবে এনআইএ
কেরলে ধর্মান্তরকরণের উদ্দেশ্যে বিয়ে এবং আইএস-এর জন্য সদস্য সংগ্রহ, এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এনআইএ তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। ঘটনাটা অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই বিষয়টাকেই চলতি কথায় নাম দেওয়া হয় লাভ–জিহাদ। প্রথমে হিন্দুত্ববাদীরা এই লাভ–জিহাদের প্রসঙ্গ তুলতে শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে। ফলে এই বিষয়টাকে একটা হিন্দুত্ববাদী জিগির বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এখন আর সেভাবে বিষয়টাকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টাকে উপেক্ষার যোগ্য বলে মনে করেনি। আর মামলাটা সুপ্রিম কোর্টে এসেছেই কেরল হাইকোর্টের একটি রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে।
যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাভ–জিহাদের বিষয়টি এনআইএ–কে দেখতে বলেছে, সে ঘটনা কেরলের। সেখানকার হিন্দু কিশোরী অখিলা অশোকানকে বিয়ে করেন মুসলিম যুবক সাফিন জাহান। কিন্তু তার আগে অখিলাকে ধর্ম পাল্টে মুসলমান হতে হয়। তাঁর নতুন নাম হয় হাদিয়া। এই বিয়েকে লাভ–জিহাদ আখ্যা দিয়ে কেরল হাইকোর্টে গেছিলেন অখিলার বাবা কে এম অশোকন। তাঁর অভিযোগ, এর পিছনে একটা চক্র কাজ করেছে। কেরল হাইকোর্ট ধর্মান্তরকরণের উদ্দেশ্যে এই বিয়ে হয়েছে বলে মনে করছিল। সেই কারণেই এই বিয়ে অবৈধ বলে জানায় হাইকোর্ট। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যায় সাফিন জাহান। মামলা আসে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর ও বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়কে নিয়ে গঠিত বেঞ্চে। সাফিনের কথায় বেশ কিছু অসঙ্গতি খুঁজে পান বিচারপতিরা। তারপর তাঁরা ঘটনার এনআইএ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
এনআইএ তদন্তের নির্দেশ তখনই দেওয়া হয়, যখন এমন কোনও চক্রান্তের বিষয় জড়িত থাকে যা দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আই এসের নামও এসেছে। দেখা যাচ্ছে কেরলে বেশ কিছু কমবয়সী হিন্দু মেয়ের ধর্মন্তরকরণ হয়েছে গত কিছু বছরে। ধর্মান্তরের পর বিয়ে হবে, এমন আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিয়ে হচ্ছে না, বা হলেও টিকছে না। কিন্তু মেয়েটি মুসলমান থেকে যাচ্ছে। তারপর তাকে পরিবারের অন্য মহিলাদের মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত করার কথা বলা হচ্ছে। যে বিশেষ মামলাটি এখন বিতর্কের কেন্দ্রে, সেখানেও অখিলার মা বলছেন নিজে মুসলমান হওয়ার পর মেয়ে তাঁকেও মুসলমান হওয়ার জন্য বলতে থাকে। কাজেই সব মিলিয়ে এখন যে প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে, এক কথায় তা হল: এসব হচ্ছেটা কী?
সেইটা বোঝার জন্যই সুপ্রিম কোর্ট আইএনএ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এক্ষেত্রে একটা প্রাসঙ্গিক তথ্য হল, এ দেশ থেকে যত মুসলিম ছেলেমেয়ে আই এস–এর হয়ে লড়তে গিয়েছিল, তার সিংহভাগই কেরলের। আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলি সব সময়েই মুসলিম মৌলবাদের বিপদ উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে। কিন্তু কেরলে অন্তত এখন আর বামপন্থীদের পক্ষে তা করা সম্ভব হচ্ছে না। আরএসএস কিছুদিন ধরেই বলছে, মুসলিমপ্রধান যে সব জেলায় সিপিএমের একাধিপত্য রয়েছে, সেখান থেকেই বেশি করে ছেলেমেয়েরা আই এস–এ যাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, কেরল সরকারের আইনজীবী ভি গিরিও এনআইএ তদন্তের নির্দেশের বিরোধিতা করেননি।
কে কাকে বিয়ে করবেন, সেটা অবশ্যই প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। এই মতকে সমর্থন করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছেন তিনি নিজে একজন পার্সিকে বিয়ে করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এখানে প্রশ্নটা বিয়ের নয়। প্রশ্ন হল ধর্মান্তর করার উদ্দেশ্যেই বিয়েটা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখন অনেকেই বলছেন, এই সব হিন্দু মেয়েকে সিরিয়া ইরাক সহ বিভিন্ন দেশে লড়তে পাঠানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছিল। কেরলের তিন মুসলিম মহিলা আই এসের হয়ে লড়তে চলে গিয়েছেন। সব মিলিয়ে বিষয়টা কিন্তু উত্তরপ্রদেশে যে অভিযোগ উঠছিল তার থেকে আলাদা। উত্তরপ্রদেশে আরএসএসের বক্তব্য ছিল, মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য লাভ জেহাদ শুরু হয়েছে। কিন্তু কেরলে যুক্ত হয়েছে অতি গুরুতর নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এনআইএ–এর অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল মনিন্দর সিং আদালতে বলেন, তাঁরা কোনও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার তদন্ত করবেন না। বরং সামগ্রিকভাবে বিষয়টির তদন্ত করে দেখবেন। এনআইএ বলেছে, এই ধরনের বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। যেমন, মহিলাদের বাড়ি থেকে বার করে হোমে রাখা হয়। এরপরে ধর্মান্তরকরণ। তারপর বিয়ে। একটা নির্দিষ্ট চক্র এবং পদ্ধতিতে এই কাজ করা হচ্ছে। মনিন্দর সিং বলেছেন, ‘দুটো সংগঠন, এই কাজে যুক্ত। মনে হচ্ছে তাদের সঙ্গে সিমির যোগ রয়েছে।’ সিমি হচ্ছে একটি মৌলবাদী মুসলিম সংগঠন, যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনেক বছর আগে। কিন্তু সিমির ছেলেরা পরে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন সহ নানা সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাশকতামূলক কাজ চালিয়েছে।
