আপনাদের বলছি, শুনছেন?

যতদিন না আপনাদের মানসিক বিকার সেরে উঠছে, আপনারা ভয় পান

আপনাদের বলছি স্যার:
১৯ জুন ২০১২-এ পাশ হওয়া ‘দ্য প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সচুয়াল অফেন্স অ্যাক্ট’, সংক্ষেপে পকসো (POCSO) আইনে স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে- ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরিবারের সদস্য/ পুলিশ অফিসার/ শিক্ষক/ চিকিৎসক হয়, তাহলে শিশুটির প্রতি সেই যৌন অত্যাচারকে ‘অ্যাগ্রাভেটেড সেক্সচুয়াল অ্যাসল্ট’ বলে গণ্য করা হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি কমপক্ষে দশ বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে। যেহেতু আপনাদের অপরাধ এখনও প্রমাণিত নয় তাই গত দু’দিন যাবৎ ক্রমাগত ভেবেই চলেছি কেন শিশুটির বয়ান, তার অভিভাবকদের অভিযোগ এবং স্কুলের কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে এই অসাম্য থেকে যাচ্ছে, কে গোপন করছে, কী গোপন করছে, আর কেনই বা – ভাবতে ভাবতে সন্ত্রস্ত হচ্ছি যে, এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন আপনি? আপনারা? অনন্ত তেমনই তো অঙ্গীকার থাকার কথা ছিল আপনাদের। বয়সে তরুণ আপনারা, যারা শরীরচর্চা শেখাতে এসেছেন ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েগুলোকে, সেই শরীরের সঙ্গে মনও সংযুক্ত, তাদের সুস্থ রাখার দায় আপনাদের, তাদের ভালো থাকতে শেখানোর দায়িত্ব আপনাদের, শরীরে, মনে… ভালো রাখা কাকে বলে স্যার, বোঝেন নিশ্চিত? শহরের নামী স্কুলে চাকরি করেন যখন, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নিশ্চয়ই হয়ে এসেছেন। কিন্তু কী শিক্ষা আপনারা পেয়েছেন এই সমাজের কাছ থেকে যা আপনাদের এতখানি ঘৃণ্য অপরাধী করে তোলে?

না, পকসো আইন যাকে ‘শিশুদের প্রতি যৌন অত্যাচার’ বলে, তেমন অপরাধ এ রাজ্যে এই প্রথমবার নয়। আপনারা কেবল ‘লাইমলাইট’-এ এলেন। আপনাদের মুখের ওপর গোল্লা পাকিয়ে সংবাদমাধ্যম আপনাদের চিহ্নিত করল সম্ভাব্য অপরাধী হিসাবে। কিন্তু অচিহ্নিত থেকে গেল এ রাজ্যের, এ দেশের আরও অসংখ্য যৌন নির্যাতনকারী, যারা ‘পিডোফিলিয়া’ (১২ বছরের নিচের শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ) কিংবা ‘হিবেফিলিয়া’ (বয়ঃসন্ধি অর্থাৎ ১২ থেকে ১৮-এর কিশোর-কিশোরীদের ওপর যৌন আকর্ষণ)-এ আক্রান্ত। এ দেশ আঠেরো ও তদুর্ধ্ব মানুষদের প্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য করে। তাদের ভোটাধিকার দেয়। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয়, ১৮ বছরের যে মানুষটি বুথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ব্যালটে বা আইভিএম-এ নিজের মতপ্রকাশের জন্য, তিনি ন্যূনতম সংবিধান জানেন, জানেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর প্রাথমিক ধাপ, এবং সমাজ ও আইনের চোখে কোনটি অপরাধ সে সম্পর্কেও সাধারণ ধারণা তাঁর আছে। কিন্তু আদতে এমনকিচ্ছু ঘটে না। পচে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থা তাই আপনাদের মতো অপরাধীর জন্ম দেয়, আপনাদের লালন করে, শহরে-গঞ্জে-গ্রামে, এবং আপনাদেরকেই ভার দেয় অন্যকে গড়ে তোলার।

চাকরিতে নিয়োগ করানোর সময় ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ কিংবা ‘মেডিকেল টেস্ট’-এর নাম বিস্তর প্রহসন হয়। আপনাদের চোখ, পালস রেট, ব্লাড প্রেশার, ব্লাড সুগার মেপে দেখা হয়, এমনকী প্যান্ট খুলে পরীক্ষা করা হয় জননাঙ্গের বিকৃতি, অথচ এ ভিন্ন বিকৃতি যে অন্যত্রও বিদ্যমান হতে পারে, সেটা মস্তিষ্কে, তার পরখ করার দায় নেই এই সমাজব্যবস্থার। আপনাদের মতো ‘মানসিক রোগীরা’, হয় দেশের আইন ও দণ্ডবিধি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নন, অথবা চকোলেট, খেলনা, পুতুল, রংপেন্সিলের লোভ দেখান কিংবা বাচ্চাটাকে স্রেফ মেরে ফেলার হুমকি দেন, তাই ভাবেন পার পেয়ে যাবেন। ফাঁকতালে চরিতার্থ করে নেন নিজেদের বিকৃতকাম। কিন্তু ভয় তো আপনাদেরও পেতে হবে, আপনারা, যাদের মুখে গোল্লা পাকানো হল, অথবা ওনারা, যাঁরা ভয় দেখাতে সক্ষম হলেন বাচ্চাগুলোকে, ফলে তাঁদের মুখে গোল্লা পাকানো হল না – এই সক্কলকেই। কেননা নিরবচ্ছিন্ন প্রহসন সত্ত্বেও এ দেশে যাদবপুর থানার পুলিশের মতো কয়েকজন পুলিশ থাকবেন যাঁরা মধ্যরাতে ভিকটিমের পরিবারকে গাড়ি করে নিয়ে যাবেন এক থানা থেকে অন্য থানায়, থানা থেকে এসএসকেএম হাসপাতালে, এ রাজ্যে কিছু চিকিৎসক থাকবেন যাঁরা যৌন নির্যাতন ডায়াগনোসিস করে অভিভাবকদের পরামর্শ দেবেন পুলিশে অভিযোগ জানানোর, এবং কয়েকজন মা-বাবা থাকবেন বাচ্চাগুলোর কথা শুনবেন বলে, তাদের বুকে জড়িয়ে জেগে বসে থাকবেন সমস্ত রাত। অতএব স্যার, যতদিন না আপনাদের মানসিক বিকার সেরে উঠছে, আপনারা ভয় পান।

 
আপনাদের বলছি বাবা-মা:

বাহাত্তর ঘন্টা না-কাটতেই সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে পড়ল আরও কয়েকটি ঘটনা যেখানে শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার। ধরা যাক কোনও একটি শিশু আক্রান্ত হয়েছে জুন মাসে, তার অভিভাবক পুলিশে অভিযোগ জানানোর আগে স্কুলে কথা বলেছেন, স্কুল থেকে বোঝানো হয়েছে ‘হয় এমনকিছু ঘটেনি, বা ঘটে থাকলেও আমরা ভবিষ্যতে সতর্ক হব’, অতঃপর বাবা-মা বাড়ি এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাচ্চা যখন চাইছে না তখন আর স্কুলে না পাঠানোই ভালো। এ হেন পরিস্থিতিতে গত পাঁচ মাস শিশুটি ঠিক কোন মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারে আপনারা অভিভাবক হিসাবে সম্যক ওয়াকিবহাল তো? পড়াশোনা না করলে জেদি বাচ্চাকে বেয়াদপ ঠাউরে আগাপাশতলা মারধোর করাই যে দেশে দস্তুর, সেই সমাজে একজন তিন-চার-পাঁচের বাচ্চার সঙ্গে ঘটা যৌন অত্যাচারকে কতজন অভিভাবক যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শোনেন ও তার প্রতিকারের চেষ্টা করেন তাই নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ থাকে। উপরন্তু গ্রামাঞ্চলে পুরনো ক্ষতের মতো জাঁকিয়ে বসে থাকে দারিদ্র আর অশিক্ষা। সেখানে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে শিশুর যৌননিগ্রহ নিয়ে আলোচনা করা বাতুলতা ভিন্ন আর কী!

অথচ আপনারাই তো ‘প্রাইমারি সাপোর্ট গ্রুপ’। ওর কষ্ট হলে, ও পড়া না পারলে, এমনকী ওর মরে যেতে ইচ্ছে হলেও ও যদি আপনাকে এসে না বলতে পারে, তাহলে একলাটি কোথায় যাবে ও? এবং বলতে যে পারে না সে কথা তো প্রমাণিত! তাই একের পর এক ভার্চুয়াল-গেম চ্যালেঞ্জে কিশোর-কিশোরীর মৃত্যু হয়, পরীক্ষায় অসফল হলে গভীর অবসাদে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেয় কেউ কেউ। কিন্তু কেন বলতে পারে না ভেবে দেখেছেন কখনও? হ্যাঁ, আপনারা মারধর করবেন বলে, আপনারা খেতে দেবেন না বলে,আপনারা ওর ভাই-বোন-দিদি-দাদার সঙ্গে নিরন্তর তুলনা করে ওকে দুয়ো দেবেন বলে। বাচ্চা ছেলেটা বলতে পারবে না, যে ওকে ‘আদর’ করবে বলে চিলেকোঠার ঘরে নিয়ে গিয়েছিল কোলে চড়িয়ে সে ওর মেজোমামা হয়। বাচ্চা মেয়েটা বলতে পারবে না যে গায়ে হাত দিচ্ছিল সে ওরই স্কুলের ‘বিশ্বস্ত’ গাড়ি-কাকু। কেননা মা, আপনি ধমক দিয়ে বলবেন- চুপ করো, কী আজেবাজে বলছ, উনি আমার ভাই। কেননা বাবা, আপনি ওর পছন্দের স্কুল আর প্রিয় বন্ধুদের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বলবেন- আজ থেকে কার্টুন দেখা বন্ধ। আর ওই ছেলেটি কিংবা মেয়েটি, আজ থেকে বিশ-পঁচিশ-তিরিশ বছর পর একটি স্বল্পখ্যাত পত্রিকার পাতায় ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ লিখে জানাবে, সে আপনাদের কখনও ক্ষমা করতে পারেনি। এই তাহলে সুরাহা? গোটা ব্যাপারটা ভবিতব্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে ‘ভুলে যাও এসব, পড়তে বোসো’ বলাটাই রীতি? এর অন্যথা হবে না? বছর পনেরোর মেয়েটা ‘আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না’ বলে চিঠি লিখলে তাকে আপনারা নিয়ে যাবেন না মনোসমীক্ষকের কাছে? ছ’বছরের ছেলেটা দুম করে খেলাধুলো বন্ধ করে ঘরে গুম হয়ে থাকলে এই ভেবে নিশ্চিন্ত হবেন যে ‘যাক বাবা বাঁচা গেলো, আর খেলতে যাবে না’?

সন্তান উৎপাদন যতটা শারীরবৃত্তীয়, সন্তানের প্রতিপালন ঠিক ততটাই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যা একটি নিরন্তর জটিল প্রক্রিয়া। যেভাবে আপনি শিশুকে প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে রাখতে চান তার অন্নসংস্থানের জন্য, তাকে আত্মনির্ভর করে তোলার, ভবিষ্যতে পরিবার পরিকাঠামোর অঙ্গীভূত করার জন্য, সেইরকমই কোনও প্রথাগত শিক্ষা দরকার হয় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের নিজেকে অভিভাবক হিসাবে গড়ে তোলার স্বার্থে। বড্ড বেশি শিশুরা গেছে বানের জলে ভেসে… বাবা-মা, এখনও সময় আসেনি নিজেদের শুধরে নেওয়ার?

Developed by DXDasia