
কারনান তপশিলি সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই তিনি মনে করতেন উচ্চবর্গীয়রা তাঁকে হেনস্থা করছে
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পি এস কারনানকে রাজ্য পুলিশ কোয়েম্বাত্তুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে গত ২০ জুন। তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন পিজি হাসপাতালে আছেন। সুপ্রিম কোর্টের আট সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
বিচারপতি হিসেবে কারনান অনেক ইতিহাস রচনা করেছেন। মাদ্রাজ হাইকোর্ট থেকে কলকাতায় বদলি হওয়ায় তিনি নিজেই নিজের বদলির আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। তারপর বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে সরাসরি তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লেখেন। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এমন নজির নেই।
এই বিষয়টি বিবেচনার জন্যই সুপ্রিম কোর্টকে আট সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করতে হয়। ডিভিশন বেঞ্চও বিচারপতি কারনানের অস্বাভাবিক আচরণের জন্যই তাঁকে ছয় মাস কারাদণ্ড দেন। রাজ্য পুলিশের ডিজি নিজে তাঁর বাসভবনে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সেই ফরমান পৌঁছে দেন। সেই নির্দেশ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে কারনান নিজের বাড়িতেই আদালত বসিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আটজন বিচারপতিকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক। ইতিমধ্যে খবর রটে যায় যে তিনি শ্রীলঙ্কায় পালিয়ে গেছেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাজ্য পুলিশ তাঁকে কোয়েম্বাটুর থেকে ধরে আনে।
কারনান মাদ্রাজ হাইকোর্টে ছিলেন ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে কোনও বিচারপতির সদ্ভাব ছিল না। তিনি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সঞ্জয় কৃষ্ণ কউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ মামলা দেওয়া হচ্ছে না।
তাঁর আচরণে এই কথা বারেবারে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের অধীন বিচারপতি নিয়োগের কলোজিয়ম সেই কথা মানতে নারাজ। কারণ তাহলে তাঁদের অসতর্ক নিয়োগই প্রমাণিত হতে পারে।
কারনান তপশিলি সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই তিনি মনে করতেন উচ্চবর্গীয়রা তাঁকে হেনস্থা করছে। কিন্তু মাদ্রাজ হাইকোর্টে থাকাকালীন যে দুজন বিচারপতির সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে রেষারেষি ছিল – ডি ধমপালান এবং এল মণিকুমার – তাঁরা দুজনেই ছিলেন তপশিলি সম্প্রদায়ভুক্ত।
বিচারপতি কারনানের আচরণের ফলে কলকাতা হাইকোর্টের সম্মান অবশ্যই কিছুটা ক্ষুণ্ণ হল। তবে এই হাইকোর্টের কোনও বিচারপতির হাজতে যাবার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিচারপতি অমিত সেনগুপ্ত অবসর নেন ১৯৯৪ সালে। বিদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করার অপরাধে দুবছর পর ১৯৯৬ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন।
তবে কারনানের সঙ্গে সেনগুপ্তর গ্রেপ্তার হওয়ার তফাৎ আছে। কারনান সুপ্রিম কোর্টকেই পদাঘাত করেছেন। সেনগুপ্ত আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছিলেন। কারনানের নামে এখনও অর্থ আত্মস্যাৎ-এর কোনও অভিযোগ নেই। তাঁর আচরণ এ-কথা প্রমাণ করে যে তিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতকে অসম্মান করার কাজটা সুপ্রিম কোর্ট সহ্য করতে পারেনি।
কিন্তু বিচারপতিদের অনেক অনৈতিক আচরণের ক্ষেত্রেই যে সুপ্রিম কোর্ট যথেষ্ট উদার তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌমিত্র সেন একটি সংস্থার রিসিভার হিসেবে অনেক টাকা হাতিয়েছেন এমন কথা কলকাতা হাইকোর্ট মেনে নিয়েছিল ২০০৬ সালে। কিন্তু বিচারপতি সেন ২০১১ সাল পর্যন্ত বিচারপতি পদে থেকে যান। সংসদে তাঁর নামে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আসে তখন তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু সৌমিত্র সেনের কোনও হাজতবাস হয়নি।
সৌমিত্র সেনের সঙ্গে একযাত্রায় ইমপিচ করা হয়েছিল কর্নাটক হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দিনাকরণকে। তিনিও পদত্যাগ করে রেহাই পেয়েছেন। এই তালিকা যত বাড়ানো যাবে ততই প্রমাণিত হবে যে বিচারপতিদের অপরাধ অনুযায়ী সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টও যথেষ্ট সুবিচারের পরিচয় দেয়নি।
