
আমার শেষ নাচের অনুষ্ঠান
পর্ব ৩২
বাতাসে বহিছে প্রেম/নয়নে লাগিল নেশা/কারা যে ডাকিছে পিছে/বসন্ত এসে গেছে…। দোল-হোলির ফাগ-উৎসব মরসুমে সমস্ত ভেঙে-পড়া, পিছিয়ে-থাকা, মলিনতা ভুলে আমরা নানা রঙে রঙিন হয়ে উঠতে চাই। বসন্ত আমাদের জাগ্রত দ্বারে। কিন্তু আমাদের ছোটোবেলার প্রকৃত বসন্ত ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। পঁচিশে বৈশাখ। সেই বিকেলে হয়তো খুব গরম। হালকা ঝড়বৃষ্টিও হয়ে গেল। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, বাচ্চাদের আবৃত্তি, নাটক আর শেষে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পাড়ার মেয়েদের দলগত নৃত্য। রিক্রিয়েশন ক্লাবের ক্যারম-ঘরকে গ্রিনরুম বানানো হত। মেয়েরা সব বেনারসি পরে, মাথায় কেউ রজনীগন্ধা, কেউ জুঁই লাগিয়ে উইঙের ধারে অপেক্ষা করতো। পরিবেশটাই একটা মধুমাখা গন্ধে ভরে উঠতো। তখন খুব ঋতুরঙ্গ-এর চল। নাচ মানেই ঋতুরঙ্গ। আর তা নয়তো কোনও নৃত্যনাট্যের অংশবিশেষ। মূল অনুষ্ঠানের আগে দু-তিন সপ্তাহ ক্লাবের চাতালে প্রতি সন্ধ্যাবেলা রিহার্সাল চলতো। আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষা তদ্দিনে শেষ। সে যেন একটা উৎসবের নেশা হাওয়ায় হাওয়ায় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো। সেটা আসলে ঠিক পাড়া ছিল না কোনও। ছিল একটা সরকারি আবাসন। আমরা বলতাম কোয়ার্টার্স।
নাচের অনুষ্ঠানে বৌদি সুচরিতা দে
কত বাঙালি মেয়ে যে কেবল সংসার করবে বলে নাচ ছেড়ে দিয়েছিল, তার কোনও ইতিহাস হয়তো একদিন লেখা হবে। সে ইতিহাস ব্যথার ইতিহাসই হবে।
স্বপ্নাদি হাউজিং এস্টেট রিক্রিয়েশন ক্লাব-এর যত অনুষ্ঠান হত সেগুলোতে গান আর নাচের ব্যাপারটা সে-সময় দেখত। এমন অনুষ্ঠানের রিহার্সাল দেখতে দেখতে, তখন আমার বছর চার-পাঁচেক বয়স হবে, আমারও মনে হল আমি নাচ করবো। স্বপ্নাদিকে বলা হল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই যে অনুষ্ঠান। কোথায়, কী করে নেবে আমায়? আর ছেলেরা আবার নাচ করে না কি? আমার দাদা সে সময়ের ক্লাব সেক্রেটারি। কী জানি তারও হয়তো জেদ চেপে গিয়েছিল যে তার ভাইকে অনুষ্ঠানে নাচ করতে দিতে হবে। ব্যস! ঠিক হলো আমি একক হলেও একটা নাচ করবই। শেখাবে কে? কেন, দাদার বউ! বৌদিকে কখনও বৌদি বলে ডাকিনি। বউ বলে ডাকতাম। বউ আমাকে খেলার ছলে নাচ তুলিয়ে দিল। ‘মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি’ গানে। আমার পোশাক ভাড়া করা হল। মোটা রজনীগন্ধার মালা কেনা হল। বউ সাজিয়ে দিল। সেই আমার প্রথম মঞ্চে ওঠা আর সেদিন থেকেই নাচের প্রতি প্রেম। আমি নাচের মধ্যে এলাম। বউ নিজের গুরু কৃষ্ণা নন্দীর কাছে আমায় নিয়ে গেল ভর্তি করাতে। কৃষ্ণা নন্দী গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র-এর একদম প্রথমদিককার ছাত্রী। তখন গুরুজি তেমন জনপ্রিয়ও ছিলেন না। যাই হোক, কৃষ্ণা নন্দীর কাছে গিয়ে টের পেলাম আমার বউ যার জন্য মঞ্চে ওঠার সুযোগ হল সে আসলে নাচের কতো ভালো ছাত্রী ছিল। কৃষ্ণা নন্দীর সে কী আনন্দ! বউ-এর নাম সুচরিতা কিন্তু সকলে ঝুমুর বলে ডাকে। কৃষ্ণা নন্দী সবাইকে দেখাচ্ছে, ‘এই যে বলতাম ঝুমুর, এই দ্যাখ তোরা সেই ছাত্রী আমার। কী ভালো নাচত ঝুমুর। কী করিস এখন?’ বউ মলিন মুখে বলে, ‘সংসার’।
কত বাঙালি মেয়ে যে কেবল সংসার করবে বলে নাচ ছেড়ে দিয়েছিল, তার কোনও ইতিহাস হয়তো একদিন লেখা হবে। সে নাচের ইতিহাস ব্যথার ইতিহাসই হবে। কিন্তু আজ বুঝি সেই বইয়ের একটা চ্যাপ্টারে হয়তো আমাদের পরিবারের কথাও থাকবে। আমার নৃত্যের প্রথম গুরু বউই। কৃষ্ণা নন্দীর কাছে বেশিদিন শেখা হয়নি আমার। শুধু একটা প্রোগ্রামের কথা ঝাপসা মনে আছে। রবীন্দ্র সদনে হয়েছিল। আমাদের ছোটোদের ময়ুর সাজানো হয়েছিল। এত বড়ো মেকআপ রুম আমি আগে কখনও দেখিনি। এত বড়ো স্টেজও নয়। বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। টিফিন দেওয়া হয়েছিল বেশ বড়ো একটা প্যাকেটে। কী আনন্দ! আমরা নেচেছিলাম ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে’ গানের ওপর। বাড়ির সবাই গিয়েছিল সেই অনুষ্ঠান দেখতে। শুধু বউ যেতে পারেনি। বউ-এর যে তখন বেবি হবে! এরপর দু-চার বছরের গ্যাপ। আরেকটু বড়ো হয়ে গিয়েছি। মেয়েরা যেমন বিয়ের পর তথাকথিত সংসারের জন্য নাচ শেখা বা চর্চা থেকে বিরত থাকতো তেমন ছেলেদের বেশি নাচ শিখতে দেওয়া হত না মেয়েলি হয়ে যাবার ভয়ে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কিন্তু বউ-এর উৎসাহে আর দিদিদের উদ্যোগে আমি আবার নাচ শুরু করলাম রূপরাধা পালের কাছে।
আজ থেকে পনেরো-ষোলো বছর আগে অনিন্দিতিদির অনুষ্ঠানেই আমি শেষবারের মতো নাচের মঞ্চে উঠি। তারপর আর কখনও নাচ করিনি। নাচ এখন আমার কাছে লেখা, দর্শন আর সংগঠন। আনন্দও বটে!
রূপরাধাদি ছিলেন গুরু প্রহ্লাদ দাসের ছাত্রী। দিদি শুধু নিজে যে নাচ খুব ভালো জানতেন তা নয় শেখাতেনও অপূর্ব। আজ কলকাতার যে বড়ো বড়ো গুরুরা আছেন তাঁদের সঙ্গে এক পংক্তিতে রূপরাধাদির নাম উচ্চারিত হতে পারতো। ওঁর যা ট্যালেন্ট ছিল তাতে ওই গ্রুপের অনেক নাম হতে পারত। কিন্তু কী কারণে তা হলো না তা হয়তো আন্দাজ করতে পারি, কিন্তু এখন আর গুরু নিন্দা করে লাভ নেই। জীবনে নাচের সঙ্গে যতটুকু সম্পৃক্ত হতে পেরেছি তার পুরোটাই রূপরাধাদির জন্য। নাচ চিনতে পেরেছি, নাচের প্রতি রুচি এসেছে, তালজ্ঞান তৈরি হয়েছে, নাচের থিওরি লেখা শিখেছি, যে-কোনও গানের ওপরই একটা নাচ তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীদের জীবনকাহিনি- সবটাই একমাত্র রূপরাধাদির জন্য জীবনে জানতে, শিখতে পেরেছি। কিন্তু সেটাও ওই ক্লাস ইলেভেন অবধি। তারপর আর যোগাযোগ থাকেনি দিদির সঙ্গে।
আমার বৌদি সুচরিতা দে (বাঁদিকে) এবং আমার নৃত্যগুরু অনিন্দিতা মুখার্জি (ডানদিকে)
এর অনেক বছর পর রূপরাধাদির স্কুলেই ওডিসি শেখাত যে অনিন্দিতাদি, তার কাছে নাচে ভর্তি হয়েছিলাম। আমি ছিলাম কথকের ছাত্র আর ভালোবেসে ফেললাম ওডিসিকে। গুরু গিরিধারী নায়েকের স্টার-ছাত্রী অনিন্দিতা মুখার্জি-র মতো ওডিসি শিক্ষক এখনও কলকাতাতে কম। ওডিসি নাচটা এত জ্যামিতিক যে তার গভীরতা বিরাট। কিন্তু অনিন্দিতাদি এমন শিক্ষক যে দুর্বল ছাত্রছাত্রীকেও ভালো নাচ তুলে নিতে সাহায্য করতো সব সময়। এখনও তাই করে। আমার প্রতি ছিল দিদির খুব স্নেহ। দিদি খুব হার্ডটাস্ক মাস্টার ছিল। কিন্তু আমাকে ছাড় দিত খুব। হয়তো সারা বছর ক্লাস করিনি। কিন্তু নাচের পরীক্ষার আগে অনিন্দিতিদি ঠিক ডেকে দশ-বারোটা ক্লাস করিয়ে তরী পার করে দিত। সেই স্রোতেই কত যে ডিস্টিংশন পেয়েছি ওডিসিতে তার ঠিকানা নেই। সিক্সথ ইয়ার ডিপ্লোমাতেও থিওরি, প্র্যাকটিক্যাল দুটোতেই আমার ডিস্টিংশন ছিল। আজ থেকে পনেরো-ষোলো বছর আগে অনিন্দিতিদির অনুষ্ঠানেই আমি শেষবারের মতো নাচের মঞ্চে উঠি। তারপর আর কখনও নাচ করিনি। নাচ এখন আমার কাছে লেখা, দর্শন আর সংগঠন। আনন্দও বটে! আর ঠিক একটি মাস বাদে, ২৯ এপ্রিল বিশ্ব নৃত্য দিবস। আমাদের ছোটো ছোটো জীবনগুলোর নাচের দিদিমণিদের তাই স্বল্পপরিসরে স্মরণ করে নিলাম।
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

