‘আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি’- ঋত্বিক ঘটক

আমি কোন সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না

আমি কোন সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না- যে একটি ছেলে একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, প্রথমে মিলতে পারছে না, তাই দুঃখ পাচ্ছে, পরে মিলে গেল বা একজন পটল তুলল-এমন বস্তাপচা সাজানো গল্প লিখে বা ছবি করে নির্বোধ দর্শকদের খুব হাসিয়ে বা কাঁদিয়ে ঐ গল্পের মধ্যে involve করিয়ে দিলাম, দু’মিনিটেই তারা ছবির কথা ভুলে গেল, খুব খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল- এর মধ্যে আমি নেই।

আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝব it is not an imaginary story, বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে hammer  করে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই thesis-টা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যই আমি আপনাকে alienate করব প্রতি মুহূর্তে।

যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বেরিয়ে এসে বাইরের সেই সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলানোর কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার protest-কে যদি আপনার মধ্যে চারিয়ে দিতে পারি, তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।…

চলচ্চিত্রশিল্পে আমি বলে নয়, যাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে serious শিল্পী এবং আমার বাংলাদেশেও যারা serious কাজ করেন, যাদের নাম-টাম আপনারা শুনেছেন-টুনেছেন, প্রত্যেকেই একজনের দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন সের্গেই আইজেনস্টাইন। আইজেনস্টাইন না-থাকলে আমরা কাজ-কম্মর ‘ক’ও শিখতাম না। উনি আমাদের বাবা। আমাদের পিতা। তাঁর লেখা, তাঁর thesis এবং তাঁর ছবি- এগুলো ছোটবেলায় আমাদেরকে পাগল করেছিল। এবং তখন ওগুলো আসত না। বহু কষ্টে লুকিয়ে-লুকিয়ে নিয়ে আসা হত। এই আইজেনস্টাইন… সত্যজিৎ রায়কেও আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন, he will admit, that he is the father of us. আর(তাঁর থেকেই) আমরা ছবি কাটতে শিখেছি… filmmaking-এ ওটা একটা ব্যাপার। তারপর পুদভকিন সাহেব। পুদভকিন এসেছিলেন ১৯৪৯ সালে। তখন আমার সৌভাগ্য হয়েছিল পার্টির তরফ থেকে… পার্টি আমাকে চাপিয়ে দিল যে পুদভকিন-এর একটু পিছনে-পিছনে ঘোরো। এই পুদভকিন একটা কথা আমাকে বলে দিয়েছিলেন সে দিন, সেটা আমার শিক্ষার basis. সেটা হচ্ছে যে film is not made. Filmmaking কথাটা বাজে কথা। Film is built. Brick to brick যে-রকম ভাবে একটা বাড়ি তৈরি হয়, film তেমনই shot by shot কেটে-কেটে তৈরি হয়। It is built, it’s not made. এই দু’জন ব্যক্তি, তারপর কার্ল ড্রেয়ার। কার্ল ড্রেয়ার-এর ছবি আমি অনেকে দিন আগে পুনায় দেখেছিলাম। ‘The Passion of Joan of Arc’ এই ছবি দেখে আমার মস্তিষ্ক খারাপ হয়ে গেছল। আর আমাকে গুরুজন বলে মানতে হলে একটু মানতে হয়ে বুনুয়েল সাহেবকে। লুইস বুনুয়েল। এঁরা ক’জন আমার সত্যিকারের গুরু, plus মিজোগুচি। এঁর ‘Ugetsu Monogatari’  দেখে আমি staggered… মানে….মাথা-ফাতা খারাপ হয়ে গেছল। একেই বলে ছবি! ছবি কী, এই ক’টা লোক থেকে আমি পেয়েছি।

( সন্দীপন ভট্টাচার্য-র সংকলন বিন্যাসে ‘ নিজের পায়ে নিজের পথে’ কথা-কোলাজ থেকে নির্বাচিত অংশ);

Written by
Developed by DXDasia