বাম ভোটে ক্ষয় কি অব্যাহত আছে?

পরিসংখ্যান বলছে বামেদের ভোট নিন্মগামী

যে প্রশ্নটা শিরোনামে উল্লিখিত হয়েছে, তা বেশ কঠিন প্রশ্ন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চার-পাচটা জেলা ছাড়া অন্য সব জেলাতেই বাম ভোট কমেছে। এর একটা কারণ হিসেবে কোনও কোনও মহল থেকে বলা হয়েছে যে, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার ফলেই এটা হয়েছে। যে সব আসন বামফ্রন্ট কংগ্রেসকে ছেড়েছিল, সেখানে পুরো বাম ভোট কংগ্রেসের ঝোলায় গেলেও বামফ্রন্টের প্রার্থী আছে এমন আসনগুলিতে কংগ্রেসের সমর্থক একটা অংশ বামফ্রন্টকে ভোট দেয়নি। এই কারণেই বাম ভোট কম দেখাচ্ছে। এই মতের প্রবক্তারা মনে করেন, বামফ্রন্ট যদি জোট না করে সব আসনে লড়ত, তাহলে বাম ভোট কমত না। আলোচনাটায় ঢোকার আগে আমরা একবার ২০১৪ সালের সঙ্গে ২০১৬ সালে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের তুলনাটা দেখে নেব।

২০১৪-র লোকসভা ও ২০১৬-র সালের নির্বাচনে রাজ্যে বাম ও কংগ্রেস ভোটের ওঠাপড়া

সারণী থেকে দেখা যাচ্ছে, বামফ্রন্টের ভোট বেড়েছে পাঁচটি জেলায়। এই পাঁচ জেলা হলো দক্ষিণ দিনাজপুর, নদিয়া, হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর ও বর্ধমানে। এর মধ্যে নদিয়া, হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরের ভোট বৃদ্ধি ১ শতাংশেরও কম। কেবলমাত্র দক্ষিণ দিনাজপুর ও বর্ধমানে এক শতাংশের বেশি ভোট বেড়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে পাঁচ শতাংশের বেশি বাম ভোট বৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো।

অপরদিকে কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে ১৫টি জেলায়। তাদের ভোট কমেছে পাঁচ জেলায়। এই পাঁচ জেলা হলো আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও পুরুলিয়ায়। এর মধ্যে আলিপুরদুয়ার ও মালদহে তাদের ভোট হ্রাস ১ শতাংশের কম। উত্তর দিনাজপুরে কংগ্রেসের ভোট কমেছে ৪.৩০ শতাংশ, মুর্শিদাবাদে ৪.০৭ শতাংশ ও পুরুলিয়ায় ২.৬৭ শতাংশ।

 সারা পশ্চিমবঙ্গে বাম ভোট মোটামুটি আড়াই শতাংশ কমেছে আর কংগ্রেস ভোট আড়াই শতাংশ বেড়েছে। যদি ধরে নেওয়া যায়, জোটের আদানপ্রদানের ফলে মোটের উপর কারোরই ক্ষতি হয়নি, এবং ২০১৪ সালের তুলনায় বাম ও কংগ্রেসের ভোট কমেনি, তাহলে এই তত্ত্বের সঙ্গে ১৫টি জেলায় বাম ভোট কমা এবং ১৫টি জেলায় কংগ্রেসের ভোট বাড়াকে মেলানো কঠিন। আসলে ঘটনাটা কী ঘটেছে, তা বোঝার জন্য আমাদের অন্য কোনও পথ খুঁজতে হবে।

এ বার রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৭৩টি আসনে বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থী ছিল। দার্জিলিং পাহাড়ের তিন আসনে বামফ্রন্ট বা কংগ্রেস কেউই প্রার্থী না দিয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে সমর্থন করেছিল। অন্য ১৮ আসনে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ হয়েছিল। অর্থাৎ এই ১৮টি আসনের ফল সরাসরি ২০১৪ সালের ফলের সঙ্গে তুলনা করা যাবে, কারণ ২০১৪ সালে কোনও জোট বা সমঝোতা হয়নি, তৃণমূল, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও বিজেপি, এই চারপক্ষের চতুর্মুখী লড়াই হয়েছিল। এই ১৮ আসন হলো আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনি (তপশিলি উপজাতি) ও আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর, মালদহ জেলার হরিশ্চন্দ্রপুর ও মালতিপুর, মুর্শিদাবাদ জেলার সুতি, জঙ্গিপুর, রঘুনাথপুর, সাগরদিঘি, মুর্শিদাবাদ, বড়ঞা (তপশিলি জাতি), ভরতপুর, হরিহরপাড়া, নওদা ও ডোমকল এবং নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ(তপশিলি জাতি), পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম এবং বীরভূম জেলায় রামপুরহাট।

নীচে আমরা দেখাব এই ১৮ আসনে ২০১৪ সালে ও ২০১৬ সালে শতাংশের হিসেবে কী ফল হয়েছিল।

যে ১৮টি আসনে ২০১৬ সালের ভোটে সমঝোতা হয়নি, সেগুলির ফলাফল, ২০১৪ ও ২০১৬

আসনগুলির তালিকা থেকে বোঝা যাবে, এই আসনগুলিতে চারটি পক্ষেরই শক্তি রয়েছে। ২০১৪ সালে এই আসনগুলিতে সব থেকে বড় শক্তি ছিল কংগ্রেস। দ্বিতীয় ছিল বামফ্রন্ট, তৃতীয় তৃণমূল ও চতুর্থ বিজেপি। ২০১৬ সালে সেই হিসেবে অনেকটাই বদলে গেছে। এ বার প্রথম শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে তৃণমূল। তাদের ভোট বৃদ্ধি ১১.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের গড়ে তৃণমূলের উত্থান হচ্ছে সব থেকে দ্রুতগতিতে। আরও লক্ষণীয় যে, এই ভোট আসছে মূলত বামফ্রন্টের ভোট-ভাণ্ডার থেকে।

বামফ্রন্টের ভোট দারুণ ভাবে কমে গিয়েছে। তাদের ভোট কমেছে ১০.৫৭ শতাংশ। কংগ্রেসের ভোট কমেছে ০.৭২ শতাংশ। বিজেপি হারিয়েছে ২.৭৪ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ এই তিন শক্তির মিলিতভাবে সমর্থন কমেছে ১৪.০৩ শতাংশ। এর দশ ভাগের ৮ ভাগই গিয়েছে তৃণমূলের ঝোলায়। বাকি দুই ভাগ নির্দল ও অন্যান্য এবং নোটায় গেছে।

যদি বামফ্রন্ট তাদের ভোট ধরে রাখতে পারত, তা হলে নিজেদের শক্তিশালী জায়গায় প্রায় ১০ শতাংশ ভোট খোয়াতো না। এই লক্ষণ থেকে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে বামভোটের ক্ষয় অব্যাহত আছে। কংগ্রেসও তাদের শক্তির এলাকায় ভোট খুইয়েছে। এবং যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে প্রথম শক্তি থেকে দ্বিতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে তিন প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে কংগ্রেসের শক্তিক্ষয় সব থেকে কম। অন্যদিকে বিজেপি কিছু ভোট হারালেও ১০ শতাংশের উপরে থাকতে সক্ষম হয়েছে। তা হলে কি বিজেপি দশ শতাংশ ভোটের অধিকারী হয়ে স্থায়ীভাবে রাজ্য রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে চলেছে? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই ছবিটা দেখে অবশ্য সরাসরি কোনও সিদ্ধান্তে না আসাই ভাল। বামেদের ভোট ক্ষয় বিষয়ে আমরা অন্য এক দিকে থেকেও অনুসন্ধান করেছি। ২০১৪ সালের ফল দেখলে বোঝা যাবে, রাজ্যে এমন সাতটি আসন ছিল, যেখানে কংগ্রেস দেড় শতাংশের থেকেও কম সমর্থন পেয়েছিল। অর্থাৎ এই সাত আসনে কংগ্রেসের ভোট নেই বললেই চলে। সাতটি আসনেই ২০১৬ সালে জোট হয়েছিল, সবকটিতেই লড়েছে বামফ্রন্ট। যেহেতু কংগ্রেসের ভোট আগে থেকেই প্রায় নেই, তাই বাম ভোট কমল না বাড়ল, তা বোঝার এটাও একটা উপযুক্ত ক্ষেত্র। সাতটি আসন হল উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ (তপশিলি জাতি), দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবা (তপশিলি জাতি), বারুইপুর পূর্ব (তপশিলি জাতি), ক্যানিং পূর্ব, পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া (তপশিলি জাতি), বাঁকুড়ার শালতোড়া (তপশিলি জাতি) এবং ওন্দা। তুলনাটা একবার দেখা যাক।

যে ৭ আসনে ২০১৪-তে কংগ্রেসের ভোট দেড় শতাংশের কম ছিল, সেগুলির ফলাফল, ২০১৪ ও ২০১৬

তৃণমূলের ভোট এ সব আসনে বেড়েছে ২.২৭ শতাংশ। বাম ভোট বৃদ্ধি ২.৭৯ শতাংশ। বিজেপি ভোট কমেছে ৩.৩৬ শতাংশ। সবকটি আসনে জোটের বাম প্রার্থী হওয়ায় কংগ্রেসে ঝোলায় কোনও ভোট নেই। নির্দল ও অন্যান্যর ভোট কমেছে ১.৩১ শতাংশ ও নোটা ভোট বেড়েছে ০.৬৫ শতাংশ।

দেখা যাচ্ছে, এই ৭ আসনে তৃণমূলের ভোট বৃদ্ধি সারা রাজ্যের (৫.৬৬ শতাংশ) তুলনায় মন্থর। আবার সারা রাজ্যে বাম-কংগ্রেস জোটের ভোট ০.২৩ শতাংশ বাড়লেও এই ৭ আসনে বেড়েছে ২.৭৯ শতাংশ। রাজ্যে শুধুমাত্র বাম ভোট কমে গেছে ২.৪৩ শতাংশ, কিন্তু এই ৭ আসনে বেড়েছে ২.৭৯ শতাংশ। বিজেপির ভোট ২০১৪ সালেই এ সব আসনে কম ছিল এ বার আরও ৩.৩৬ শতাংশ কমে গেছে। বাম ভোটের মধ্যে কংগ্রেসের ২০১৪ সালে প্রাপ্ত ১.৩৩ শতাংশ ভোট ঢুকে আছে ধরে নিলেও বিজেপি ছুট ভোটের একটা অংশ বাম ভাঁড়ারে গিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। লক্ষণীয়, এই ৭ আসনই কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে, যেখানে ভোট পঞ্চাশ শতাংশ ছুঁই-ছুঁই। এ থেকে মনে করা যেতে পারে, দক্ষিণবঙ্গের এ সব জায়গায় তৃণমূল ভোটের বৃদ্ধি হয়ত একটা প্রায় সমতল মালভূমিতে ঢুকছে। একটু অসতর্ক হলে তৃণমূলের চার-পাঁচ শতাংশ ভোট শিবির বদল করতে পারে, সেক্ষেত্রে কিন্তু দুই প্রধান প্রতিপক্ষের মধ্যে লড়াইটা সমানে সমানে হবে। অন্যদিকে জোট না হওয়া ১৮ আসনের ১৫টিই উত্তরবঙ্গে। এই এলাকায় প্রাচীন বাম দুর্গ ভাঙছে, তৃণমূলের উত্থান হচ্ছে উল্কাগতিতে। হয়ত অচিরেই এখানে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে তৃণমূল ও কংগ্রেস বামফ্রন্টের ভূমিকা হবে গায়কের পাশে তবলিয়ার মতোই।

Developed by DXDasia