নব রাত্রির ডাণ্ডিয়া এখনে নব রসের রঙের খেলায় যুক্ত হল। সব মিলিয়ে বাংলার দর্শনে দোল কে আলাদা জায়গা করে দিলেন আরেক জন ঠাকুর

হোলি মানে হল ফাগুনের রং। এই মনের রঙ কে প্রকৃতির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। সূর্যোদয়ের ও সূর্যাস্তের গৈরিক রঙে থাকে বিরহের বেদনা। হলুদ ফুলের মধ্যে থাকে প্রখর চঞ্চলতা আর তেজ।অন্যদিকে সবুজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রাণের পরশ। আর নীল রঙ সার্বিক ভাবে স্বয়ং কৃষ্ণের। তিনি রাজার মত পোশাক পড়েন, আবার রাখাল বালকের মত গরু চড়ান। তাই এমন একজন মানুষ তথা দেবতা চেয়েছিলেন মানুষের জীবন বোধ থেকে হারিয়ে যাওয়া নবরসের ধারাকে রঙের খেলায় ফিরিয়ে আনতে। তাই তিনি এই রঙ খেলার প্রধান পুরুষ। তিনি বলেছিলেন যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যস্ততাকে আড়াল করতে অভ্যন্তরে রং ও রসের লীলা খেলার  উপস্থিতি প্রয়োজন। সমগ্র রাজস্থান ও উত্তর ভারতে এই রঙ খেলার প্রচলন। অন্যদিকে রুক্ষ দেশ রাজস্থানে প্রকৃতি যখন বর্ণ সম্পদ দিতে কৃপণ হয়েছেন, তখন ও দেশের মানুষ রঙ কে ফিরিয়ে এনেছেন তার হোলি খেলায়। এ বঙ্গে রং খেলার প্রচলন কে বলা হয় দোল। কারণ এই দোলের সঙ্গে ঝুলনের সম্পর্ক নয়, এই দোলের সাথে লেগে থাকে বসন্ত ঋতু আগমনের সম্পর্ক। এই সময় মন চঞ্চল হয়। শরীর আক্রান্ত হয় । তখন একদিকে চলে থানের মানত আর অন্যদিকে চলে এই জীর্ণ শরীরে নতুন রং দেওয়ার প্রলেপ আয়োজন। অলক্ষ্মী বিদায় করা হয়, বুড়ির ঘর পোড়ানো হয়। নেড়া-নেড়ির ঘর পোড়ে। নব-লক্ষ্মীর আগমনের রাস্তাকে রং দিয়ে ভরিয়ে তোলা হয়। মনকেও কলুষ মুক্ত করে রঙে রাঙানো হয়। মনে আবেগের আদান প্রদানের বাহন হয় রং। এই ধারনাকে স্বদেশী যুগে দাঁড়িয়ে পালটে দিলেন রবীন্দ্রনাথ, গুজরাতের ডাণ্ডিয়া নাচের ধরন ভঙ্গিকে নিয়ে এলেন দোল উৎসব এর অংশ করে। নব রাত্রির ডাণ্ডিয়া এখনে নব রসের রঙের খেলায় যুক্ত হল।

তিনি দু'একটা কথা বললেন-
“খোল দ্বার খোল লাগল যে দোল”
 “ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে”
তার পরে বলে দিলেন-“ আজ সবার রঙ্গে রঙ মেলাতে হবে”।

তখন সনাতন ভারতবর্ষের মানচিত্রে প্রতিটা মানুষ নিজ নিজ দেশের সত্ত্বার কথা বলছে, তাকে স্বদেশের সত্ত্বায় পরিণত করলেন রবীন্দ্রনাথ। রঙের ভিতর দিয়ে মানচিত্রের সীমা চেতনা ভেঙে গেল।

দুই হাতের তালের মন্দিরায় ও  ডাণ্ডিয়া নাচের লাঠিতে বেজে উঠল ঐক্যের সুর। কারণ রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন স্বদেশ চেতনায় ঐক্যই প্রধান।

আর বিবিধ রং মানে বিবিধের মাঝে মিলন মহান।

সব মিলিয়ে বাংলার দর্শনে দোলকে আলাদা জায়গা করে দিলেন আরেক জন ঠাকুর।

তার নাম রবীন্দ্রনাথ। 

Developed by DXDasia