পাখি দেখার নেশায় কামদুনির খড়িবাড়িতে পৌঁছে গেলেন প্রদ্যুত চৌধুরী
পাখির নেশা ও নতুন নতুন প্রজাতির পাখির ছবি তোলা যখন মনকে ভীষণ নাড়া দিচ্ছিল তখনই নজরে এলো এক সাদা-কালো রঙের পাখি, যার বাঁকানো ঠোঁট, কী অপূর্ব দেখতে। নাম Pied avocet। এই পরিযায়ী পাখিরা তাদের সুদূর যাত্রা পথেই কেবল কিছুদিনের জন্য জলাভূমিতে আসে। প্রায় হাজারে হাজারে একসঙ্গে ভ্রমণ ও বিচরণ করতে ভালোবাসে। খড়িবাড়ি এদের প্রিয় জায়গা। ইকো পার্ক, রাজারহাট ছাড়িয়ে চিনার পার্ক-এর ডানদিকে এই রাস্তা চলে গেছে কামদুনির দিকে।
Black-tailed godwit
সালটা ২০১৪। এক সকালে আমরা তিনজন বন্ধু মিলে পৌঁছোলাম সেখানে। কামদুনির পুলিশ স্টেশনের বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে এগোলেই শুরু হয়ে গেছে খড়িবাড়ির এই বিশাল জলাভূমি। মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে। বাঁদিকের জলাভূমি এতই বড়, যে তার শেষ অংশ চোখে দেখা যাচ্ছিল না। আমরা গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছোলাম বাঁদিকের খামার বাড়িতে। দুপাশেই জলাভূমি। জলাভূমিতে দেখছিলাম নানা প্রজাতির পাখির তৎপরতা। একটা বড় আলের উপর দিয়ে আমরা জলাভূমির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। বেশ কিছুদূর গিয়েই দেখলাম বড় আলের রাস্তাটাও জলের ভিতর চলে গেছে। একবুক কাদাজলে কেবল ঘাসগুলো উঁচু হয়ে আছে। বেশ কিছুদূরে দেখলাম ১৫-১৬ টা এশিয়ান Asian Openbill খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত। রয়েছে Great egret ও Grey heron। রাস্তার উপরে দুদিকের সারি সারি গাছগুলোতে দেখছিলাম বাংলার রংবাহারি পাখিদের। বউ-কথা-কও (Black-hooded oriole), Blue-throated barbet, Eurasian Collared Dove, Common hoopoe, Chestnut-tailed Starling; অনেক সংখ্যায় Citrine Wagtail, White Wagtail ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিদিকে আর ঝাঁকে ঝাঁকে Barn Swallow। চারধারে White throated কিং ফিশারের তৎপরতা।
Common shelduck Grey heron Asian openbill
Great Egret
এত সুন্দর পরিবেশ, তার উপর সমস্ত কোলাহল থেকে দূরে পাখিদের জন্য এ যেন এক স্বর্গরাজ্য। খামারে মাত্র দু-একজন লোক কাজে ব্যস্ত। তাছাড়া এই রাস্তা এখনও গাড়ি যাতায়াতের জন্য খোলা হয়নি। আমরা অনেক কসরত করে গাড়িকে বের করে নিয়ে গেলাম গ্রামের দিকে। এতগুলো জলাভূমির মধ্যে Pied avocet-এর দেখা পেলাম না, যার জন্য যাওয়া। হয়ত বা আমরা দিক হারিয়েছি।
Pradyut Choudhury at Khoribari
শুকনো ও কাদাজমিতে দেখা পেলাম নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির। আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে Common sandpiper, Common Redshank, Common greenshank এবং Little Ringed Plover। সর্বোপরি খড়িবাড়ির এই প্রাকৃতিক দৃশ্য আমার মনে এক অপরূপ ছবি এঁকে দিল। এরপর চার বছরের ব্যবধানে অনেকবার এসেছি খড়িবাড়িতে। দু-একবার সম্পূর্ণ একা। পাখির সঙ্গে চলতে চলতে নিজেকেও খুঁজে বেরিয়েছি এই রাঙামাটির রাস্তায়। কয়েকবার সঙ্গী হিসাবে পেয়েছিলাম পক্ষী প্রেমিক টপু বর্মণ-কে, কামদুনির কাছাকাছি থাকার সুবাদে খড়িবাড়ির আনাচ কানাচ ছিল তার চেনা। নিজে ছবি না তুললেও আমার ছায়া সঙ্গী হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। একবার গ্রামের রাস্তায় দেখা পেলাম বাবুই পাখির। পাশেই তালগাছে বাসা বুনতে ব্যস্ত। সত্যি একটা একটা তালপাতার শিস নিয়ে কীভাবে বাসাগুলি তৈরি করছে চোখে না দেখলে তা বোঝা মুশকিল। অন্য আরেকদিন সকালে Pied avocet-এর ছবি তোলার জন্য পৌঁছে গেলাম খড়ি বাড়ি। দেখছিলাম বড় বড় দল বেঁধে এরাও উড়ে যাচ্ছে একবিল থেকে অন্যবিলে। খড়ি বাড়ির বিলগুলোতে এখন মাছ চাষের জন্য সংস্কার চলছে। কোনোটা শুকনো কোনোটাতে জল, আলের উপরে কাদা ও শুকনো মাটির ঢিবি তার উপর দিয়ে এগোনো একটা কঠিন কাজ। দেখা পেলাম Pied avocetগুলো অনেক দূরের বড় বিলের একপ্রান্তে হাজার খানেক বসে আছে।
আরও পড়ুন
কলকাতার নতুন অতিথি ‘বর্ণালি’ পাখি
Pied avocet
আমরা ধীরে ধীরে ওইদিকে এগিয়ে গেলাম, মাথার উপর সূর্যের তাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিলের মাটিগুলো খরতাপে ফেটে চৌচির। অবশেষে অনেক কষ্টে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে আমরা ছবি তুলে নিলাম। পরে বিল থেকে উঠে আসতেই প্রায় অসুস্থ হবার মতো অবস্থা। কয়েকজন বন্ধু লম্বা হয়ে শুয়ে রইল। খানিক বাদে অন্য একটা বিল থেকে জল নিয়ে মাথায় দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলাম বিল থেকে। এটা একটা মনে রাখার মতো ঘটনা আমার কাছে। বিচিত্র প্রজাতির পাখির আনাগোনার জন্য খড়িবাড়ি আমাদের কাছে খুবই প্রিয়। ১৩/৩/২০১৬-তে আবার খড়িবাড়ি, সবদিক ঘুরে Pied avocet-এর দেখা পাই না।
Common greenshank
এমন সময় নজরে এলো মাঝের বড় বিলের খানিকটা দূরে কিছু নতুন পাখি। ছবি তুলে দেখি দুখানা Shelduck আর Grey heron Asian open bill। আমরা পক্ষী বিশেষজ্ঞ মিঃ শুভঙ্কর পাত্রর সঙ্গে কথা বললাম। উনি জানালেন এই পাখি এই প্রথম খড়িবাড়িতে দেখা গেল। এরা সাধারণত ইউরোপের পাখি। সচরাচর cost line-এ বসবাস করে, এটা আমাদের কাছে একটা Prize catch। বিলের একপ্রান্তে দেখা পেলাম ৪০-৫০-এর মতো Oriental Pratincole, এখন খড়িবাড়ির ল্যান্ডস্কেপ পুরোটাই পাল্টে গেছে। বড় বড় বিলগুলো শুকনো করা হয়েছে। মাছ চাষের জন্য তাই জলাভূমির মুখেই চাষের জমিগুলোতে চড়ে বেড়াতে দেখলাম Lesser Whistling-duck, Black-headed Ibis, black-winged Stilt, Red-wattled Lapwing, Black-tailed Godwit আরও নানা পাখি। কারণ ভিতরের বিলগুলোতে সারি করে দড়ি লাগানো হয়েছে, তাতে কাপড়ের টুকরো ঝোলানো, পাখিদের ওদিকে বিচরণ না করার জন্য। তাই স্বল্প দিনের জন্য হলেও আসা যাওয়ার পথে বিশ্রামাগারের মতো কিছু কিছু পাখির ঠিকানা এই খড়িবাড়ি। পাখির সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে এখানকার পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে বোঝা যায় আর বেশিদিন নয়! খড়িবাড়ি হয়ত মুছে যাবে পাখিদের মানচিত্র থেকে।
Greater painted-snipe