
সুঠাম দীর্ঘদেহী সেই মানুষটির চুলদাড়িতে তখনও পাক ধরেনি। তাঁকে স্বাগত জানাতে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি পুষ্পস্তবক হাতে উপস্থিত
কথাটা এখনও আমার কানে বাজছে। মাঝখানে চার দশক পার হয়ে গেছে কিন্তু একজন প্রবীণ বিধবার সেই বিস্ময় মিশ্রিত উক্তি আজও ভুলতে পারিনি। জলপাই রংয়ের সামরিক পোশাক পরে এক রাষ্ট্রনায়ক বিমানের সিড়ি বেয়ে নেমে আসছেন। সুঠাম দীর্ঘদেহী সেই মানুষটির চুলদাড়িতে তখনও পাক ধরেনি। তাঁকে স্বাগত জানাতে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি পুষ্পস্তবক হাতে উপস্থিত। নিরাপত্তা বেষ্টনির বাইরে কিছু লোকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁকে দেখার জন্য। সিড়ি বেয়ে নামতে নামতেই তিনি যখন সহাস্য মুখে হাত নাড়লেন তখনই বাঙালটানে এক বৃদ্ধার আনন্দিত উচ্চারণঃ ‘গরান গাছের জুয়ান!’
সেটা ১৯৭৩ সাল। তখন ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছি। সে সময় খবর এল পরের দিন ফিদেল কাস্ত্রো দমদম বিমান বন্দরে আসছেন। আমার উপর সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল না। তবুও আমি বাগুইহাটির বাড়ি থেকে যথাসময়ে বিমান বন্দরে হাজির হলাম শুধু মাত্র কাস্ত্রোকে চোখে দেখব বলে। তখন দমদম বিমান বন্দর আজকের মত সুসজ্জিত ছিল না। নামের সঙ্গেও তখন ইন্দিরা গান্ধী বা নেতাজি সুভাষচন্দ্রের স্মৃতি চিহ্ন যুক্ত হয়নি। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আজকের মত এমন টান টান ছিল না।
কাস্ত্রোকে স্বাগত জানতে খুব স্বাভাবিক কারণে রাজ্যের প্রায় সব বামনেতা উপস্থিত ছিলেন। তবে সরকারি ভাবে কাস্ত্রোকে অভ্যর্থনা জানানোর দায়িত্ব ছিল রাজ্যের মন্ত্রী তরুণকান্তি ঘোষের উপর। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ রায় কেন সেই কাজটি করেননি সেই কথা এখন আর মনে পড়ছে না। তবে কংগ্রেসের জয়নাল আবেদিন, সৌগত রায় এমন অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তার কিছু দিন পরে বাগবাজার আর বারাসাত এলাকায় এক দেওয়াল লিখন চোখে পড়েঃ ‘বিপ্লবী বাংলার ফিদেল কাস্ত্রো/ তরুণকান্তি যুগ যুগ জিয়ো।’
আমার প্রজন্মের অনেকেই কাস্ত্রো- গুয়েভারাকে চিনেছেন সৌরীণ সেনের ‘আখের স্বাদ নোনতা’ পড়ে। কিন্তু সেদিন কী দেখেছিলাম ফিদেলের চোখে মুখে? তখনই তাঁকে আশিবার হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। পরে সেই সংখ্যা নাকি ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কাস্ত্রো’র শরীরী ভাস্কর্যে কোন বিষণ্ণতার ছোঁয়া নেই। কপাল জুড়ে দুশ্চিন্তার রেখা নেই। সেই নির্মাণ তাঁর দেশবাসীকে এবং সারা দুনিয়াকে জানান দিচ্ছে কাস্ত্রো প্রাণবন্ত, কাস্ত্রো সুঠাম সৈনিক, কাস্ত্রো আর্তের আন্তরিক সেবক এবং শত্রুর ক্ষমাহীন ঘাতক।
কিন্তু কাস্ত্রো যে রসবোধে টৈটুম্বুর তার প্রমাণও তিনি রাখলেন দমদম বিমান বন্দরে। একের পর এক বামনেতারা যখন নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন তখন কেরিবিয়ানের জলতরঙ্গের মত উচ্ছ্বল হাসিতে আকাশ কাঁপিয়ে তিনি জানতে চাইলেনঃ ‘এতগুলো সমাজতান্ত্রিক দল? তাহলে বিপ্লবটা করবে কে?’
কিউবার সঙ্গে কলকাতার নাড়ির যোগটা তৈরি করেছিলেন চে গুয়েভারা ষাটের দশকের গোড়ায়। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটে তাঁর মনোজ্ঞ ভাষণ নজর কেড়েছিল। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা এসেছিলেন চিলির নিহত রাষ্ট্রপ্রধান সালভাদর আলেন্দের মেয়ে বিয়েত্রিস। পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশ গিয়ানার বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভব ডঃ ছেদি জগন মনুমেন্ট ময়দানে ভাষণ দিয়েছিলেন।
কিন্তু কাস্ত্রো’র কলকাতা পদর্পনের মেজাজ ভিন্ন। তখন রাজ্যে বামপন্থীদের দুর্বলদশা। বিমানবন্দরকে তারা জন সমুদ্রে পরিণত করতে পারেনি। হয়তো জেসপ- গ্রামোফোন কারখানার মজুর আর মতিলাল কলোনি বা পটুয়াখালির মত বাঙাল পাড়া থেকেই কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিল সেদিন।
কাস্ত্রোর দীর্ঘদেহ আজ শেষ সজ্জায় শায়িত। কিন্তু কাস্ত্রো সম্পর্কে সেটাই শেষ সত্য নয়। একুশ শতকেও তিনি প্রতিবাদের ধ্রুবতারা হয়েই থাকবেন। হয়তো তেমন বিশ্বাস নিয়েই সেদিন বিমান বন্দরে সেই বাঙাল বৃদ্ধা এমন সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেনঃ ‘গরান গাছের মত জোয়ান!’
আগামীকাল ফিদেল কাস্ত্রোর শেষকৃত্য। তিনি আজীবন বিতর্কিত কিন্তু নিজের বিশ্বাসে স্থির। বঙ্গদর্শনের তরফ থেকে এই আপসহীন যোদ্ধাকে আমাদের চিরপ্রণাম।
