
ট্রামের শব্দ, মোটর, ট্রাক, ট্রেনের শব্দ এসব শুনেও আপনারা আরও শব্দের জন্য পত্রিকা ছাপেন?
জীবন মণিকোঠার দেবতাটিকে পূজা দেবার জন্য সব কিছু চেতনা নিবেদন করতেই হবে। তা-ও বাকি থাকবে। দেখেছি কালো মেঘের বুকে বজ্রবিদ্যুতের খেলা কি অদ্ভুত! তারপর বর্ষণের পালায় পেখমধারী ময়ূরের নৃত্য, সঙ্গহীন বেদনার আর্ত আহ্বানে মুখরিত ঐকতানে মেঘমল্লার।
ছেলেবেলায় দূরদেশে বিদ্যাশিক্ষার আশায় গেছলেম। মা’র মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি ছুটে এলাম। মৃত্যুর কথাটা বুঝতে একটু দেরি হল। আমি যেন কথা বলতেই জানি না। প্রলাপ বকারও কোনও উৎসাহ নেই। কেবল একটি উচ্চারণমাত্র ‘মা’- ব্যস, এ ছাড়া আর কোনও কথা নেই। গভীর বেদনার বোবা প্রকাশমাত্র।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখেছিলেম তিনি তাঁর জীবনের অর্ধাংশেরও বেশি সময়টি বাণী-সুর-শব্দ নিয়ে রচনার কাজ করেছিলেন অজস্রধারে। আধারটি উপচে উঠেছিল। পরে দেখি, অপরূপ রং-রেখার প্রাচুর্য নিয়ে টানা দশ বছর কাটিয়েছেন নির্বাক মগ্নতায়।
গতি আর ঘর্ষণের মধ্যে বৈরীভাব আছে। গতি যত তেজবান, ততই কর্কশ। এর মধ্যে যেখানে সুসম্বন্ধ, সেখানেই সংগীতের উদ্ভব। স্বরস্রষ্টা ছ’টি স্বরে শব্দের বিশ্লেষণ সমাপ্ত করেছেন। স্বরশিল্পীর ভাগ-বিশ্লেষণ অতি প্রাচীন। ছ’টি স্বরের বিজ্ঞান দিয়ে আমাদের সব কিছু আবেগ-অনুরাগ-অনুভূতির প্রকাশ হয়ে চলেছে।
আমি যা দেখেছি, যেমন শিবলিঙ্গ, মহেঞ্জোদারো-হরপ্পা থেকে পাওয়া মূর্তিশিল্পে আমরা স্পষ্টভাবে যা পাই তার ওপর আর পাচ্ছি না- চোখই তার একমাত্র উপায়। প্রকৃতিতে আমরা দুটি আকৃতি পাই, পুরুষ আর নারী। তৃতীয় হচ্ছে তার প্রজেনি-বাচ্চা। এই থিমটা এক অদ্ভুত সুন্দর। এর ওপর কত আনন্দ, কত সৌন্দর্যের খেলা চলেছে।
এটিকে একটা ফর্মের ভেতর প্রকাশ করার চেষ্টা। তার নাম সিম্বল-সেটাই বলার চেষ্টা করছি। গতির সঙ্গে ঘর্ষণ শুরু। তার থেকেই শব্দ। ঘর্ষণের তারতম্য অনুসারে কোনওটা কর্কশ, কোনওটা মধুর। সুরস্রষ্টা তা-ই নিয়ে অদ্ভুত সুর রচনা করেন, ধরে রাখার চেষ্টা করেন। দেখি সর্বত্রই সেই খেলা। এটাই সিম্বল বলে প্রচার। সংগীতেও কি এইরকমের সিম্বল আছে? সে কথাটা সংগীতস্রষ্টারা বলতে পারবেন।
আজকাল খালি কথার প্রচার এবং প্রচার। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কানেও ঢুকছে না। কারণ গোলমাল আর গোলমাল। কান ঝালাপালা। মেশিনের গোলমাল এ যুগের একটি প্রধান গোলমাল। আর কী চাই। এতই যদি মেশিনের যুগ, এবার ‘সাইলেন্সার’-এর যুগ কবে আসবে তারই আশায় রইলাম।
রূপকারের কাছে শব্দের অর্থ অতি ক্ষীণ। রবীন্দ্রনাথ যখন রূপ নিয়ে কাজ করেছিলেন, তখন দেখেছি, তিনি নিস্তব্ধ থাকরেন। অথচ শব্দ নিয়ে তিনি প্রায় সারা জীবন কাটিয়েছেন। কথোপকথনের শিল্প, সংগীতের শিল্প- এ দু’টিই শাব্দিক। রূপশিল্পের বেলায় একেবারে চুপচাপ। কেবল ধ্যান। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘ধ্যানের ধনখানি, পাইবে আপন বাণী।’ এইখানে শব্দের ব্যবহার। শব্দযন্ত্র ব্যতীত প্রকাশটি অঙ্গহীন। হয় কণ্ঠস্বর, নয় অন্য কোন বাণী প্রকাশক যন্ত্রের প্রয়োজন।
মহাশয়, আমি চাক্ষিক, রূপকাকারমাত্র। শাব্দিক নই। যাই হোক, শব্দের মাঝে রূপ- ঝগড়া যখন বাধে তখনই শব্দের ঝনঝনানি। ট্রামের শব্দ, মোটর, ট্রাক, ট্রেনের শব্দ, কারখানার শব্দ, মানুষের কোলাহল- এসব শুনেও আপনারা আরও শব্দের জন্য পত্রিকা ছাপেন? আপনাদের ধৈর্যের কী বলিহারি।
