নজরুলের অন্ধকার কারাবাসে আলোর মতো শোভা পেত রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য
সে অনেক কাল আগের কথা। খেলার মাঠে বাকবিতণ্ডা চলছে দুই কিশোরের। বিতর্কের বিষয় রবীন্দ্রনাথ। একটি কিশোর অন্ধ রবীন্দ্র অনুরাগী। দরাজ গলায় যখন তখন গেয়ে ওঠে রবীন্দ্রসংগীত (Rabindra Sangeet)। অন্যজন তাঁর রবীন্দ্রভজনাকে দাঁড় করিয়েছে ব্যঙ্গের কাঠগড়ায়। আর যাবে কোথায়? রবীন্দ্রভক্ত ছেলেটি গোলপোস্ট উপড়িয়ে চড়াও হল উল্টোপক্ষের দিকে। তারপর বন্ধুর মাথা ফাটিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড করে বিদ্রোহী ছেলেটি সোজা জুভেনাইল কোর্টে। অল্পবয়স বলে কড়া কোনো শাস্তি হয়নি সেবার। ছেলেটি দুখু মিঞা তথা নজরুল ইসলাম। আহত ছেলেটির নাম জগৎ রায়, পরে বড়ো হয়ে নজরুলের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে (Rabindranath Tagore) নিয়ে ব্যঙ্গ করার শাস্তির চিহ্ন, মজা করে বলেছিলেন, ‘নজরুলের দেওয়া জয়টিকা’।
নজরুল (Nazrul Islam) সারাজীবন দুর্দান্তই রয়ে গেলেন। কারাবরণও করেছেন দেশের জন্য কবিতা লেখার অপরাধে। তাঁর বিদ্রোহী শব্দ কাঁপিয়ে দিয়েছে কারার ওই লৌহকপাট। ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ (Dhumketu) পত্রিকায় প্রকাশিত হল তাঁর লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। এই কবিতায় রাজদ্রোহের ইঙ্গিত খুঁজে পেলেন ব্রিটিশ সরকার। কবিতার জন্যই গ্রেপ্তার হলেন নজরুল। খবর পেলেন রবীন্দ্রনাথ। মনে মনে চাইছিলেন নজরুলকে নিজের মতো করে অভিবাদন জানাতে। অথচ নতুন লেখা! কিছু হয়নি। তখন কয়েকটি আগে লেখা গান একজোট করে তৈরি করলেন ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য। উৎসর্গ করলেন নজরুল ইসলামকে। লিখলেন, ‘শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেসু, ১০ই ফাল্গুন, ১৩২৯’।

বসন্ত উৎসবের দিন ডাক পড়ল পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের। ‘বসন্ত’ পৌঁছে দিতে হবে কারাগারের মধ্যে, নজরুল ইসলামের হাতে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে এই কথা বলেছিলেন যে কবিতা লেখা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। কারণ সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা দেবার কবিও তো চাই। বই এবং আশীর্বচন নজরুলের কাছে পৌঁছতেই নজরুল আছড়ে পড়লেন লোহার গারদের উপর। ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডার বিস্মিত হয়ে সেদিন কিছুক্ষণের জন্য লোহার গারদের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। নজরুলের প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস তখন অনেক কবি সাহিত্যিকের ঈর্ষার কারণ হয়েছিল। নজরুল বিদূষণ শুরু হয়েছিল প্রবলভাবে। অথচ নজরুলের নির্জন কারাবাস ভরাট হয়ে থাকত রবি ঠাকুরের সাহিত্যসুধায়। রবীন্দ্রনাথও নজরুলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এরপর নজরুলের অনশনকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্র নজরুলের একটা ভুল বোঝাবুঝিও হয়। নজরুল জেলের ভিতর কয়েদিদের প্রতি নির্মম আচরণের প্রতিবাদে প্রায়োপবেশন শুরু করেন। এই নিয়ে সেকালের বুদ্ধিজীবী মহল চিন্তিত হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথও চিন্তিত হন। খবর পৌঁছয় তাঁর কাছে। কিন্তু তিনি তখন শিলঙে। সাহিত্যিকদের এক অংশ রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন নজরুলকে তিনি যেন অনশন ভাঙতে বলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের থেকে কোনো অনুরোধপত্র নজরুলের কাছে পৌঁছয় না। পরে এই নিয়ে নজরুল অভিমান প্রকাশও করেছিলেন। হাঙ্গার স্ট্রাইকের (Hunger Strike) সময় খোঁজ নিলেন না কেন? — এই ছিল নজরুলের অভিমান। বলেছিলেন, ‘ওঁরা বড়, বড়র পিরীতি বালির বাঁধ।’ কিন্তু প্রকৃত ঘটনা ছিল অন্য।
১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল তাঁর লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা। এই কবিতায় রাজদ্রোহের ইঙ্গিত খুঁজে পেলেন ব্রিটিশ সরকার। কবিতার জন্যই গ্রেপ্তার হলেন নজরুল। খবর পেলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ জানতেন না, নজরুলকে কোন জেলে রাখা হয়েছে। শিলং থেকে রবীন্দ্রনাথ বার্তা পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি জেলে। কিন্তু নজরুল সেখানে ছিলেন না। নজরুল ছিলেন হুগলি জেলে। সেই টেলিগ্রামে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “Give up hunger strike, our literature claims you”। পরে নজরুলের ভুল ও অভিমান ভেঙেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ব্যক্তিগত আলাপ প্রায় কুড়ি বছরের। বিভিন্ন সময় তাঁদের দেখা হয়েছে। ভাববিনিময় হয়েছে। একজন স্থির গভীর জলধি আর অন্যজন পাগল ঝোড়ো হাওয়া! অসমবয়সী দুই ভিন্ন স্বভাবের কবির বন্ধুত্ব হওয়া কঠিন ছিল, কিন্তু অসম্ভব নয়। তাছাড়া নজরুল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন। তাঁদের প্রথম আলাপ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। তবে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতকে মান্যতা দিলে বলা যায়, ১৯২১ সালের পূজাবকাশের পর অধ্যাপক শহিদুল্লা সাহেব ও নজরুল একত্রে শান্তিনিকেতন (Shantiniketan) এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে নজরুল তখন দৃপ্ত তরুণ, সৈনিক কবি। শান্তিনিকেতনের সুধাকান্ত রায়চৌধুরী ছিলেন নজরুলের গুণগ্রাহী। তাঁর মাধ্যমেই নজরুলের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের ষাটবছরের জন্মদিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তাঁর জন্য একটি অভিনন্দন সভার আয়োজন করেন। সেই সভায় নজরুল এসে রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করার সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিজের পাশে বসতে বলেন। শোনা যায়, নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ (Bidrohi) কবিতাটি শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের লেখার একটি জোরালো ধরনের কথা লক্ষ করেছিলেন। একবার নজরুলকে তিনি বলেছিলেন, মনজোগানো লেখা না লিখতে। বিধাতা যে অদৃশ্য তরোয়াল হাতে নজরুলকে পাঠিয়েছেন, তা কেন তিনি দাঁড়ি চাঁচবার কাজে ব্যবহার করছেন? নজরুল এই কথার অর্থ ধরতে পারেননি। ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় তিনি এই প্রসঙ্গটিকে অক্ষরের বাঁধনে প্রকাশ করেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘গুরু কন, তুই করেছিস শুরু তরোয়াল দিয়ে দাঁড়িচাঁচা।’
রবীন্দ্রনাথের ষাটবছরের জন্মদিনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তাঁর জন্য একটি অভিনন্দন সভার আয়োজন করেন। সেই সভায় নজরুল এসে রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করার সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিজের পাশে বসতে বলেন। শোনা যায়, নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে।
একবার আরেক কাণ্ড হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (Gora) উপন্যাসটি নিয়ে সিনেমা তৈরি হচ্ছে। দেবদত্ত ফিল্মসের প্রযোজিত এই সিনেমায় নজরুল ছিলেন সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে। অথচ সিনেমায় গানের ব্যবহার বিশ্বভারতী বোর্ডে অনুমোদন পায়নি। নজরুল প্রোজেক্টর ও ফিল্ম নিয়ে সোজা হাজির রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবীন্দ্রনাথ যেন দেখে, বিচার করে ফিল্মে গান ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই সেই অনুমতিপত্রে সই করলেন, তারপর সকলে মিলে সিনেমাটি দেখলেন। ‘গোরা’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৮ সালের ৩০ জুলাই। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বাংলা কবিতার দুই স্তম্ভ। রবীন্দ্রনাথ স্থিরভাবে তপস্বীর মতো সরস্বতীর সেবা করে গিয়েছিলেন আজীবন আর অন্যজনা মূর্তিমান ধূমকেতু। একবার শুধু কবিতায় আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের মতদ্বৈধ হয়েছিল। তারপর সময়ের স্রোত সেসব মতান্তর ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে খড়কুটোর মতো। রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পর ‘রবিহারা’ কবিতা ছাড়াও একটি গান লিখেছিলেন নজরুল— ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়ো না জাগায়ো না/ সারাজীবন যে আলো দিল, ডেকে তার ঘুম ভাঙায়ো না।’
এখন দুজনেই চিরনিদ্রায়। মহাকালের প্রহরী শুধু সতর্ক দৃষ্টি মেলে দেখছেন। যক্ষের ধনের মতো আগলে অক্ষুণ্ন রেখেছেন বাংলার দুই শ্রেষ্ঠ কবির খ্যাতি। সময় নজরুলের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের পাশে তাঁর নামও উচ্চারিত হয় পরম শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে। স্তুতি ও নিন্দার থেকে অনেক উর্দ্ধে রয়েছেন তিনি। এখন তিনি ধূমকেতু নয়, নক্ষত্র।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ ও বিভিন্ন ভারতীয় ব্যক্তিত্ব, তাপস ভৌমিক (সম্পাদনা)
রবীন্দ্রজীবনী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
সহায়ক প্রবন্ধঃ
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল, বিশ্বনাথ রায়