কোহিনুর সেন বরাট : সৃজনশীল নৃত্যে এনেছেন গণতন্ত্র, অধিকার আর সাম্যের জয়গান

পর্ব ৩৪

কটা সময় বাঙালিদের বাড়িতে হিন্দি ছবি দেখার ওপর একটা নিষেধাজ্ঞা চালু ছিল। রুচি নষ্ট হয়ে যাবার জন্য হিন্দি ছবি দেখা থেকে বিরত থাকার নিদান দিতেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় তাঁর বহু সাক্ষাৎকারে। অথচ বাঙালি লুকিয়ে হলেও সেসব ছবি দেখত। ছবির জনপ্রিয় গান গুনগুন করত। নায়ক-নায়িকার ঢঙে সাজপোশাক পড়ত, চুলের ছাঁট দিত যুবক-যুবতীরা। অর্থাৎ চাপা হলেও হিন্দি ছবির প্রভাব বাঙালি দর্শকদের মনে রয়ে গিয়েছিল মারাত্মক। এমনই একটা ব্যাপার চলত বাংলার সৃজনশীল নৃত্য নিয়ে। সকলে জোর দিতেন শাস্ত্রীয়নৃত্যের ওপর কিন্তু বাংলার দিকপাল শিল্পীরা তাঁদের স্বকীয়তা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচয় তৈরি করেছিলেন সৃজনশীল নৃত্যের হাত ধরেই। বাংলায় সৃজনশীল নৃত্যের পথিকৃত নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর উদয়শঙ্কর এবং তাঁর সৃষ্ট ঘরানার শিল্পীরা। এবং একটা সময় মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার ও তাঁর সুযোগ্যা কন্যা ও শিষ্যা রঞ্জাবতী সরকার। বাংলার নৃত্যের এ এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলার শিল্পীরা শাস্ত্রীয়নৃত্যের সমস্ত রস গ্রহণ করেছেন কিন্তু সেই সঙ্গে নিজেদের শিল্পের, প্রকরণের এক নবরূপ নির্মাণ করেছেন সৃজনশীলতার সঙ্গে। বাংলা ও বাঙালির নৃত্যচর্চা নিয়ে কোনও আলোচনা অতএব সৃজনশীল নৃত্য ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। তবে এ-ও সত্য সৃজনশীল নৃত্যের নামে যা খুশি তাই হাত-পা নেড়ে একটা জগাখিচুড়ি কিছু তৈরি করা যায় না। বাংলার সৃজনশীল নৃত্যে ও তার চর্চা ঐতিহাসিকভাবে খুবই গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলার অন্যতম প্রধান সৃজনশীল নৃত্যশিল্পী কোহিনুর সেন বরাট

আজ যদি সেই সৃজনশীল নৃত্যের একজন প্রকৃত গুরুর কথা ওঠে তবে নিঃসন্দেহে সবার প্রথম গুরু শ্রী কোহিনুর সেন বরাট (Kohinoor Sen Barat)-এর প্রসঙ্গ আসবেই। বাংলায় এখন অনেক সৃজনশীল নৃত্যশিল্পী। টিভির পর্দায়, রিয়েলিটি-শোগুলোতে, সিনেমাতে, পাড়ার ফাংশনে, এমনকি বড়ো বড়ো রাজনৈতিক মঞ্চেও বেশিরভাগ যে ধরনের নাচ হয় সেগুলি সৃজনশীল নৃত্যই। কিন্তু কোহিনুর সেন বরাটের স্বকীয়তা এখানেই যে সৃজনশীল যে নৃত্যের ধারায় তিনি দীক্ষিত, তাঁর একটা ব্যাকরণ আছে। কিন্তু এত কিছু থাকতে সৃজনশীল নৃত্যই কেন? কোহিনুরদার সুন্দর চেহারা আছে, শাস্ত্রীয়নৃত্যের শিক্ষা আছে তবে এতগুলো বছর আগে সৃজনশীল নৃত্যধারাকেই বেছে নেওয়া কেন? কোহিনুরদা তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন, “আমি নিজে মারুথাপ্পা পিল্লাই, শ্রীমতি অনিতা মল্লিকের কাছে ভরতনাট্যম শিখেছি। সেই চর্চার অনেকটা এগিয়েও নিয়ে গিয়েছি। কিন্তু যখন গুরু শ্রী শম্ভু ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে আসি আমার ভাবনার পরিবর্তন হয়। শম্ভুদার কাছে শিখতে শিখতে উপলব্ধি করেছিলাম যে শাস্ত্রীয়নৃত্যের একটা প্রাচীনতা আছে যেমন কিছু গণ্ডিও আছে। শাস্ত্রীয়নৃত্য কেবল দেবদেবীদের কথা বলে। কিন্তু শম্ভুদা আমাদের শিখিয়েছিলেন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষদের কথা বলতে। সাধারণ দর্শকদের কাছে নাচ নিয়ে পৌঁছে যেতে। গ্রাম বাংলার এক দর্শক সে কী আডাভু বা বর্ণম বুঝবে নাকি নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারবে? সে বরং রানার চলেছে তাই ঝুম ঝুম বুঝবে। সে বুঝবে অবাক পৃথিবী। সৃজনশীল নৃত্য সেই সুবিধা, সেই স্বাধীনতা আমাদের দিয়ে থাকে।”

কোনও এনজিওতে গিয়ে নাচ শেখাবো কেন কেবল? কেন এমন সমাজ আমরা তৈরি করবো না যেখানে ওই মানুষগুলো আমার বাড়ি এসে নাচ শিখতে পারে? কেন সবার রঙে রং মিলাতে তাদের অসুবিধা হবে? নাচ তো সকলের জন্য। – কোহিনুর সেন বরাট

কোহিনুর সেন বরাট যখন বুঝিয়ে দেন তখন সত্যিই এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকে না। শাস্ত্রীয়নৃত্য উপলব্ধির অনেক অন্তরায়ের মধ্যে একটি তার ভাষা। গ্রাম বাংলার একজন মানুষ নিজের ভাষায় নাচ দেখতে যত ভালোবাসবেন, তামিলে বা মালয়ালমে সেই আনন্দ হয়তো পাওয়া তার পক্ষে কঠিন হবে। কোহিনুরদার এই সব নৃত্যদর্শন তৈরি হয়েছে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করে তাঁর এই যাত্রাপথের কথা। কোহিনুরদা বলেন, “সেটা অনেক ছোটোবেলায়। আমরা শিয়ালদহে থাকতাম তখন। কলেজ স্কোয়ারে সাঁতার শিখতে যেতাম আর তার সঙ্গে সদস্য ছিলাম চিলড্রেন্স হাডুডু ক্লাবের। তার একটা উইং ছিল মেয়েদের আর তাতে মৃদুলাদি বলে একজন শিক্ষিকা একবার আমাদের প্রস্তাব দিলেন কালমৃগয়া হবে সেখানে সৈন্যদলের জন্য ছেলেদের লাগবে। আমি নাম দিলাম এবং লক্ষ্য করা গেল ওরা যেটাই শেখাচ্ছেন আমি সুন্দর করে তুলে নিচ্ছি। আমাদের সেন বরাট বাড়ি ছিল প্রোগ্রেসিভ। ছেলেদের নাচ শেখাতে কোনও আপত্তি ছিল না কিন্তু তারপরেও আমার নাচ শেখা হয়নি। আয়নার সামনে নাচতাম আবার কেউ এলে লজ্জায় বন্ধ করে দিতাম। আমার ঠিকঠাক শেখা শুরু হল ক্যালকাটা কোয়্যারে শম্ভু ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে।”

কল্যাণ সেন বরাট

এই ক্যালকাটা কোয়্যার (Calcutta Choir)-এর কথা আমাদের জানা। বাঙালি সংস্কৃতিতে এই সংস্থার অবশ্যই একটি বড়ো অবদান রয়েছে। কোহিনুরদার দাদা শ্রী কল্যাণ সেন বরাট একজন দিকপাল শিল্পী। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীদের সুযোগ্য ছাত্র তিনি। ক্যালকাটা কোয়্যারের প্রভাব বাংলার এক সময়কার গণজাগরণের প্রসঙ্গে অপরিসীম। কত শত শিল্পী যে সেখান থেকে তৈরি হয়েছেন তার হিসেব নেই। কোহিনুরদার জীবনে ক্যালকাটা কোয়্যারের প্রভাব কী জানতে ইচ্ছে করে। এ-ব্যাপারে অবশ্য কোহিনুরদাকে স্মৃতি হাতড়াতে হয় না। সেসব দিনের কথা যেন তাঁর মনে সদা জ্বাজল্যমান। তিনি বলেন, “দাদা কলকাতার বাইরে ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াতে চাকরি করতেন। তারপর এখানে ফিরে ক্যালকাটা কোয়্যারের স্থাপন করেন। আমাদের বাড়ি কিন্তু গানের বাড়ি। বাবা খুব ভালো গাইতেন। আমারও তালিম ছিল। রেডিওতে গিয়েছিল এক সময় নিয়মিত। কিন্তু কোয়্যারে কী হত নাচের জন্য ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন হত। আমাদের শিয়ালদহ বাড়ির উঠোনেই রিহার্সাল হত। জগদ্ধাত্রী পুজোতে নামী শিল্পীরা আসতেন। হৈমন্তীদি (শুক্লা), আরতিদি (মুখার্জি)- এঁরা ছিলেন নিয়মিত। আর সলিলদা-সবিতাদি তো ছিলেনই। কিন্তু আমার দাদা ছাড়া তখন কোয়্যারে আমরা কেউ রোজগার করি না। তাই বাইরে থেকে নৃত্যশিল্পী আনার চেয়ে শম্ভুদাই আমাদের তৈরি করে দিতেন। দাদার জন্য অন্তত আমার অনেক সুবিধে হয়েছে নাচের জগতে। আবার এমনও হয়েছে আমার নৃত্যদল শিঞ্জন কোনও কোনও অনুষ্ঠানে সুযোগই পায়নি যেহেতু দাদার সঙ্গে তাদের সদ্ভাব ছিল না। তবে আজ আর সেগুলো আমি ধরি না। এখনও সেই পাঁচ বছর বয়সে শুরু করে আজ পঞ্চাশ পেরিয়ে গিয়েছি- কিন্তু নাচের সঙ্গেই সম্পৃক্ত হয়ে রয়েছি। আমি যখন থাকব না আমার ছাত্রছাত্রীরাই এই ধারা এগিয়ে নিয়ে যাবে।”

ছাত্রছাত্রীদের দিক থেকে কোহিনুরদা একজন সৌভাগ্যবান মানুষ। ওঁর কোনও অনুষ্ঠান হলে দেখা যায় সমস্ত মঞ্চ জুড়ে ছেলেরা সব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ছেলেদের নাচ শিখতে পারার যেসব সামাজিক অন্তরায় কোহিনুর সেন বরাট ও তাঁর ছাত্ররা যেন কোন ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। ছাত্র ও ছাত্রী সকলের কাছে তিনি শ্রদ্ধার ‘কাকামণি’। তাঁর স্নেহের স্রোতে ডিঙা ভাসিয়ে কত ছেলেমেয়ে পার হয়েছে। এমনকি তথাকথিত বহু নারীসুলভ পুরুষও কোহিনুরদার হাতে হয়ে উঠেছে প্রতিভাধর নৃত্যশিল্পী। সমাজ যাদের দূরে সরানোর চেষ্টা করেছে, কোহিনুরদা তাদেরকেই কাছে টেনে নিয়েছেন। পিতৃস্নেহের আশ্রয় হয়ে উঠেছেন তিনি। সংখ্যালঘু যৌনতার মানুষদের বিষয়ে তিনি এক সামাজিক বিপ্লব করে চলেছেন আজ বহু বছর। কোহিনুরদা ভাবিত হয়ে পড়েন। সময় নেন। বলেন, “আপনি যাঁদের কথা বলছেন শুধু তাঁদের জন্য নয়, অনেক যৌনকর্মীদের সঙ্গেও কাজ করে থাকি। কিন্তু কী জানেন আমি সেগ্রেগেশন অপছন্দ করি। কোনও এনজিওতে গিয়ে নাচ শেখাবো কেন কেবল? কেন এমন সমাজ আমরা তৈরি করবো না যেখানে ওই মানুষগুলো আমার বাড়ি এসে নাচ শিখতে পারে? কেন সবার রঙে রং মিলাতে তাদের অসুবিধা হবে? নাচ তো সকলের জন্য। কেউ মেয়েলি বলে, কেউ যৌনব্যবসা করেন বলে নাচ শিখতে পারবেন না তা হতে দেওয়া চলে না। তবে একটা কথা, সব কর্ম সবরকম লিঙ্গ-যৌনতার ওপরে আরেকটা পরিচয় থাকে যা একান্তই শিল্পীর। আপনার ব্যক্তিগত জীবন যা-ই হোক না কেন মঞ্চে কিন্তু আপনি নৃত্যনাট্যের চরিত্রটি। যেমন থিয়েটারে, সিনেমায় হয়। শিল্পের সে জায়গাটা বুঝতে হবে।”

সব কর্ম সবরকম লিঙ্গ-যৌনতার ওপরে আরেকটা পরিচয় থাকে যা একান্তই শিল্পীর। আপনার ব্যক্তিগত জীবন যা-ই হোক না কেন মঞ্চে কিন্তু আপনি নৃত্যনাট্যের চরিত্রটি। শিল্পের সে জায়গাটা বুঝতে হবে। – কোহিনুর সেন বরাট

কোহিনুর সেন বরাটের প্রিয় ছাত্ররা

কী অপূর্ব লাগে কথাগুলো শুনলে! কোহিনুরদার মতো মানুষেরা চুপিসারে সমাজে সাম্য আনার বিরাট কাজে কেমন লিপ্ত। সবার জন্য নাচ ভাবনাটার মধ্যে যেন গণতন্ত্রের ইশারা আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে নিয়ে কোহিনুরদার ভাবনা কী? আমার এ জিজ্ঞাসার উত্তর যেন ওঁর তৈরিই ছিল। তিনি যেন ক্রমাগত এগুলো ভেবে চলেছেন। তিনি বললেন, “নতুন প্রজন্ম খুবই ট্যালেন্টেড কিন্তু পারিপার্শ্বিক আবহ তাদের ধৈর্যহীন করে দিচ্ছে। যেমন এই যে চ্যানেলে চ্যানেলে নাচের অনুষ্ঠান সেটা যেমন টিআরপি-নির্ভর তেমন আজকালকার নাচও তাই হয়ে পড়ছে। একটা ফিফটিন-মিনিটস ফেমের দিকে সবাই ছুটছে। সেটা যে গ্রামাঞ্চল বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোর মধ্যে কাজ করছে তা নয়, শহুরে মানুষরাও তাদের সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন অডিশনে ভিড় জমাচ্ছেন। কিন্তু তারা সফল হলেও সেই সাফল্য বজায় থাকছে তিন-চার বছর। একটা বিরাট সময় ধরতে হলে তাদের গুরুর কাছে তালিম নেওয়াটা জরুরি। নাচ একটা শিল্প। তাকে সময় দিতে হবে। এর বাইরে বলতে গেলে আজকের প্রজন্মের পরিশ্রম করার ক্ষমতা অনেক বেশি’।”

কথায় কথায় রাত হয়ে যায়। বাংলার সৃজনশীল নৃত্যশিল্প ও তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে-মানুষটার সব চেয়ে সম্যক ধারণা এ-মুহূর্তে, তাঁর পায়ের কাছে আরও অনেকটা সময় বসে থাকতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সময় যে কম! গুরু শ্রী কোহিনুর সেন বরাটের কথা বাড়ি ফিরে লিখতে হবে। কে বলতে পারে এইসব কথাই কোনও একটি ছেলে বা মেয়েকে নাচে টিকে থাকতে উদ্বুদ্ধ করবে। কলেজ স্কোয়্যারের সুইমিং আর হাডুডু ক্লাবে খেলতে খেলতে সেও হয়তো একদিন নাচের মুদ্রায় করবে মনোনিবেশ।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by