জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির ইতিহাস

বৈকুণ্ঠপুর রাজের অধীনে ছিল এই আপাত-আড়ালে থাকা রাজবাড়ি

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানগুলির মধ্যে একটি হল জলপাইগুড়ি রাজবাড়ি। সম্প্রতি রাজ্য হেরিটেজ কমিশন সেখানে কাজ করার প্রস্তুতি নিয়েছে। হেরিটেজ কমিশন ঐতিহাসিক রাজবাড়ি সংস্কার করার জন্য জলপাইগুড়ি পুরসভাকে নির্দেশও দিয়েছে ইতিমধ্যেই। সেই অনুযায়ী জলপাইগুড়ি পুরসভা রাজ পরিবারের বর্তমান সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছে। পুর প্রধান মোহন বসু জানিয়েছেন, রাজ পরিবারের সদস্যরা সেই ঐতিহাসিক বাড়ি সংস্কারের জন্য কোনও আপত্তি করেননি। তাঁদের সঙ্গে মৌখিক ভাবে কথাবার্তা হয়েছে। তাঁরা সেখানে প্রথমে সীমানা প্রাচীর দিতে চান। তারপর বাকি সংস্কারের কাজ শুরু হবে। তবে পুরো কাজের বাজেট তৈরি করে শুরু করতে একটু সময় লাগবে। তাঁরা চাইছেন, পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠুক রাজবাড়ি।

জলপাইগুড়ির এই রাজবাড়ি বৈকুণ্ঠপুর রাজের অধীনে ছিল। রাজবাড়ির শেষ রাজা ছিলেন প্রসন্নদেব রায়কত। তিনি এক সময় রাজ্যের মন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু রাজবাড়ির ভিতরে কী আছে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে পর্যটকদের। রাজবাড়ির ভিতরে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। শুধু দুর্গাপুজোর সময় রাজবাড়ির ভিতর থেকে রাজার মুকুট, অস্ত্র সহ অন্য কিছু সামগ্রী বাইরে আনা হয়। সেসব রাখা হয় দেবী দুর্গার সামনে। তখনই সাধারণ মানুষ রাজবাড়ি নিয়ে তাদের কিছু কৌতুহল মেটায়। নতুন প্রজন্মদের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই।

যদিও এই রাজবাড়ি ও বৈকুণ্ঠপুর রাজাদের নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে কিছু কিছু তথ্য ও বিষয়ে আজও মতভেদ রয়ে গিয়েছে। ইতিহাসবিদ তথা উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসবিভাগের প্রধান ডঃ আনন্দ গোপাল ঘোষ জানাচ্ছেন, জলপাইগুড়ির এই বৈকুণ্ঠপুর রাজাদের পদবি ছিল রায়কত। এটা ছিল কোচবিহার রাজবংশেরই একটি শাখা। কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের ভাই ছিলেন শিষ্য সিংহ। তাঁকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বৈকুণ্ঠপুর রাজ্য শাসন করার অধিকার দেওয়া হয়। কোচবিহার রাজ পরিবারের নারায়ণকে বৈকুণ্ঠ নামে পুজো করা হত। সেই নাম থেকে আসে বৈকুণ্ঠপুর। তাঁদের প্রথম রাজধানী ছিল তিস্তা নদীর কাছে সুবর্ণপুরে। সুবর্ণপুর ছিল জঙ্গলে ঘেরা(যদিও সুবর্ণপুর বৈকুণ্ঠপুরের প্রথম রাজধানী ছিল বলে অন্য অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন না)। ইতিহাসবিদ আনন্দ গোপাল ঘোষ দাবি করেন, শিলিগুড়ি শহরের কাছে শালুগারার কাছে কোথাও নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে সুবর্ণপুর ছিল। এ-নিয়ে পুরাতত্ত্ব বিভাগের কাছে খনন কাজের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু আজও খনন শুরু হয়নি।

সেই সময় নেপালের মোরাং, ইলম অঞ্চল বৈকুণ্ঠপুরের রাজা রায়কতরা শাসন করতেন। মোরাং জেলার এক রাজকন্যার সঙ্গে কোচবিহারের এক যুবরাজের বিয়ে হয়েছিল। আর মোরাং জেলার রাজকন্যার সঙ্গে অনেক যাত্রী নাকি সেই সময় কোচবিহার আসেন। সেই যাত্রীদের অনেকে কোচবিহারের মাথাভাঙ্গা ও ধুপগুরির একটি গ্রামে স্থায়ীভাবে থেকে যান। আর সেই থেকে মাথাভাঙ্গাতে মোরাংনিয়া ও ধূপগুড়িতে সেই নামে গ্রাম আজও রয়ে গিয়েছে। সেই সময় কোচবিহার রাজ ও বৈকুণ্ঠপুর রাজের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নেপালের রাজা শিলিগুড়ি মহানন্দা নদীর পাশ দিয়ে তরাই অঞ্চল নিজেদের দখল নিয়ে নেন। সেটা ছিল ১৭৮০ সাল। ১৭৬০ থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত নেপাল রাজ একদিকে শিলিগুড়ি তরাই এলাকা দখল করে নিলে অপর অংশের দখল নেন সিকিম রাজ। এরপর ব্রিটিশরা দার্জিলিং-এর দখল পায়। কিন্তু ব্রিটিশরা চিন্তা করে, দার্জিলিং দখল করা হলেও সেখানে যাওয়া হবে কী করে? কারণ তরাই নেপালের দখলে। তখন ব্রিটিশদের সঙ্গে নেপালের রাজের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে নেপাল রাজ পরাজিত হন। ১৮১৪-১৮১৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধের পর নেপালের সঙ্গে ১৮১৬ সালে ব্রিটিশদের সুগৌল চুক্তি হয়। সেই চুক্তির পর নেপাল রাজ তাঁর এলাকা মেচি নদীর ওপারে নিয়ে যাণ। আর মেচি নদীর এপার থেকে ব্রিটিশদের হাতে আসে। এর আগেই অবশ্য বৈকুণ্ঠপুরের রাজা দর্পদেব রায়কত ১৭১০ বা ১৭১১ সালে বৈকুন্ঠপুরের রাজধানী(সুবর্ণপুর বা জঙ্গল) তিস্তা নদীর কাছে বর্তমান জলপাইগুড়ি শহরে স্থানান্তর করেন। অন্যদিকে বৈকুণ্ঠপুর এলাকা জুড়ে সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশদের থেকে নানা রকম লুঠপাট চালাতেন। আর সেই সন্ন্যাসীদের আশ্রয় দেওয়া হত কোচবিহারে। তা নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে কোচবিহার রাজের বিরোধ তৈরি হয়। তাছাড়া কোচবিহারে সেই সময় গৃহযুদ্ধও শুরু হয়। তখন কোচবিহারের রাজ পরিবারের একটা অংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। সেটা ছিল ১৭৭৩ সাল। আর সেই চুক্তির পর বৈকুণ্ঠপুর রাজ হয়ে গেলেন জমিদার, যেহেতু কোচবিহার রাজেরই অংশ ছিল বৈকুণ্ঠপুর। কিন্তু কোচবিহার রাজের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তির পর আর বৈকুণ্ঠপুর রাজের সেই ক্ষমতা রইল না। এরপর কোচবিহার কার্যত বঙ্গদেশের অংশ হয়ে গেল।

একদল ইতিহাসবিদ বলছেন, ১৮৯০ সালে জলপাইগুড়িতে রাজবাড়ি তৈরি হয়। আর জলপাইগুড়ির সিংহদুয়ার তৈরি হয় ১৯১১ সালে। ইংরেজদের রাজার অভিষেক ঘিরে তৈরি হয় সিংহদুয়ার। রাজা পঞ্চম জর্জের সময় দিল্লিতে তিনটি দরবার বসেছিল। আর সেই দরবার বসানোর সময় তৈরি জলপাইগুড়ির সিংহদুয়ার। কোচবিহারের মহারাজা দিল্লিতে ১৩টি তোপধ্বনি পেলেও জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরের রাজার সেই গুরুত্ব ছিল না ইংরেজদের কাছে। এমনকি রাজাকে অস্ত্র রাখারও অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ কোচবিহারের রাজা রাজন্য ভাতা পেতেন। জলপাইগুড়ির রাজা তাদের ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে চলার জন্য রাজ বাড়ির পাশেই দীঘি তৈরি করেন। আজও সেই দীঘি রয়েছে। দিঘির পাশে মন্দির আছে। এসজেডিএ তা সুন্দর করার দিকে নজর দিয়েছে।

বিশিষ্ট গবেষক উমেশ শর্মা জানাচ্ছেন তাঁর মত – জলপাইগুড়ির বৈকুন্ঠপুর রাজ শুরু হয় ১৫২৩ সালে। রাজ পরিবারের বর্তমান বিল্ডিং তৈরি হয় ১৯১০-১৯১২ সালে। এই বিল্ডিং-এর আগে ১৮৪৮ সালে জে ডি হুকারের বর্ণনা অনুযায়ী রাজ পরিবারের বর্তমান বিল্ডিং-এর পশ্চিমে রাজ পরিবারের বাড়ি ছিল। সম্ভবত তার ছাদ ছিল টিনের। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বৈকুন্ঠপুরে মোট ৩১ জন রাজা রাজত্ব করেছেন। আর বর্তমান জলপাইগুড়ি রাজ বাড়িটি হল বৈকুণ্ঠপুরের তৃতীয় রাজধানী। প্রথম রাজধানী ছিল সন্ন্যাসী কাটা। দ্বিতীয় ধানি বোদাগঞ্জ। সুবর্ণপুর বলে বৈকুন্ঠপুরের কোনও রাজধানী ছিল বলে কখন শোনেননি উমেশবাবু। তাঁর মতে, ১৭১৫ সালে বর্তমান রাজবাড়ির স্থানে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। রাজবাড়ি ও দীঘির পাশে কালী মন্দির, মনসা মন্দির, শিব মন্দির আছে। নিরাপত্তা, তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন এবং কৃষকদের চাষবাসের সুবিধার জন্য রাজধানী বোদাগঞ্জ থেকে স্থানান্তরিত হয় এখানে। বর্তমান রাজবাড়ির একাংশ জরাজীর্ণ। সংস্কারের অভাবে তা নষ্ট হতে বসেছে। ১৮০০ সালে রাজবাড়ির পাশে দীঘি খোঁড়া হয়।

রাজ পরিবারের পুরোহিত শিবু ঘোষাল জানান, শেষ রাজার একমাত্র মেয়ে প্রতিমা দেবীর দুই ছেলে বর্তমান। তাঁদের একজন সৌম্য বসু। তিনি সেখানে এখন থাকেন। আর আছেন প্রণত কুমার বসু। তবে তিনি কিছু বলতে নারাজ।

Developed by DXDasia