
মা বলত, ওর বাঁশি শুনতে শুনতে ডালে ফোড়ন দিতে ভুলে যাই
তখন রোদ ঝরানো চৈত্র শেষের দিন। দাদার ছোট্ট সাইকেলের ক্যারিয়ারে ব’সে বোলপুর টাউন লাইব্রেরি থেকে ‘বীরবলের গল্প’ খুঁজে পাওয়ার সময়। বাড়ির সামনেই একটুকরো খেলার জায়গা। সেখানেই পুজোর বেদী। সন্ধ্যে নামার আগে একটা বাঁশির সুর পাড়ার সকলের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ত ঘরে। ক্লাস ওয়ানের ছেলেটাকে সাতের ঘরের নামতা ভুল করিয়ে দিয়ে সে সুর কোথায় থিতু হত জানি না। কান্তদা পুজোর বেদীতে বসে বাঁশি বাজাত। মা বলত, ওর বাঁশি শুনতে শুনতে ডালে ফোড়ন দিতে ভুলে যাই।
চৈত্র শেষ হওয়ার দু সপ্তাহ আগে বাড়িতে আসত খান তিনেক আর্ট পেপার। দাদার জন্য দুটো আর আমার একটা। কাগজ কেটে কেটে কার্ডের আকার দেওয়া। তারপর কখনও মোম রঙের আকাশ, নৌকো, নদীর সংসার তো কখনও খামার বাড়ি, কলাগাছ ফুটিয়ে তোলার সাধনা। নববর্ষের সকালে শান্তিনিকেতন থেকে ফিরেই বন্ধুদের সেই কার্ড বিতরণ করার পালা। কবজি বিশেষ ঘুরতো না ব’লে মানুষ আঁকার বাসনা প্রায় ছিল না বললেই চলে। দাদা রাখাল আঁকতে ভালোবাসতো। সে রাখাল উদাস পায়ে হেঁটে চলা বালক। হাতে তার বাঁশি। প্যাস্টেলের ঘাসে চড়ে বেড়ানো গাভী আর বাছুর। পাশের বাড়ির মাধুদা তখন পেন দিয়ে চোখের নানান ধরতাই ধরতে ব্যাস্ত। একবার আমাকে দেওয়া গ্রিটিংস কার্ডের ওপর দেখি তেরছা চোখে এক মহিলার হাতে চায়ের কাপ। বুঝলি কিছু? সন্তর্পনে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল মাধুদা। আমি বললাম, না তো। বললো মহিলার চোখটা দেখেও বুঝলি না? আমি ঘাড় নাড়তে কানের আরও কাছে এসে ততোধিক ফিসফিসিয়ে বললো, চায়ে বিষ মিশিয়েছে। শুনেতো আমি চিত্তির। সভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, চা টা খাবে কে? অম্লান বদনে মাধুদা বললো, সেটা এখনও ঠিক করিনি।
বন্ধুদের দেওয়া গ্রিটিংস কার্ডের ছবিতে গোলাপের আধিক্য। গোপাল আমার অসম বয়স্ক বন্ধু। ওর কার্ডে আঁকা গোলাপের সঙ্গে প্রতিবারই চিনে ম্যানদের দাড়ির মতো খান তিনেক কাঁটা। স্কুলে বন্ধুদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের জন্য ছোট ছোট কার্ড বানানোর রীতি ছিল। আনতাবরি ঝরনা কলম ঝাঁকিয়ে কার্ডের ওপর অদ্ভুত দর্শন ছবি তৈরি করার নেশা লেগে গিয়েছিল। সারা বছর রঙ পেনসিলের হদিস না পাওয়া গেলেও চৈত্র শেষের এই কটা দিন তারা গুপ্ত স্থান থেকে ‘এসো হে বৈশাখ’ গাইতে গাইতে বেরিয়ে আসত।
পাশের বাড়ির তানিয়াদি কলেজে পড়তো। প্রতিবার ওর কাছ থেকে কার্ড পাওয়ার একটা আলাদা উত্তেজনা ছিল। কার্ডের সঙ্গে মিলত চকলেট। তাছাড়া তখনই তানিয়াদির আঁকার খুব কদর বড়দের মহলে। সেবার কার্ড দিয়ে বললো, এখানে নয় বাড়ি গিয়ে দেখিস। পরে খাম খুলে দেখি এক তন্ময় মূর্তি বাঁশি বাজাচ্ছে। মুখশ্রী অবিকল কান্তদার। দাদাকে দেখাতে বাঁকা হেসে বলেছিল, ও তুই বুঝবি না। সে বছরই আষাঢ় মাসের পয়লায় গলায় দড়ি দিল তানিয়াদি।
হারানো গ্রিটিংস কার্ডের দিকে চোখ রাখলে আজ বুঝি কান্তদার বাঁশির সুর ক্লাস ওয়ানের ছেলেটাকে সাতের ঘরের নামতা ভুল করিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পরতো। তানিয়াদির মতো আরও অনেকের জীবনটা এলোমেলো ক’রে দিতে।
