
দক্ষিণের বারান্দায় বসে রবিকার শেষ যাত্রার ছবি আঁকছেন তাঁর স্যাঙাত অবন
গুরুর সমস্ত কাজে যেমন স্যাঙাতরা সদা ত্রস্ত থাকতেন অপর দিকে গুরু অবনীন্দ্রনাথের চিরকিশোর মনের সৃষ্টির পিছনে ছিল এই সমস্ত স্যাঙাতদের এক বিশেষ ভূমিকা। আর তার জন্য অবনীন্দ্রনাথের সকল রচনাগুলি পড়লে মনে হয় তিনি যেন গল্প করছেন অদৃশ্য শ্রোতাদের বা স্যাঙাতদের সঙ্গে বসে। তিনি বাড়ির ছোটদের মধ্যে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করার জন্য স্বপ্নের মোড়ক তৈরি করতে উৎসাহিত করতেন। পুজোর ছুটিতে লাইব্রেরির ঘর গোছানোর কাজ করাতেন। ছোটদের স্বনির্ভর করার জন্য রান্নার ক্লাস খোলা হল। সেখানে বাড়ির ছোটদের পাশাপাশি বাড়ির মেয়ে-বউদের ও বাড়ির বাবুর্চিদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হল এবং দেখা গেল রান্নার জন্য দাদামশাই অনেক বইও পড়ে ফেলছেন। দাদামশাইয়ের চাকর রাধুকে রান্নায় পারদর্শী করে তোলা হল। প্রথম দিনের ক্লাসে ছোট ছোট স্যাঙাতরা রান্না করল নানা আকৃতির আলুভাজা। এ হল স্যাঙাতমঙ্গল কাব্য।
অবন ঠাকুরের আর এক স্যাঙাত ক্ষিতীশ(ক্ষিতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত), বাড়ির সরকারবাবু। সে দাদামশাইকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাত। দেশীয় পত্রিকায় ছাপা সংবাদগুলির মধ্যে কোথায় ইংরেজরা কী কী অত্যাচার চালাছে তা জোরে জোরে পড়ে শোনাতেন। এইদিকে হঠাৎ দেশীয় পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হল। ক্ষীতিশের খুব মন খারাপ। একদিন সকালে হঠাৎ ক্ষিতীশ এসে উপস্থিত। সে তার জামার তলা থেকে অনেক দিনে মোড়া খবরের কাগজ বের করে বলল, ‘আপনার জন্য দেশীয় নিষিদ্ধ খবরের কাগজ এনেছি লুকিয়ে। এবার সব পড়ে শোনাব।’ দাদামশাই এককথায় রাজি। দক্ষিণের বারান্দায় পাশাপাশি বসে থাকা অপর দুই ভাই গগন ও সমর কান পাতলেন সে খবরে। এ ভাবে চলতে চলতে একবার সরকারমশাই ঠিক করল গুরুর শুরু করা স্বদেশী অন্দোলনের প্রচারে স্বদেশী পদ্ধতিতে মাথায় মাখার তেল তৈরির ব্যবসা করবে। গুরুর কাছ থেকে চাই শংসাপত্র। ব্যবসার জন্য বয়ান তৈরি করল গুরুর নামকে নিয়ে –
অলকানন্দ কেশ তৈল
ডাক্তার শ্রী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সি.আই.ই
কর্তৃক প্রদত্ত নাম
মাখলে মাথা ঠান্ডা হয় ও কেশ বৃদ্ধি পায়
মূল্য প্রতি শিশি।
এসব ছাড়াও স্যাঙাতদের নিয়ে অবন দাদামশাইয়ের ছিল আরও অনেক কাজ। সেবার হঠাৎ জোড়াসাঁকো বাড়ির দ্বারকানাথ ঠাকুরের ক্যাশ ঘরে ভূতের উৎপাত দেখা গেল। অবনঠাকুর তার স্যাঙাতদের নিয়ে পড়লেন ভূত রহস্য উৎঘাটন করতে। ক্ষিতীশকে ঠিক করা হল যে ভূতের আগমন হলেই কলতলায় এসে ঘণ্টা বাজিয়ে বার্তা দেবে। লেখাপড়ার ঘর থেকে ঘণ্টা খুলে এনে লাগানো হল। আর সকলকে সজাগ থাকতে বলা হল। দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করতে করতে সকলে ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ মাঝ রাতে ঘণ্টা বেজে উঠল। ধড়ফড় করে, সাত তাড়াতাড়ি উঠে দাদামশাইয়ের সাথে সকলে পা টিপে টিপে অন্ধকারে আলো না জ্বালিয়ে চলল যাতে ভূত টের না পেয়ে যায়। এদিকে ক্যাশঘর ক্রমাগত অদ্ভুত অদ্ভুত আওয়াজ হচ্ছে। সকলে পরস্পররে গা ঘেঁষে চলেছে। তার পর ক্যাশঘরের দরজা খুলে দেখা গেল বড় বড় ইঁদুর পুরোনো বাসনপত্র মুখে করে নিয়ে মাটিতে ফেলছে। সকলে হো হো করে হেসে উঠল। নিত্যদিনের গুরু ও স্যাঙাতদের এই সমস্ত কর্মকাণ্ড সকলে ভালো না লাগলেও তাদের এই সমস্ত কাজ জোড়াসাঁকো বাড়িকে করে আনন্দে মুখরিত।
এদিকে রবিকা নানা রকম কথা বলতেন আর অন্য দিকে তাঁর স্যাঙাতরা ছবির পর ছবি আঁকতেন। গগনেন্দ্রনাথ তাঁর রবিকার ইংল্যান্ড থেকে প্যারিস যাওয়ার সময় প্রথম এরোপ্লেন চড়ার সিনেমাটি দেখে ব্যঙ্গ করে ছবি এঁকে ছিলেন ‘কবির আকাশ বিহার’। কবি চেয়ারে বসে আকাশে উড়ছে আর তার কাব্যগ্রন্থগুলিও তাঁর সঙ্গে আকাশে উড়ছে(পরবর্তীকালে এই ছবিটি গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নব হুল্লোড়ে’ বইতে ছাপা হয়)। আবার অবন ঠাকুরের স্যাঙাত রাণী চন্দের ‘ঘরোয়া’ বইটির অনুলিখনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী অবনীন্দ্রনাথের বয়ানে জেনেছে রবিকা ও তাঁর স্যাঙাত গগন, সমর ও অবনের অনেক অজানা কথা, স্মৃতি ও ঠাকুরবাড়ির অনেক ইতিহাস। মোহনলালের ‘দক্ষিণের বারান্দা’ও এক অনবদ্য সৃষ্টি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘আপন কথা’, ‘বুড়ো আংলা’ ইত্যাদি নানা বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ঠাকুর বাড়ির গুরু-স্যাঙাতের স্বর্ণময় দিনগুলিকে।
শুধু স্যাঙাতরাই নয়, গুরুরাও সর্বদা তাঁদের স্যাঙাতদেরকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। দক্ষিণের বারান্দার তিন ভাই-কে বিশ্ব দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের গুরু রবিকা অনেক চেষ্টা করতেন। যেদিন রবি অস্ত গেলেন, চারিদিকে লোকের ভিড়। কবি চলেছেন সকলের মাথায় চড়ে সেই সময় দক্ষিণের বারান্দায় বসে রবিকার শেষ যাত্রার ছবি এঁকেছিলেন তাঁর স্যাঙাত অবন। ‘দক্ষিণের বারান্দা’ বইয়ে মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন ‘আমার সাহিত্যিক হিসাবে গড়ে ওঠার পিছনে দাদামশাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য।’ এই গুরু-স্যাঙাত সম্পর্ক বর্তমান যুগের স্যাঙাতদেরও প্রেরণা যুগিয়েছে।
