
হেঁড়ে গলার জি দাসকে দিয়ে গান রেকর্ড করালেন নজরুল
বাংলার নামজাদা গায়ক কে মল্লিকের বাসা ছিল বর্ধমানের কুসুম গ্রামে। সেই গ্রামের জমিদার দাস মহাশয় বেশ একজন শৌখিন মানুষ। এহেন দাস মশাই-ই দরকারে বে দরকারে তাঁরই গ্রামের সজ্জন বাসিন্দা নামজাদা গায়ক কে মল্লিককে টাকা দিয়ে সাহায্য করেই থাকেন প্রতি নিয়ত। রেকর্ড কোম্পানির নাম করা গায়ক বলে কথা। শুধু কি তাই মল্লিক সাহেব আবার বিদ্রোহী কবি নজরুলের মানে কাজী বাবুর অসম্ভব প্রিয় পাত্র। তাঁর প্রতি কাজী বাবুর এই দুর্বলতার কথা আর দশজনের মতো গ্রামের জমিদারেরও অজানা নয়। লোকে বলে জহুরি কাজী বাবু জহর চিনে নিয়েছেন। এ হেন মল্লিক বাবুর গান বিক্রি করে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েজ’ কোম্পানির ব্যাবসাও তখন তুঙ্গে।
মল্লিক বাবুর গান দিকে দিকে চললেও সে কালের বাজারে রেকর্ডে গান দিয়ে পয়সা কড়ি তেমন মিলত না। এরকম পরিস্থিতিতে কুসুম গ্রামের কে মল্লিক মনে করতেন যে তাঁর দারিদ্র্যের জীবনে জমিদার দাস মহাশয়-ই হলেন গিয়ে সাক্ষাৎ গৌরি সেন।এরকম যখন দিব্যি চলছে সেরকমইএকদিন ঝোপ বুঝে কোপ মেরে বসলেন দাস মশাই। তিনি মল্লিক সাহেবকে মুখ কাচু মাচু করে ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন ‘আসলে কি জানেন কাসেম বাবু আমার বহু দিনের একটা ইচ্ছে আছে। ইচ্ছেটা হল গিয়ে রেকর্ডে গান দেওয়া। আর আপনি হলেন গিয়ে কাজী বাবুর পেয়ারের লোক। আপনি একটু বলে দিলেই আমার একটা হিল্লে হয়ে যায় মানে….। এমন বে টক্কর আবদার শুনে কে মল্লিকের তো চক্ষু চড়ক গাছ। প্রমাদ গুনলেন। এবার বুঝি তাঁর দরকার বে দরকারে টাকা পাওয়ার দিন ফুরলো।কারণ এমন লোকের হেঁড়ে গলার গান কোম্পানিকে দেওয়ার কথা কোনও দিনই কাজী বাবুকে বলা যাবে না।
কলকাতার চিতপুরের বিষ্ণু ভবনে সেদিন গানের জগতের তারকাদের আনাগোনা। কাজী বাবু তাঁদের ট্রেনার। আর কাজী বাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট হলেন আরেক দিকপাল গায়ক ধীরেন দাস। অভিনেতা অনুপ কুমারের বাবা। কে মল্লিক তাঁকে গিয়ে জানালেন বিপদের কাহিনী। ধীরেনবাবু সব শুনে তুড়ি দিয়ে বললেন ‘এটা আবার একটা বিপদ হল ভায়া ? লোকটাকে হাজির কর একদিন ওষুধ দিয়ে দেবো। কে মল্লিক একটু আশ্বস্ত হলেন। সেই কথা অনুসারে ধীরেনবাবুর সাথে দেখা করতে পারছেন জেনেই দাস মহাশয় আহ্লাদে আট খানা হয়ে গেলেন। এবং কে মল্লিকের সাথে হাজির হলেন গ্রামোফোন কোম্পানিতে। ধীরেন বাবু লোকটাকে আদর আপ্যায়ন করে বললেন ‘মশাই রেকর্ডে গান দেওয়া কি অতই সোজা কথা। তবে একটা উপায় হতে পারে যদি কাজী বাবুকে চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় খাওয়ানো যায়, তাই হয় খাওয়ান নয় কেটে পড়ুন আর কি’।
খাওয়ানোর কথাতে রাজি হলেন দাস মশাই। কথা মতো কাজী বাবুর জন্যে বর্ধমান থেকে মিহিদানা সীতা ভোগ সবই আসতে লাগলো দফায় দফায়। কিন্তু কাজী বাবুর ডাক আসলো না। দাস মশাই জানতে চাইলেন মল্লিক বাবুর কাছে। মল্লিক মশাই বললেন ‘ আরে একটু সবুর করুন সবে তো শুরু। কলকাতার নামি দামি হোটেল থেকে ভালো ভালো খাবার পাঠান তবে তো বুঝি। বিরিয়ানিটা পোলাওটা কষা মাংসের দু চার পদ ভালো মন্দ আগে পাঠান তবে তো কাজী বাবু আপনার কথা ভাববেন। দাস মশাই বুঝলেন ঠিকই তো কেবল মাত্র মিহিদানা সীতাভোগ দিয়ে রেকর্ডে গান তোলা যাবে না। সেই অনুসারে ক মল্লিকের হাতে নিয়মিত টাকা পাঠাতে দেরী করলেন না তিনি। আর মনে মনে ভাবলেন এবার নিশ্চয়ই কাজী বাবুর ডাক পাবেন।
কিন্তু এ যাত্রাও ঘুরে গেল কয়েক মাস। মল্লিক বাবুও কিছু বলছেন না। বেশ রেগে গেলেন দাস মশাই। এবার একদিন কাউকে কিছু না বলে হাজির হলেন সোজা চিতপুরের বিষ্ণু ভবনে। দারোয়ান পথ আটকালো। দাস মশাই এতেই তেলে বেগুনে চটে উঠলেন। দরজায় দাঁড়িয়েই চিৎকার শুরু করে দিলেন কাজী বাবুকে উদ্দেশ্য করে। ‘দিনের পর দিন ভালো মন্দ যখন যা বলছেন খাইয়ে চলেছি কিন্তু আমাকে ডাকার নাম গন্ধ নেই। এটা কাজী বাবুর কেমন বিচার শুনি?’ লোক জড় হয়ে গেল। সেদিন ওখানে কে মল্লিক আর ধীরেন দাসও ছিলেন। তাঁরা বিপদ আঁচ করে কোথায় গা ঢাকা দেবেন ভাবতে লাগলেন। এসব হট্ট গোল শুনে নেমে এলেন কাজী বাবু মানে নজরুল ইসলাম। বৃত্তান্ত শুনে বুঝতে বাকি রইল না যে দাস বাবুর পাঠানো মিহিদানা সীতাভোগ পোলাও বিরিয়ানি আর কষা মাংস কাদের পেটে গিয়েছে।
পরিস্থিতি বুঝে কাজী বাবু লোকটিকে বললেন ‘তা বেশ আমি যখন এতো কিছু খেলাম তবে আসুন স্টুডিয়োতে আপনার গলাটা দেখি কেমন?’ ভদ্র লোকের গলা শুনে কাজী বাবু এও বুঝলেন যে অমন হেঁড়ে গলা দুনিয়ায় দুটো মেলা ভার। কিন্তু তাঁকে নিরাশ করলেন না। মনে মনে বেশ হাসিও পেলো।আবার কে মল্লিক বা ধীরেন বাবুর কাণ্ডে রাগও করলেন না। উল্টে খুশি মনে বসে গেলেন লোকটির গলার সাথে খাপ খায় এমন দুটি গান লিখতে। লিখলেন ঘটোৎকচের কান্না আর গাড়োয়ানি উল্লাস। গাড়োয়ানি উল্লাসে প্রকাশ পেলো হেঁড়ে গলায় গাড়োয়ান হ্যাট হ্যাট করতে করতে গরুর গাড়ি চালাচ্ছে।শুরু হল রেকর্ডিং। দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কে মল্লিক আর ধীরেন দাস। তাঁদের নির্দেশ দিলেন কাজী বাবু শেষ পর্যন্ত সব কিছু ঠিক আছে কিনা দেখে নেওয়ার। তাঁরা বাধ্য ছেলের মতো সুর সুর করে সব কাজ করতে লাগলেন।
যথা সময় প্রকাশ পেলো জি দাসের গান। তাঁর হেঁড়ে গলায় সেদিন ঘটৎকচের কান্নার আবেদন আর গাড়োয়ানের গরু তাড়ানো-র উল্লাস অন্য মাত্রা পেয়ে গেল। শুধু তাই নয় গ্রামোফোন কোম্পানির টুইন লেবেলে সেদিন জি দাসের গান সুপার হিট।
এমনই ছিল কাজী নজরুল ইসলামের শিল্পীর গলা বুঝে গান তোলানো বা গান রচনার দূরদৃষ্টি।
তথ্য সূত্র- অমল বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ HMV
