
‘উই ওয়ান্ট গোর্খাল্যান্ড’ থেকে কী সরে আসছে পাহাড়? পুরভোটের ফলাফলে মিলতে পারে উত্তর
গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা প্রধান বিমল গুরুং যখন সুবাস ঘিসিংকে হটিয়ে পাহাড়ের অধিপতি হন তখন সুকনা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত পাহাড়ি রাস্তার সর্বত্র দেখা যেত গুরুংয়ের ছবি। তখন সুকনা থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত দেখা গিয়েছে, ‘উই ওয়ান্ট গোর্খাল্যান্ড’। আর এখন ছ-বছর বাদে সুকনা থেকে দার্জিলিং কিন্তু সেই গুরুং-এর ছবি নেই। সেখানে স্থান করে নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। মঙ্গলবার সকালে যখন এই প্রতিবেদক সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে দার্জিলিংয়ের পুরভোটের ছবি দেখতে বের হন, তখন সুকনা থেকে সর্বত্রই কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দেখা গিয়েছে। সব ছবিই বারবার প্রমাণ করছে, মমতা এবং তার শিকড় কতটা দৃঢ় হয়েছে পাহাড়ে। গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে ছোট ছোট পোস্টার পাহাড়ি গ্রামগুলোতে রাস্তার ধারে দেখা গিয়েছে বটে কিন্তু তা আকারে অনেক ছোট আর মনে হল, তেজও অনেক কম। আর গুরুং-এর ছবি? বিশ্বাস করুন, একটিও নেই। অথচ এক সময় বিমল গুরুং-এর নামে তাঁর ছবি দিয়ে কত শ্লোগান নজরে এসেছে। আজ তা মুছে গিয়েছে।
শিলিগুড়ি মাল্লাগুড়িতেই বেশি থাকেন অ্যান্থনির। ভোটের কার্ডটা দার্জিলিং-এ রয়েছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে সহযাত্রী হিসেবেই দার্জিলিং-এ যাচ্ছিলেন। বলেই দিলেন, ‘বাম শাসন অনেক দেখেছে দার্জিলিংয়ের মানুষ। ঘিসিংয়ের শাসন দেখেছে। আর গুরুংয়ের শাসনও দেখেছে। আজও কেন দার্জিলিংয়ের মানুষ দুটাকা লিটার দরে জল কিনে খাবেন? দার্জিলিংয়ে ঢোকার মুখে যানজট কেন বাড়ছে দিনের পর দিন?’ দার্জিলিংয়ের জেলা শাসকের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে নিমা শেরপা বললেন, ‘আমি তো বিমল গুরুংয়ের প্রতিবেশী। তাঁর সঙ্গে জিএলপিতেও ছিলাম। কিন্তু তাঁর সংস্রব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। আর ভালো লাগছে না। একটা পরিবর্তন দরকার দার্জিলিংয়ের। উন্নয়ন ছাড়া হবে না। জিএলপি ছেড়ে দেওয়াতে আবারও গুরুংয়ের ওখান থেকে ডাক এসেছে। কিন্তু আর যাব না।’ কেন যাবেন না? প্রশ্ন তুলতেই তৈরি জবাব, ‘কী হবে গিয়ে? বিমল গুরুং কি আর আগের মতোই আছেন? প্রশান্ত তামাংকে সঙ্গী করে তিনি উঠেছিলেন। কিন্তু তখনকার তাঁর মনোভাব আর আজকের মনোভাবে অনেক ফারাক। দার্জিলিংয়ের মানুষ কী সমস্যায় আছেন আর গুরুংয়ের কী উন্নতি হয়েছে তা তো দেখাই যাচ্ছে।
যদিও চকবাজারে গল্প করতে করতেই অনিক থাপা বলতে থাকেন, আমাদের এখানে গোর্খাল্যান্ডের দাবি থাকবেই। গোর্খাল্যান্ড তো হবে না। কিন্তু কিছু নেতার কিছু হবে। কিন্তু ভোটে কী হবে? অনিক বলেন, কী আর হবে। দার্জিলিং হয়তো মোর্চারই হাতে থাকবে। তবে শাসক দল তৃণমূলের শক্তি আর মোর্চার শক্তি ধরুন ফোরটি বনাম সিক্সটি। অথচ এই তৃণমূল শূন্যতে ছিল। কারণ কী? গুরুংদের অহংকার, বনধ ডাকা, সাধারণ মানুষের কথা না ভাবা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বারবার পাহাড়ে এসেছেন। কোনও বনধ, অশান্তি নেই। যারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে তাদের জন্য উন্নয়ন বোর্ডগুলো মনে রাখার মতো। মঙ্গলবারই সেখানে একমুখ হাসি নিয়ে মিছিল করেছেন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব। গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। বিমল গুরুং ও তাঁর সহযোগী বিনয় তামাং ও তাঁদের কর্মীরা অবশ্য বলে যাচ্ছেন, গোর্খাল্যান্ড নিয়েই এগোবে পাহাড়। মুখ্যমন্ত্রী বিভাজনের রাজনীতিও করছেন বিভিন্ন পর্ষদ গঠন করেছেন। কিন্তু মানুষ সর্বত্রই মোর্চার হাতকেই শক্ত করবে।
তবে বিগত বিধানসভা ভোটের ফলাফলেই অঙ্কের হিসাব চিন্তার কারণ গুরুংদের কাছেও। শেষ বিধানসভা ভোটে দেখা যাচ্ছে, দার্জিলিং বিধানসভা কেন্দ্রে বিজয়ী মোর্চা প্রার্থী যেখানে ৯৫৩৮৬টি ভোট পেয়েছেন সেখানে তৃণমূল প্রার্থী সারদা রাই সুব্বা পেয়েছেন ৪৫৪৭৩টি ভোট। একেবারে শূন্য থেকে ৪৫৪৭৩টি ভোট তৃণমূলের বাক্সে গেল কীভাবে? একই ভাবে কার্শিয়াং বিধানসভায় বিজয়ী মোর্চা প্রার্থী রোহিত শর্মা যেখানে ৮৬৯৪৭টি ভোট পান সেখানে তৃণমূল প্রার্থী শান্তা ছেত্রী ভোট পান ৫৩২২১টি। কার্শিয়াংয়ের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে রীতিমতো মোর্চা প্রার্থীকে পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন শান্তাদেবী। সেই হিসেব দেখে একদা গুরুং ঘনিষ্ঠ এখন তৃণমূল নেতা প্রদীপ প্রধান দাবি করেন, তাঁরা কার্শিয়াং পুরসভা দখল করেছেন। কেননা, বিগত বিধানসভা ভোটের তুলনায় তাঁদের শক্তি অনেক বেড়েছে। মিরিকেও তাঁদের শক্তি বেড়েছে। বহু মোর্চা কর্মী প্রতিদিন যোগ দিচ্ছেন তৃণমূলে। যদিও গুরুংদের চরম বিরোধিতা করা জিএনএলএফ বিধানসভা ভোটের মতোই হাত মিলিয়েছে তৃণমূলের সঙ্গে। কার্শিয়াং, মিরিক ও দার্জিলিংয়ের আসনে তৃণমূলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে জিএনএলএফ-এর। কালিম্পংয়ে একসময় তৃণমূলের সঙ্গে হরকাবাহাদুর ছেত্রীর সমঝোতা থাকলেও এখন সেটায় অনেকটা চিড় ধরেছে। ফলে সেই সুযোগে মোর্চা সেখানে তাদের হারানো জমি ফিরে পেতে মরিয়া। আবার তৃণমূলও নতুন জেলা উপহার দেওয়ার ইস্যু তুলে মোর্চাকে বেগ দিতে নেমেছে। কিন্তু সেখানে হরকাবাহাদুর ছেত্রীর জন আন্দোলন পার্টির শক্তিকে খাটো করে দেখা যায় না। ফলে সেখানেও লড়াই বেশ হাড্ডাহাড্ডি। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে গুরুংকে সামনে বসিয়ে বাংলা ভাগ হবে না বলে যে আওয়াজ তুলেছিলেন নির্ভীকভাবে, উন্নয়ন আর উন্নয়ন, পর্যটন-শান্তি আর আন্তরিকতা দিয়ে তিনি যে পাহাড়ে ওঠার অভিযানে অনেকটাই সফল তার প্রমাণ বিধানসভা ভোটে তাঁর দলের ভোট পাওয়ার হার। এখন পুরভোটে মানুষ কী করেন, সেটাই দেখার।
