ঠাকুরবাড়ির গুরু-শিষ্য – ২

যখন রবীন্দ্রনাথের স্যাঙাত অবন ঠাকুর নিজেই হয়ে ওঠেন গুরু

ঠাকুরবাড়িতে নাটক, যাত্রা অনুষ্ঠান প্রায় প্রতিদিন লেগে থাকত। রবিকার নাটকে স্যাঙাতরা ছিলেন সর্বঘটের কাঁঠালি কলা। অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, অনুষ্ঠানের জন্য টাকা যোগাড় করা সবেতেই স্যাঙাতরা হাজির। এই স্যাঙাতরাই হলেন গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র, অবনীন্দ্র, মানে গুনু ঠাকুরের তিন সুপুত্র। দুই জন ছবি আঁকেন। আর সমরেন্দ্র দিনভর বই পড়েন দখিনের বারান্দায়। রবিকাকাকে এই থ্রি-মাস্কেটিয়ার্স গুরু মেনেছেন। গঠন করা হল ‘ড্রামাটিক ক্লাব’, ‘খামখেয়ালি সভা’। কিন্তু নানা কারণে শেষমেশ এই ক্লাবগুলি না টিকলেও রবিকাকার স্যাঙাতদের কার্যকলাপ জোড়াসাঁকো বাড়িকে আনন্দে ভরে দিত। চারিদিকে একেবারে হৈ হৈ ব্যাপার হত। রবিকা গান করতেন, অবনীন্দ্রনাথ এস্রাজ বাজাতেন আর সবাই স্টেজ সাজাতেন, অভিনয় করতেন। বাড়ি ছোটরাও দল বেঁধে রিহার্সাল দেখত, কেউ কেউ পার্ট করার সুযোগও পেত। সেখানে আবার সাহেবরা আসতেন তাঁদের মেমদের নিয়ে নাটক দেখতে।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে বাড়ির বড় সদস্যরা ও শান্তিনিকেতন থেকে আসা ছাত্ররা পার্ট করত। ছোটদের মধ্যে খুকিমাসি(সুরূপা মুখোপাধ্যায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে) ছাড়া কেউ অংশ গ্রহণ করতে পারত না। বাড়ির বড়দের দেখাদেখি ছোটরাও একত্রিত হতে শুরু করল। ছোটদের মধ্যে অবনবাবুর নিজস্ব স্যাঙাতের দলটি উপস্থিত হল। এই স্যাঙাত দলের সর্দার ছিলেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছেলে মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। মা হারা ছোট্ট মোহনলাল ছিলেন দাদামশাইয়ের চোখের মণি, সব কাজের সদা সঙ্গী। পাথর খোঁজা, দার্জিলিংয়ে গিয়ে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে পাহাড় দেখা, রবিকার নির্ঝরের ঝর্নার অর্থ বোঝা, বাগান তৈরি করা, স্বপনের মোড়ক তৈরি, ইরানি শা-বুলবুলির জন্য ফাঁদ পাতা, বাড়ির ছোটের জন্য নাটক, যাত্রা তৈরি করা, রিহার্সাল দেওয়া, সাহেব-মেম দের বসার জায়গা থেকে মণি-মুক্তা খুঁজে বার করা, স্বদেশী পদ্ধতিতে রং তৈরি করা, দেশীয় নুন তৈরি করা ইত্যাদি হাজারো কাজে খুদে স্যাঙাত মোহনলাল। মোহনলাল ছাড়াও অন্য স্যাঙাতদের মানে অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে বীরু, সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে বাদশা, শোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায় রাণী মানে রাণী চন্দ বা ক্ষিতীশ অর্থাৎ ক্ষিতীশ দাশগুপ্ত ও শিল্পী নন্দলাল বসুরও গুরুত্ব কিন্তু কম ছিল না। 

একদিন দক্ষিণের বারান্দায় অবনীন্দ্রনাথ পাথর দিয়ে একটি ইঁদুর তৈরি করেছেন। এমন সময় সেটি বারান্দার রেলিং টপকে নিচে পড়ে যায়। অন্ধকারের জন্য সেটা খোঁজা যাচ্ছে না। খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অবনীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো বাড়ির বাগানে সেটিকে খুঁজছেন। এমন সময় বাদশা(সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর) এসে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কী খুঁজছ দাদামশাই? অবনীন্দ্রনাথ বলেন, কালকের ইঁদুরটি মনে হয় জ্যান্ত হয়ে গর্তে ঢুকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে স্যাঙাতরা নেমে পড়লো ইঁদুর খুঁজতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটা তখনের মতো না পাওয়া গেলেও গুরু জিনিসটা খুঁজে বার করার জন্য সকাল সন্ধ্যে সকল স্যাঙাতরা একবার করে জোড়াসাঁকো বাড়ির বাগান খুঁজে বেড়াত। যদি পাওয়া যায়। কারণ গুরু তাদের বলেছেন – ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই পেলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’

একবার বাড়ির অবন দাদামশাইয়ের স্যাঙাতরা হাতে লিখে পত্রিকা বার করলে। নাম দেওয়া হল ‘দেয়ালা’। অবন দাদামশাই স্যাঙাতদের চুপি চুপি নির্দেশ দিলেন “যা গিয়ে বড় দাদামশাইকে(গগনেন্দ্র ঠাকুর) ধর।” যেমন বলা তেমন কাজ। স্যাঙাতরা গিয়ে ধরল গগন দাদামশাইকে। দাবি, তাদের পত্রিকায় বড় দাদামশাইকে একটা লেখা লিখে দিতে হবে। গগন দাদামশাই ফেলতে পারলেন না স্যাঙাতদের কথা। কলম ধরলেন। লিখেও ফেললেন একখানা গল্প। নাম দিলেন ‘দাদা-ভাইয়ের দেয়ালা’। পরবর্তী কালে এই গল্পটিই ‘ভোঁদর বাহাদুর’ নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সিগনেট প্রেস থেকে। গগনন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র এই মহৎ সাহিত্য কীর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু অবন দাদামশাইয়ের স্যাঙাত মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর সহচরদের দৌলতেই। 

অবনীন্দ্রনাথ তার গুরু রবিকা কাছ থেকে স্বদেশী আন্দোলনের যে বাণী পেয়েছিলেন সেগুলি তাঁর সাগরেদদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন নানা ভাবে। তিনি চারকোল, গঙ্গামাটি, নীলবড়ি, ভুসোকালি,এলামাটি, গেরিমাটি ও গুড়ো রং দিয়ে কীভাবে রং তৈরি করা হয় এবং তা দিয়ে কীভাবে ছবি আকঁতে হয় সেই রাস্তা দেখিয়েছিলেন সকলকে। তিন ভাই তাদের বিদেশী রং দিয়ে আঁকা ছবিগুলি জোড়াসাঁকো বাড়ি থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, লাইব্রেরি ঘরে থাকা বিদেশী পর্দাগুলি খুলে দেশীয় দ্রব্য দিয়ে ঘর সাজিয়ে ছিলেন। তাদের এই কর্মকাণ্ড তাঁদের স্যাঙাতদের মনে গভীর ছায়া ফেলেছিল। ফলে তারাও বড় হয়ে গোপনে কংগ্রেসের নানা কাজে যুক্ত হয়ে দেশের সেবায় নিজেদের নিযুক্ত করে।

Developed by DXDasia