নৃত্যশিল্পের স্বাধীনতা


দুর্গাপুজো গিয়ে কালীপুজো আসার এই মধ্যবর্তী সময়টায় কলকাতা বড় মনোরম হয়ে ওঠে। সকালে নরম ঠান্ডায় ঘুম ভাঙতে দেরি হয়, ঘাসে ঘাসে হিমের পরশ, বাজারে নানা রকম শাকসবজি। এরপর যখন ভারী শীত পড়ে যাবে তখন ঠিক এই মজাটা থাকবে না। সাধে কী আর জীবনানন্দ হেমন্তের এমন গুণ গেয়েছেন! এই সময় থেকে কলকাতায় বিভিন্ন রকমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শুরু হয় প্রতি বছর। অতিমারীতে অনেক কিছুই লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল কিন্তু কলকাতা আবার নিজের ছন্দে ফিরেছে। এইবার রবীন্দ্রসদন-নন্দন চত্বরের পাশাপাশি সারা শহরের মঞ্চগুলোই নাচ-গান-নাটক তথা নানা প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গমগম করবে। নাচের অনুষ্ঠান কী কী হবে? নানা রকমই হবে কিন্তু বেশিরভাগই রাষ্ট্রের আনুকূল্যে। আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক জগতের এ বড়ো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। রাষ্ট্রের দয়াদাক্ষিণ্য ছাড়া সংস্কৃতি এখানে এক পাও এগোতে পারে না। সেই যে রাজা-মহারাজাদের সভা কিংবা জমিদারদের আনুকূল্যের সেই যুগ থেকে সাংস্কৃতিক জগৎ বিশেষত নৃত্যশিল্প খুব বেশি দূর এগিয়ে আসতে পারেনি। নৃত্যকে স্বাধীনশিল্প হিসেবে গড়ে তোলা ওই জন্যই আজও অসম্ভব। এতে অবশ্য রাষ্ট্রের দোষ নেই। রাষ্ট্র প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, সঙ্গে চিন্তার পরাধীনতা। তাকে যদি থালা সাজিয়ে এসব পরিবেশন করা হয় তাহলে তো তার ভালো লাগারই কথা।

সকল শিল্পের মতোই নৃত্যশিল্পকেও অতীতে এক সময় কোনও রাজা-স্থানীয় কেউ কিংবা পরে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকতে হয়েছে। আর নৃত্যশিল্প যেহেতু একটা দৃশ্যমাধ্যম প্রধানত, তাই এই ‘দেখতে সুন্দর লাগছে’-র বোধ তাকে আরও গভীর শিল্প হয়ে উঠতে বাঁধা দিয়েছে। যেমন কবি-লেখক-গায়ক, এঁরা শিল্পকে ব্যক্তিগত স্তরে রাখতে চাইলে পারেন, কিন্তু নৃত্যশিল্প, নাট্যশিল্প এবং সিনেমাশিল্পের মতো একটা দর্শকের প্রয়োজন হয়। সে দর্শক সাহিত্য পাঠকের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। তার অর্থেই নৃত্য, নাট্য বা সিনেমা চলতে পারে। এবার নাট্য আর সিনেমা- এই দুই মাধ্যমই নিজের অর্থ নিজেই যোগাড় করে নিয়েছে। নিজেদের মতো করে অর্থনীতি তৈরি করেছে যা তাদের স্বাধীন চলাফেরায় সুবিধা দিয়েছে কিন্তু নৃত্য পারেনি। নাটকের তুলনামূলক রাষ্ট্রের আনুকূল্য চাইলে আজ অনেক কম প্রয়োজন পড়তে পারে। সিনেমা তো বিভিন্ন প্রযোজক নিজের মতো করে গড়ে তুলেইছে। কিন্তু অন্তত ভারতবর্ষে নৃত্যশিল্প সে-কাজ পারেনি। আজও নৃত্যশিল্পীরা কেন্দ্রীয় অর্থানুকূল্যের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে বসে থাকে, তাদের তৈরি করে দেওয়া প্রেক্ষাগৃহে ‘ভর্তুকি’ পেয়ে নৃত্যানুষ্ঠান করে আর সরকারি অনুষ্ঠান কবে কোথায় হবে সে খোঁজে হন্যে হয়ে ঘোরে। মাত্র একটা সুযোগের জন্য! এর পাশাপাশি আরেকটা জিনিস নৃত্যশিল্পে বিশেষত কলকাতায় তৈরি হয়েছে সে হল ‘ফ্যালো কড়ি মাখো তেল’-এর ব্যবসা। মানে পে অ্যান্ড পারফর্ম। তুমি আমাকে টাকা দাও আমি তোমাকে একটা স্টেজ, একটা পোস্টারে নিচের দিকে একটা কুট্টি ছবি, একটা আট-দশ মিনিটের স্লট আর তথাকথিত সিনিয়র শিল্পীদের দিয়ে একটা সার্টিফিকেট দেওয়ানোর ব্যবস্থা করে দেব। এটা রাষ্ট্রের আনুকূল্যের থেকে আরও মারাত্মক এক ব্যাপার। এ জিনিস নৃত্যশিল্পের কর্কটরোগ। ভেতরে ভেতরে পুরো সংস্কৃতিটাকে খেয়ে ফেলছে। কিছু ব্যবসায়ী মনোবৃত্তির ছেলেমেয়ে যাদের নৃত্যের সঙ্গে প্রায় কোনও যোগাযোগ নেই বললেই চলে, নৃত্যশিল্পী এরা নয়- হয় ফটোগ্রাফার বা গায়ক বা আবৃত্তিকার- এরা একেকটি অনুষ্ঠান করে বিপুল সংখ্যক ছেলেমেয়েদের থেকে টাকা নিয়ে তার লভ্যাংশ নিজেদের পকেটবন্দি করে চম্পট দেয়। এরা প্রতি মাসেই একটা করে শো করে। কিন্তু এই বাঁটপারিতে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের যাঁরা অভিভাবক তাঁরা সাড়া দেন কেন? তারও ফন্দি ফাঁদা আছে। এইসব অনুষ্ঠানে তথাকথিত সিনিয়র শিল্পীদের দিয়ে উদ্বোধন করানো হয়। ওঁরাও আগুপিছু না ভেবে একটা উত্তরীয় আর মিষ্টির প্যাকেট আর কিছুক্ষণ মাইক্রোফোনে নিজেদের বড়াই করবেন আর তার ছবি-ভিডিও উঠবে- এইসবের লোভে চলেও আসেন। একবার ভাবেন না এখানে প্রতিভার জুয়াখেলা চলছে। আমি এঁদের মনস্তত্ত্বটা যখনই বোঝার চেষ্টা করেছি একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে যে নৃত্যশিল্পে যে কোনওরকম সুযোগই আজ খুব কম। হয় সরকারি অনুষ্ঠান আর না হয় পে অ্যান্ড পারফর্ম।

রাষ্ট্র পরিচালিত অনুষ্ঠানগুলিতেও যারা কর্তৃত্বে বসে আছে মাটিতে শিকড় গজিয়ে গেছে তাও গদি ছাড়তে মায়া। ওই ধরনের সব অনুষ্ঠানেই ওই এক মুখ সব। হয় নিজের ছাত্রছাত্রী আর না হয় অপরের চেনা কেউ। এছাড়া ওইসব অনুষ্ঠানে আর কারও মুখ দেখা যায় না। গ্রামে, মফস্সলে, অন্য শহরে ভালো নৃত্যশিল্পী কেউ উঠে আসছে কী না তার কোনও হদিশ এখানে বা এদের কাছে নেই। খুঁজে বের করার চেষ্টাও নেই। আর এদের এই পাহাড়প্রমাণ অজ্ঞানতা, মানসিক স্থবিরতা আর গদি না ছাড়ার দম্ভই পে অ্যান্ড পারফর্মওয়ালাদের পোয়াবারো করে রেখেছে। আজ যদি টাকা না থাকে তবে একজন সম্ভাবনাময় নৃত্যশিল্পীর কোথাওই কোনও গতি নেই এ বাংলায়! একটা নিরপেক্ষ দাঁড়াবার জায়গা নেই কোথাও। হয় নিজেকে টাকা দিতে হবে না হয় রাষ্ট্রের মুখ চেয়ে বসে থাকতে হবে। প্রতিভার আর দাম নেই কোনও। কী সাংঘাতিক দমবন্ধ-করা পরিবেশ!

তাহলে উপায় কী? আমি কোনও বিশারদ নই। ঐতিহাসিকও নই। আর অনেক সমস্যা থাকে যার সমাধান এত সহজ ও সোজা নয়। তবে একটা কথা মনে হয়: আমি একটি ফিল্ম-সোসাইটির সঙ্গে এই সেদিনও যুক্ত ছিলাম। আমরা রাজনৈতিক ডক্যুছবি প্রতি মাসে এবং বছরে দু-বার দিন তিনেকের উৎসব করে মানুষকে দেখাতাম আর মতামত বিনিময় করতাম। আমরা কার্যত কোনও সরকারি, বেসরকারি এবং কর্পোরেটের অর্থ সাহায্য নিতাম না। গ্রহণই করতাম না। তাহলে চলত কী করে এত বড়ো আয়োজন? কেন যাঁরা ছবি দেখতে আসতেন তাঁদের থেকে অর্থ সাহায্য চাইতাম। দর্শকরা খুশি মনে দিতেন। মানুষ মানুষের জন্য, একটা বৃহৎ আয়োজনের জন্য পাশে এসে দাঁড়াতেন। নৃত্য আয়োজকরাও কি তা করতে পারেন না? ছাত্রছাত্রী, প্রতিযোগী বা শিল্পীদের থেকে কোনও টাকা নিলাম না কিন্তু দর্শকের কাছ থেকে অর্থ আহ্বান করলাম? আবার আমরাও যেখানে দর্শক হয়ে গেলাম সেখানে সেই আয়োজনের সঙ্গে মিশে গেলাম? হতে পারে না এমন? এভাবেই তো শিল্পের স্বাধীনতা আসতে পারে। তাহলে তো নৃত্যশিল্পকে রাষ্ট্র বা আর কোনও শাসনযন্ত্রের তাঁবে থাকতে হয় না। আর রাষ্ট্রকে খুশি করতে শাস্ত্রীয়ের নামে বস্তাপচা ঠাকুর-দেবতার স্ক্রিপ্ট লিখে নাচের স্কুলের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামও করতে হয় না।

_____
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।

Written by