সম্পত্তি সুরক্ষার আইন

কঠোর আইন হিংসার আগুনকে আটকাতে পারে না। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কতৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থার পরিমণ্ডলই ধ্বংসাত্মক প্রবণতাকে রুখে দিতে পারে

সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস রোধ করতে কয়েকদিন আগে বিধানসভায় একটি আইন পাশ হয়েছে। গণ আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক বিক্ষোভের অছিলায় কেউ যেন ওই ধরনের সম্পত্তি নষ্ট করতে না পারে তা আটকানোর জন্যই এমন একটি আইন আনার কথা সরকারের মাথায় ছিল। সেই আইনে যারা অপরাধী সাব্যস্ত হবে তাদের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য একটি পৃথক ফাস্টট্রাক আদালত তৈরি করার কথাও ভাবা হচ্ছে। বিরোধীরা আইনটির উপর নানাবিধ সংশোধনী আনার চেষ্টা করলেও সরকার পক্ষের ভোটাধিক্যে তা বাতিল হয়ে গেছে। এখন কেবল রাজ্যপালের অনুমোদনের অপেক্ষা।

মনে রাখা ভালো এই ধরনের একটি আইন এই রাজ্যে নতুন নয়। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলেও এমন  একটি আইন পাশ হয়েছিল। কিন্তু তার ব্যাপক ব্যবহার কোনদিনই হয়নি। বর্তমান আইনটি তারই সংশোধিত রূপ। প্রস্তাবিত আইনটি বিধানসভায় উস্থাপিত হলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। ধস্তাধস্তিতে বিরোধী দল নেতা আবদুল মান্নান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে দেখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এ সবই পরিষদীয় প্রক্রিয়া এবং তৎপরবর্তী শিষ্টাচার।

এই আইনের যা উদ্দেশ্য তা নিয়ে কোন বিতর্কের কোন অবকাশই নেই। সাধারণত সব আইনেই জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করা হয় এবং এই আইনেও তেমন সব কথাই রয়েছে। কিন্তু এই আইনকে ঘিরে মূল প্রশ্ন হল মুখ্যমন্ত্রী এখন এই ধরনের একটি আইন তৈরি করার কথা ভাবতে গেলেন কেন? এই আইন সরাসরি আইন শৃঙ্খলার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই রাজ্যের লগ্নীটানার ব্যপারেই হোক বা অন্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনার প্রশ্নই আসুক মুখ্যমন্ত্রী সব সময়ই দুটি কথা বলে থাকেন তা হলঃ এই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং এই রাজ্যে কোন ট্রেড ইউনিয়ান আন্দোলন নেই। কথা দুটো মিথ্যা নয়। তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে আজ থেকে ৬ বছর আগে। এই সময়ের মধ্যে বাম-কংগ্রেস-বিজেপি কেউই কোন জঙ্গী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতেও তার কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ট্রেড ইউনিয়ানেও একই অবস্থা। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা বাকি পড়ে আছে, একের পর এক চটকল বন্ধ হয়েছে, বন্ধ চা-বাগান খুলছে না কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন ধৈর্য্য হীন আন্দোলন নেই। গণবিক্ষোভে ব্যাপক সম্পত্তি হানির ঘটনাও এই ৬ বছরে ঘটেনি। তাহলে আজই এই ধরনের একটি আইন কেন?

নিন্দুকেরা তৃণমূলের গোষ্টী দন্দ্বের প্রতি আঙুল দেখাতে পারেন। কিন্তু বাদ-বিসবাদেও ব্যাপক সম্পত্তিহানির কোন ঘটনা ঘটেনি। যেটুকু গোষ্ঠী দন্দ্ব চলছে সে সংকট মোচনের প্রাথমিক দায় সংশ্লিষ্ট দলের। পরিস্থিতি লাগাম ছাড়া হয়ে গেলে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে। তার জন্য চলতি আইনগুলিই যথেষ্ট।

আরও একটি কথা এই প্রসঙ্গে বিশেষ ভাবে বিবেচনা করা উচিত যে আন্দোলন সম্পত্তি নষ্ট করে তা অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভেদে বরাবর তার ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। কথাটা ‘ভারতছাড়ো’ আন্দোলন দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। মহাত্মা গান্ধী ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট এই আন্দোলন শুরু করেন এবং নভেম্বর মাসেই তা প্রত্যাহার করে নেন। কারণ আন্দোলনের মধ্যে হিংসা ঢুকে পড়েছিল। তার বহিঃপ্রকাশ এই রাজ্যে  মেদিনীপুরেও হয়েছে। সেখানে অজয় মুখার্জি-সুশীল ধাড়ারা স্বাধীন সরকার গঠন করেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠি এবং তাঁর দাদাকে পণ-বন্দী করা হয়েছিল তাঁরা জমিদারের ছেলে বলে। ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির সৈন্যরা সেই সময় সরকারি সম্পত্তিই ছিল। কিন্তু তাদের ভাঙিয়ে নিয়েই নেতাজি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। তাতে উদ্বদ্ধ হয়েই ব্রিটিশ নৌ-বাহিনি ১৯৪৬ সালে মুম্বাইয়ে নৌ-বিদ্রোহ ঘটায়। কোন ঘটনাতেই গান্ধীর অনুমোদন ছিল না। কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ওই সব আন্দোলন মানুষের অনুমোদন পেয়েছে এবং ইতিহাসের পাতাতেও তার ইতিবাচক উল্লেখ আছে।

১৯৫০-৬০ দশকে এই বাংলায় বামপন্থী গণবিক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছিল জ্বলন্ত ট্রাম। কোম্পানিটি তখনও ব্রিটিশ মালিকানাধীন হলেও কাজটি যে ধ্বংসাত্মক তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষ সেই প্রতিবাদকে ইতিবাচক মনে করেছিল বলেই বামেরা ১৯৬৭ সালে প্রথম ক্ষমতার অলিন্দে আসে।

ষাটের দশকেই নকশাল বাড়ি আন্দোলনের অঙ্কুর মাথা তোলে। তার প্রথম প্রকাশ প্রসিডেন্সি কলেজে বেকার ল্যাব ভাঙচুর। পরবর্তী কালে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও আগুন জ্বলেছে। কিন্তু সেই সময়ের ছাত্র-যুব সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেই ক্ষতিগ্রস্থ সম্পত্তির খতিয়ানকে কোন আমলিই দিতে চায়নি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলন সম্পর্কেও সেই কথাই আসবে। বিধানসভা ভবনের মধ্যে ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছিল তাঁরই উপস্থিতিতে। নন্দীগ্রামের আন্দোলনও ছিল আগাগোড়া হিংসাত্মক। কিন্তু তার পরেও তিনি জণগণের ভোটে জিতেই ক্ষমতায় এসেছেন।

তাই এই ঘটনা প্রবাহ আবারও প্রমাণ করে যে কঠোর আইন যেমন হিংসার আগুনকে আটকাতে পারে না। তেমনি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থার পরিমণ্ডলই একমাত্র এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা রুখে দিতে পারে।

Developed by DXDasia