
পর্ব – ১০
বাতাস যখন ছাতিমের গন্ধে ভারি হয়ে আসে আর কাছেপিঠের কোনও শিউলিগাছ নুয়ে পড়ে ফুলের ভারে কিংবা আসতে আসতে দিন ছোটো হতে থাকে আর রাত বড়ো, তখন সব বাঙালিরই মনে উঁকি দিয়ে যায় দুটি শব্দ – পুজো আসছে! কেউ কেউ বলে পুজো ওই আসছে-আসছে ব্যাপারটাই ভালো, এসে গেলেই চলে যায়। ঠিক তাই। চারদিন যে কোথা থেকে কেটে যায় আমরা টের পাই না। আর আমাদের সকলেরই দুর্গাপুজো বারোয়ারি হওয়া সত্ত্বেও খুবই ব্যক্তিগত একটা উৎসব। প্রত্যেকের জীবনের বিভিন্ন পরতে পুজোর নানা স্মৃতি জমতে থাকে। আর আমার?
আসলে আমার বা আমাদের দুর্গাপুজো একটি সরকারি আবাসনের পুজো। এই আবাসনের পুজোগুলির একটা আলাদা ব্যাপার থাকে। এ পুজো ঠিক পাড়ার পুজো নয় আবার বিরাট ফ্ল্যাটবাড়ি অ্যাসোসিয়েশনের পুজোও নয়। নির্দিষ্ট চাঁদার মধ্যে এই পুজোর আন্তরিকতা অন্যরকম। অল্প রসদ হলে হবে কি, কোনও অনুষ্ঠানই বাদ থাকে না। আমাদের সেই আবাসনেও এই রকমই সব হত। পুজোর চারদিন নানা কিসিমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছোটোবেলায় এক দল ছিল আমাদের বড়ো যাঁরা এগুলোর দায়িত্বে থাকতেন। কিন্তু আমি যখন প্রায় চাকরি করি, যখন ওই আবাসন পুরোনো লোকেরা সব চলে গিয়ে নতুন সমস্ত আবাসিকে ভরে উঠছে তখন একটা মানুষকেই বারবার চোখে পড়ত – লাভেলা মজুমদার। টেনান্টস অ্যাসোসিয়েশনের সন্ধ্যাবেলার অনুষ্ঠানের সব দায়িত্বেই তিনি। একবার আমাকে বলা হল, ‘তুই পুজোয় একটা ডান্স ড্রামা জাতীয় কিছু করা!’ আর আমিও দু-রাতের মধ্যে একটা স্ক্রিপ্ট নামিয়ে দিলাম- পাঁচটা গানের নাচ। কিন্তু নাচবে কে? আমায় অ্যাসোসিয়েশন থেকে যে-সমস্ত লোকজন দেওয়া হল তার মধ্যে সব থেকে বড়োটিই পড়ে ক্লাস সিক্স বা সেভেনে! এদের দিয়ে কী করে হবে? তখন আমিই প্রস্তাব দিলাম, ‘গার্জেনদেরও নাচতে হবে।’ সকলেরই ইচ্ছা কিন্তু কে কী বলবে তাই এক পা এগোতে পারছে না কেউ। একজন অবশ্য দেরি করেননি। লাভেলা মজুমদার। আমি তখন তাঁর মেয়ে যে-স্কুলে পড়ে সেখানকার মাস্টারমশাই। তাই তিনি বলেন, ‘আমি করবো, স্যার! আপনি তুলিয়ে দিলে পারব।’ অতএব, শুরু হয়ে গেল রিহার্সাল আর যেদিন অনুষ্ঠান হল তিনি অসাধারণ নাচ করলেন।

এরপর এক অদ্ভুত যৌথ চলা শুরু হয়। আমি যাই-ই করি তিনি অনুপ্রাণিত হন। আর পৃথিবীর যে-কোনও নৃত্য-উৎসাহী মানুষের মতো তিনিও আমার এক পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠেন। আমরা সকলেই জানি বাঙালি মেয়েদের নাচ খুব সহজ বিষয় নয়। চোখের সামনে বহু মেয়েদের আমরা নাচের চর্চা করতে দেখি ঠিকই কিন্তু প্রতিটি মেয়েরই কিছু না কিছু সংগ্রাম ও তার ইতিহাস থাকে পেছনে সাক্ষী হয়ে। লাভেলারও তাই। শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে পড়াশোনার পর চুটিয়ে টিউশন করে করুক, কিন্তু নাচ? ওরেব্বাবা! নাচ কখনওই নয়। তিনি তাই নিজের ইচ্ছেগুলো টিউশন পড়তে আসা ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে দিয়ে কোচিঙেই রবীন্দ্রজয়ন্তী, শারদীয়ার উৎসব করে জিইয়ে রাখতেন। হাত-পা নাচের জন্য নিশপিশ করলেও বেলুড়ের সেই আবহে পারতেন না তেমন কিছু করতে। তারপর টালিগঞ্জে বিয়ে। স্বামী এসবে অরাজি ছিলেন তা নয় আবার কোনওরকম উৎসাহ প্রথম প্রথম দেখাতেন, সেটাও নয়। কোলে যখন মেয়েটা এল, বড়ো হল সে মেয়ে লাভেলা ওর মধ্যেই নিজের নাচের জায়গা খুঁজে নিলেন। তবে সতর্কও থাকতেন যে কখনও পরোক্ষভাবে মেয়েকে চাপ না দিয়ে ফেলেন। তা করতে হয়নি অবশ্য। মেয়ে নিজেই নাচে ডুবে গিয়েছিল। সেই যে নাচের স্কুলগুলোতে কত মা-কে আমরা দেখি তাঁর সন্তানটিকে নিয়ে বসে আছেন সেই মা-দের মধ্যে এমন বহু লাভেলা আছেন। কিন্তু এত সহজেই কি সব যুদ্ধ জেতা যায়? জীবনের পথে আরও কত কাঁটা অপেক্ষা করে থাকে আমাদের পায়ে ফুটবে বলে। লাভেলার স্বামী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন মেয়ে তখন বেশ ছোটো। ঘর-হাসপাতাল আর অপারেশন-ওষুধে দিন কাটতে থাকে। চলে আর্থিক অনিশ্চয়তাও। লাভেলা হাল ছাড়েন না ঠিকই কিন্তু শান্তি, সংস্কৃতি, আনন্দ- সব উধাও হয়ে যায় জীবন থেকে। আর নাচ? ধুর! কাল স্বামী থাকবে না চলে যাবে ইহ জগৎ ছেড়ে, পরশু খেতে পাব কি পাব না তার মধ্যে আর নাচ!
তবে স্বামী সাময়িক সুস্থ হন। তাও অফিস যেতে পারেন না। লাভেলাকে সঙ্গে যেতে হয়। বসে থেকে আবার স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে হয় বাড়ি। রোজ। প্রতিদিন। স্বামীর ওই সরকারি অফিসে এত ঘণ্টা অপেক্ষা করতে করতেই মনের আয়নায় ভেসে ওঠে কোনও মঞ্চে হয়তো তিনি নাচছেন কথকনৃত্য কিংবা রবীন্দ্রনাথের কোনও গানে শরীর মেলছেন। মনে হয় জীবনে যদি একটু নাচ না করা যায় তবে জীবন বুঝি বৃথাই গেল। কিন্তু তারপরই সেই আয়নাতে ভেসে ওঠে দুটি মুখ-ছোট্ট মেয়েটা আর অসুস্থ, অসহায় স্বামী। আর তখনই চোখের সামনে থেকে সব মঞ্চ উধাও হয়ে যায়। আলো গিয়ে অন্ধকার নেমে আসে। আর নিজের অজান্তেই খুলে রাখতে হয় দু-পায়ের ঘুঙুরজোড়া!

এর বহু বছর পর আমার সেই প্রস্তাব, ‘গার্জেনদেরও নাচতে হবে।’ ততদিনে ওঁরা এই আবাসনে এসে খানিক থিতু হয়েছেন। মেয়ে আরেকটু বড়ো হয়েছে। স্বামী অসুস্থ ঠিকই কিন্তু ঘন ঘন ঘর-হাসপাতাল করতে হচ্ছে না আর তিনি অফিসেও যেতে পারছেন নিয়মিত। সে-কারণেই লাভেলা আমাকে বলে উঠেছিলেন একটু শিখিয়ে দিলেই উনি পারবেন। আসলে এই ‘পারা’টা তো বহুযুগের স্বপ্ন। আত্মবিশ্বাস। এবারে তো পারতেই হবে। তাই এগিয়ে এসেছিলেন আর অনুষ্ঠানের দিন ভাল নাচ করেওছিলেন। আর তারপরই সব বাঁধ ভেঙে যায়। তারপর আবাসনের সব অনুষ্ঠানের নেতৃত্বে তিনিই। সুন্দর, সুন্দর স্ক্রিপ্ট করে রবীন্দ্রজয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস, দুর্গাপুজো- সবেতেই তিনি সকলকে নিয়ে নাচের অনুষ্ঠান করতেন। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁর শরীরে ছাপ ফেলেছিল। অবশ্য উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে বেশি পরিমাণ সর্করা এমনকি কোমরের স্লিপডিস্ক- কোনওকিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। তিনি হয়তো খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পীদের মত মঞ্চসফল প্রযোজনা নির্মাণ করতে পারেননি কিন্তু আমাদের আবাসনের ওই ছোট্ট মঞ্চটায় আবাসনেরই ছোটো-বড়ো সকলকে যে সংস্কৃতির স্বাদ তিনি এনে দিয়েছিলেন, তা বড়ো কম কথা নয়!
কিন্তু জীবন যে নির্দয়! কয়েক বছর বেশ আনন্দেই কেটে যাচ্ছিল কিন্তু তাঁর স্বামী আমাদের দেবাশিসদা আর বাঁচলেন না। মেয়ে তখন উচ্চমাধ্যমিকের দোরগোড়ায় বুঝি আর বিশ্বজুড়ে অতিমারী। নিজের প্রাণ বাজি রেখে আবার সেই ঘর-হাসপাতালের সফর শুরু হল। তাও শেষ রক্ষা হল না। সেটা এমনই এক পুজোর আগে আগে। সে-বছরও আবাসনের অনুষ্ঠান করিয়েছিলেন তিনি। হাসপাতাল থেকে ফিরে রিহার্সালে আসতেন। তাঁকে দেখে বোঝা যেত না আগামীকাল স্বামী থাকবেন কি না সন্দেহ, সেটা তিনি জানেন। এসব কি শুধুই কর্তব্যের জন্য? তা নয়। বহু বড়ো বড়ো শিল্পীর মাঝে ছোটো পাড়ায়, আবাসনে এমনকি ঘরে ঘরে অনেক মানুষ থাকেন যাঁরা ওই নাচ-অন্তপ্রাণ। যাঁরা জীবনের সবকিছু বাজি রাখতে পারেন নাচকে ভালোবেসে। লাভেলা মজুমদার ঠিক তাঁদের মতো।

আরেকটা পুজো চলে এল। ছাতিম-শিউলির গন্ধে বাতাস মাতোয়ারা। আকাশ রোদ আর ঝিরি বৃষ্টির লুকোচুরিতে আনমনা। মহালয়ার পর থেকেই কলকাতার পথে মানুষের ঢল মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখার। আমাদের আবাসনেও আলো জ্বলেছে। পুরো আবাসনটাই পুজোর আনন্দে গমগম করছে। কিন্তু আমি কান পেতে আছি কখন মাইকে শুরু হবে আশা ভোঁসলের কণ্ঠে ‘দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’ আর সব শেষে ঘোষণা হবে- ‘আজকের নৃত্যানুষ্ঠানের সামগ্রিক পরিচালনায় ছিলেন শ্রীমতি লাভেলা মজুমদার…!’
চলবে…
____
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।
