রবি কিচুলু আমায় বলেছিলেনঃ ‘আই উইল বি ডুইং আ সার্ভিস টু ইন্ডিয়ান মিউজিক।”

১৯৯১ সালেই শুভেন্দু মাইতি একদিন অন্য একটি কাজে ‘গ্রামাফোন কোম্পানি’তে গিয়ে সেখানকার এক কর্মকর্তাকে আমার কথা বলেন। শুভেন্দুদার অনুরোধে আমি আমার কিছু গান ঘরে রেকর্ড করে দিয়ে এলাম সেই কর্মকর্তাকে। তাঁর নাম সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়।

‘এইচ এম ভি’র ‘প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন’এর প্রধান রবি কিচ্‌লু যখন আমায় সাদরে আপ্যায়ন করে জানালেন যে তিনি আমার গান রেকর্ড করতে চান, আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আমার এই সব গান এত বড় একটা সংস্থা সত্যিসত্যিই রেকর্ড করবে, এটা আমি ভাবতেও পারিনি। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- কেন রেকর্ড করতে চান তিনি আমার গান। রবি কিচুলু আমায় বলেছিলেনঃ ‘আই উইল বি ডুইং আ সার্ভিস টু ইন্ডিয়ান মিউজিক।” কথাটি আমি জীবনেও ভুলব না।

জ্ঞান হবার পর থেকে আমি তো সংগীতের, গানের, বাংলা গানের গোলাম, সেবক। জীবনে যদি একটি জায়গাতেও বিশ্বস্ত থেকে থাকি তো সংগীতেই, গানেই। বাঙালি হিসেবে আমার গর্ব একটিমাত্র জায়গায়ঃ আধুনিক বাংলা গানের সুরে-তালে-ছন্দে- আঙ্গিকে আধুনিক বাঙালি যে ঔদার্য, যে নেওয়ার ও দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছে সারা বিশ্বে তা তুলনাহীন। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আধুনিক বাঙালি তার আধুনিক গানে অন্তত শুচিবায়ুর পরিচয় দেয়নি, ধ্বজা তোলেনি কোনও অন্তঃসারশূন্য জাতীয়তাবাদের। আধুনিক বাংলা গানের দেহে সারা বিশ্বের সংগীত এসে মিশে গিয়েছে।রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনঃ ‘যে মন গ্রহণ করিতে জানে না সে মন দান করিতেও জানে না।’- দেশ-বিদেশ থেকে প্রাণভরে গ্রহণ করেছে আধুনিক বাংলা গান।  রবীন্দ্রনাথেরই একটি গানের কথা একটু অদলবদল করে আধুনিক বাংলা গান দাবি করতে পারেঃ ‘নিয়েছি যত দিয়েছি তার বেশি।’

আমার হয়ে ওঠার শুরু তো আধুনিক বাংলা গানেই। জন্মের পর থেকে বাবা মায়ের মুখে যেমন বাংলা ভাষা শুনেছি, তেমনি শুনেছি বাংলার আধুনিক গান। রবীন্দ্রনাথের গান, হিমাংশু দত্তর গান, নজরুলের গান, মুখে বোল ফোটার সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে উঠেছি আধুনিক গান আপন মনে।

এই গানের উদার গতিপ্রকৃতি, কথা, ভাব, সুরতালছন্দের বিভিন্ন উপাদান নিজের অঙ্গীভূত করে নেওয়ার স্বভাব আমাকে ঠেলে দিয়েছে অন্যান্য সংগীতের দিকে। এই গানেরই দেহ থেকে হাতছানি দিয়েছে কখনও কীর্তন, কখনও বাউল, কখনও ভাওয়াইয়া, কখনও রাগের আদল, কখনও বিলিতি সুর। গান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-মানুষের মধ্যে অবিরাম মিশেল চলছে। বনমানুষের মধ্যে মিশেল নেই।

আমার গর্ব এখানেই যে আধুনিক বাংলা গান বনমানুষের বিশুদ্ধ অবিমিশ্রতাকে পাত্তা দেয়নি। আধুনিক জীবনের মিশ্র চরিত্র অনুসারে এ গানের সুরতালছন্দ, আঙ্গিক অবধারিতভাবেই মিশ্র।

এই পাঁচমিশালির মধ্যেই আমার হয়ে ওঠা। আর, আমার হয়ে ওঠা থেকেই আমার গানের হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলবে ততদিন।

গান আমি বাঁধি, না-বেঁধে পারি না বলে। চেষ্টা করি, আমার কথাগুলো, ভাবনাগুলোকে গানের দেহে, কথায় সুরে তালে ধরতে। প্রতিটি গানই একটি চেষ্টা। কখনও হয়তো সে-চেষ্টা পাঁচজনের ভালো লাগে, কখনও হয়তো লাগে না।

আমার গান অনেক মানুষ শুনবেন, এ আমি ভাবিনি। তবু শোনাতে চেয়েছি মানুষকে-সংগীত আর মানুষের ওপর ভরসা রাখি বলে। আগেও মনে করতাম, এখন মনে করি যে আমার কোনও গানের একটি অংশও যদি কোনও মানুষকে এক মুহূর্তের জন্যেও স্পর্শ করতে পারে তো আমার মানবজন্ম সার্থক। এই বিশ্বাস এবং গান বেঁধে-গেয়ে-বাজিয়ে করে খাওয়ার, বেঁচে থাকার ইচ্ছে নিয়ে পেশাদার সংগীত-পরিবেশক হয়েছি। অনেক ভেবেচিন্তে আমার মনে হয়েছিল যে কোনও কিছুই উৎপাদন করতে না জানা এই আমি অন্তত একটি কাজ সেই কাজটির প্রতি সৎ থেকে অর্জিত শিক্ষার জোরে, নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রমের মাধ্যমে আমার দক্ষতা ক্রমাগত বাড়িয়ে করে যেতে পারব।

গান বেঁধে-গেয়ে-বাজিয়ে করে খাওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা গেল গড়িয়ে।

ছেলেবেলা থেকে যাঁদের গান শুনে শুনে বড় হয়েছি আজ তাঁদের অনেকেই নেই। তাঁদের গানগুলো, গাওয়ার ধরনগুলো এখনও কানে লেগে আছে যে! গান গাইতে উঠে সুর লাগিয়েই বুঝতে পারি তাঁদের মতো হয়ে উঠতে পারলাম না আজও। জীবনে একবার যদি পারতাম।

(কবীর সুমনের ‘হয়ে ওঠা গান’ বই থেকে নেওয়া নির্বাচিত অংশ)

Developed by DXDasia