দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার গাজনের গান

চড়কের শিবের সঙ্গে গাজনের পালাগুলির যোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবার, জয়নগর, কাকদ্বীপ, কুলপি প্রভৃতি থানার অন্তর্গত বহু এলাকায় চৈত্রমাসের সংক্রান্তিতে চড়কোৎসব উপলক্ষ্যে পূজা আয়োজকের বাড়িবাড়ি রাতেরবেলা গানবাজনা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকায় এই লোকাঙ্গিকের নাম ‘গাজন গান’। কোথাও কোথাও একে ‘চৈতেগাব’ও বলে। চৈত্রমাসে অনুষ্ঠিত ‘গাঁ’-জনের উৎসব তাই ‘চৈতেগাব’। স্থানীয় মানুষেরা কাজের অবসরে ছোট ছোট দল গঠন করে এই গান পরিবেশন করে থাকেন।

এই সময় সাধারণত যে সব পালা পরিবেশিত হয় তা সবই পৌরাণিক, হর-কালীকে নিয়ে রচিত। চড়কের শিবের সঙ্গে এই সব পালাগুলির যোগ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আজও কাকদ্বীপ থানার কামারের হাটের জোড়াপোল এলাকায় প্রতি বছর চৈত্র মাসে এই উৎসব উপলক্ষে ২৭, ২৮ এবং ২৯ তারিখে গাজনদলগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতার আসর বসে। গাজনের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে পুঁজিপতিরা নিজস্ব দলগঠন করে বছরচুক্তি কুশীলব এবং অন্যান্য লোকজন রেখে বিভিন্ন আসরে পালার মঞ্চায়ন করে থাকেন।

তবে এইসব এলাকার গাজন গানের জনপ্রিয়তা যত না ধর্মমূলকবিষয় কেন্দ্রিক তার চেয়ে বেশি সামাজিক নানান অসংগতিমূলক কাহিনী আদিরসের সংমিশ্রণে রঙ্গরসিকতার মাধ্যমে আসরে পরিবেশন করার কারণে। যদিও এখানকার গাজন গানের মূল উৎস চৈত্রমাসের চড়কোৎসবের সেই শিব, কিন্তু বর্তমানে সেই সময় এবং বিষয়টিকে অতিক্রম করে গাজন গান অনেকখানি বিশ্বায়নে সামিল হয়েছে। তাই এই অঞ্চলের হাল আমলের প্রায় ২৫-৩০খানা গাজনের দল তারা নিজেরা চিৎপুরের অপেরাপার্টির মত দল গঠন করে দুর্গাপূজার ‘ষষ্ঠী টু জ্যৈষ্ঠি’ পর্যন্ত নিজেদের এলাকার বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গান পরিবেশন করেন। যাত্রাপার্টির মত সুউন্নত মঞ্চ ও আলোক সজ্জা, জমকালো পোশাক, দেশি বিদেশি নানান যন্ত্রানুসঙ্গের সঙ্গে এরা বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক ছোটছোট পালাবদ্ধ কাহিনী আসরে অভিনয় করে বটে কিন্তু এদের পালায় সংলাপের চেয়ে আগাগোড়া ছেয়ে থাকে গান। একমাত্র পৌরাণিক পালা ছাড়া অন্যান্য গানের ভাষা সবই প্রায় আদি রসাত্মক এবং সুরগুলি সাম্প্রতিককালের বাংলা অথবা হিন্দি সিনেমার গানের আদলে তৈরি। তবে এই আদিরসের গানের মধ্যেও আবার অনেক সময় সমাজের কোনো গভীরতর সত্যের নির্দেশ থাকে। ব্যাঙ্গাত্বমূলক রসিকতার মধ্যেও কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে গভীরতর কোনো সত্য। যেমন এই ধরণের একটি গানে পাই:

কর্ম কর ফলের চিন্তা করনা ইনশান।
যেমন কর্ম তেমনি ফল দেবে খোদা ভগবান।।
এ যে গীতার কিখন, এ যে গীতার লিখন।
দুদিন এলি এই ভবে, দুদিন পরে যেতে হবে,
খামারবাড়ি খামারজমি, সময় হলে যাবে ছাড়ি,
হরে কৃষ্ণ হরে বলে, নিদান কাল আসবে যবে,
শেষের দিনে সেজন বিনে নাইরে পরিত্রাণ।
যেমন কর্ম… খোদা ভগবান।।

গীতায় বলা হয়েছে, 'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন' (শ্রীমদ্ভগবতগীতা, ২:৪৭)। এখানে উল্লেখিত গাজনগানের অংশটি যেন স্পষ্টতই তারই নির্দেশক।

গাজনের পালাগুলি সবই পূর্ব রচিত। রচয়িতারা এখানে ‘গাজনমাস্টার’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। জয়নগর থানার বাপুলিরচক এলাকার এইরকমই একজন পেশাদার ‘গাজনমাস্টার’ শ্রীস্বপন গায়েন এবং এখানকার ‘সরস্বতী গাজন সংস্থার’ দল পরিচালক শ্রীসুনীল হালদারের মুখে শোনা, কোনো আসরে গাজনগান পরিবেশনের জন্যে একটা দলকে এক মরসুমে বিভিন্ন বিষয়ধর্মী একাধিক পালা প্রস্তুত রাখতে হয়। প্রতি বছর উল্টো রথের দিন শুরু হয় নতুন পালার শুভারম্ভ ও কুশীলব বাছাইয়ের পর্ব এবং সেই সঙ্গে তাদের আগত সম্বৎসরের লেনদেনের হিসাব। তারপর সারা বর্ষাকাল জুড়ে চলে পালাগুলির মক্স বা রিহার্সাল। কুশীলবরা আউস ধানের চাষবাস কিংবা দৈনন্দিন নানান কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যাবেলা হাজির হন ‘রিহার্সাল রুমে’। সেখানে অধিক রাত পর্যন্ত চলে পালাগুলির মহড়া।

ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিষয় নিয়ে রচিত ছোট বড় পালা মিলিয়ে অভিনীত একেকটি গাজন আসরের সময়সীমা সাধারণত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা হয়ে থাকে। গাজন আসরের শুরু এবং শেষের পালা দুটি হয় ধর্মমূলক বা পৌরাণিক। সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিষয়নির্ভর কাহিনিগুলিতে সমাজের নানান অসংগতি হাস্যকর ভাঁড়ামির দ্বারা ‘লোক বুঝাইতে’ তুলে ধরা হয়।

‘গাজন গানে’র একটি ধর্মমূলক কাহিনির মঞ্চায়ন। তবে এই একবিংশশতকের যুগেও পাড়াগাঁয়ের অন্যান্য বহু লোকনাটকের মত এই এলাকার গাজনগানেও নারীচরিত্রে সেই পুরুষদেরই আধিপত্য। দলে এই ধরণের নারীবেশধারী পুরুষ অভিনেতাদের ‘ফিমেল চরিত্র’ বলে। নারী চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে দর্শকদের কাছ থেকে কেউকেউ ‘গাজন লক্ষ্মী’ ‘গাজন প্রিয়া’ ইত্যাদি খেতাব লাভ করেন। আসলে আমার নিজেরই একাধিক গাজনগানের আসরে উপস্থিত থেকে মনে হয়েছে, এতে আদিরস এবং মোটা দাগের রসিকতা এত বেশি যে কোনো স্বাভাবিক লাজুক স্বভাবা মহিলার দ্বারা পুরুষের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অভিনয়ের সাবলীলতা আনা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ একটি ‘গাজন পালা’র কিয়দংশ দ্রষ্টব্য:

বাবা:      রামের হাতে রামের বোতল সীতা খায় বোতকা-
বৌমা:     চারশ’ চল্লিশ ভোল্টে মেরে দেব ঝটকা।
চাকর:     করব এবার বস্ত্র হরণ। কলির কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে, সাথে দুঃশাসন।
ছেলে:      চোর বদনাম দিয়ে তোর থানায় করব ডায়েরি-
বাবা:      জিলাপি বাদ দিয়ে তুই চমচম খা মায়রি।
বৌমা:     চাকরের এ কী কথা?
বাবা:      আমি তোর ভাতারের জন্মদাতা,…

হয়ত সেই কারণে আজও গাজনগানে সমাজের মহিলারা ব্রাত্য হয়ে আছে এবং এইখানেই গাজনগান বাংলায় লোকনাটকের ধারা বজায় রেখেছে। বিলিতি যাত্রা বা স্বদেশী থিয়েটারের আদলে আজও ‘গাজন সংস্থা’গুলি নারী চরিত্রে নারীদের প্রবেশাধিকার বরদাস্ত করেনি।

কিন্তু সে যাইহোক, তীব্র ব্যঙ্গ, তির্যক রসিকতার মাধ্যমে পালা পরিবেশন করে সমাজকে শুধরনোর যে দায়ভার এই অঞ্চলের গাজনশিল্পীরা নিয়েছেন তা এক অর্থে সমাজ হিতৈষণামূলক কাজের নামন্তর বলা যেতে পারে। এবং কোনোকালে যদি কোনো স্বার্থপর মানুষ তার প্রতিবেশী বা নিকট আত্মীয়ের অমঙ্গল কামনা না করে তাকে ভালবাসতে শেখে, আধুনিক শিক্ষার ভুল পথকে বর্জনীয় বলে মনে করে যদি কারও পুত্রবধূ আপন বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে পিতৃ-মাতৃজ্ঞানে সেবা করতে শেখে, পরস্ত্রী লোলুপতা নিন্দনীয় বলে যদি কোনো কামুক ব্যক্তি নিজেকে সংবরণ করে নেয়, প্রত্যেক জাতির মত বাঙালিরও নিজস্ব কিছু সংস্কার, রীতি-নীতি, আচার-আচারণ আছে এই বিশ্বাসে যদি এই জাতি আপন সংস্কৃতিকে ঘৃণা না করতে শেখে, তবে বুঝতে হবে সমাজের এইসব শুভপ্রদ কাজের জন্যে এই গজনের নিশ্চয় কিছু ভূমিকা আছে।

(দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গাজন গান – ফোক থিয়েটারের একটি সার্ভে। ঋণ – সাহাপিডিয়া ডট ওআরজি)

Developed by DXDasia