প্রতিবাদের হাতিয়ার আত্মনিগ্রহও

এখনও ৭৯.৪% নারীকে হেলথ্‌ সেন্টারে যেতে দরকার হয় পুরুষের অনুমতি

প্রেসিডেন্সির মেয়েটির রক্তাক্ত এবং প্রবল 'শরীরী' ছবিটির সঙ্গে সঙ্গে অধুনা প্রবল আলোচিত ঋতুকালীন ছুটির প্রস্তাব আবার 'বিবেক'বানদের মর্মপীড়ার কারণ হয়ে উঠেছে। শরশয্যায় চিতপাত করে শুইয়ে নারীবাদের ওপর ফেলা হচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের জোরালো আলো, আর থেকে থেকে ফুকারি উঠছে যে সব প্রশ্ন, তার মধ্যে প্রধান হল- নারীবাদ কি আদ্যন্ত এক শহুরে উদ্ধতপনা ? সৌখিন এক 'ইজম' ? যাকে ডাকা যায় 'অনলাইন সিস্টারহুড' এই ফিচেল নামে ? কারণ বাস্তবে নারীবাদ বিচ্যুত সেইসব প্রবল সংখ্যাগুরু গরীব গেঁয়ো বোনেদের থেকে যাদের ঋতুকালীন ছুটি তো দূরস্থান, সেই রক্তক্ষরণ ঢাকতে স্যানিটারি ন্যাপকিনও জোটে না। তাদের ভরসা সেই ঠাকুমাকালের ত্যানা, ছেঁড়া ন্যাকড়া। আর যাদের পরনের শাড়িটি ছাড়া কিচ্ছু নেই, তাদের রক্তাক্ত নিম্নাঙ্গ ঢাকবার জন্য খুঁজে নিলেই হল ঘরের বন্দীদশা। ছেঁড়া কাঁথাও যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য শোওয়ার ব্যবস্থা চওড়া কলাপাতায়।

মুশকিল এই যে, পরস্পরবিরোধী মানসিকতায় শহুরে নারীও কিছু কম যায় না। ঐ ছুটির যৌক্তিকতাই শুধু নয়, রজঃস্বলা ছাত্রীর ছবিটিও তাদের বেশিরভাগকেই বড় বিচলিত করেছে। সংস্কারী মানসিকতায় এখনও ছোট পোশাক, পাব-গমন এবং লিভ-ইন – ধর্ষণের পক্ষে যথেষ্ট কার্যকরী কারণ। সুজেট জর্ডন বা দিল্লীর পল্লবীর কেস এখনো এই দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনায় উঠে আসে।

খুব কম মানুষই ভাবতে পারেন যে দেশেবিদেশে আত্মনিগ্রহ প্রতিবাদের একটি নজরকাড়া হাতিয়ার, যার সফল প্রয়োগ মহাত্মা গান্ধী থেকে মেধা পাটেকর করে চলেছেন। আর এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেন্ডিং মেশিন যদি এতো নিকৃষ্টমানের প্যাড দিতেই থাকে যে তা ব্যবহার করাও যা, না করাও তাই, তাহলে যা হবার তাইই হয়েছে। মেয়েটি দাগী পোশাক পরে জনসমক্ষে এসেছে। সে স্ব-ইচ্ছায় আত্মনিগ্রহের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তার প্রতিবাদের আর একটি উদ্দেশ্য ইতমধ্যেই সফল। ঋতু নিয়ে সামাজিক ট্যাবু কাটিয়ে উঠে চারদিকে তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। হোক তার বেশিটাই ছিছিক্কার। এটা করতে ছাত্রীটির যে মানসিক শক্তির পরিচয় দিতে হয়েছে তা সত্যি বাহবাযোগ্য।

কিন্তু ২০১২ সালের মানবোন্নয়ন সূচকে মোট ভারতীয় নারীর যে ৭৯.৪ শতাংশকে কাছের হেলথ সেন্টারে যেতে গেলেও পুরুষ অভিভাবকের অনুমতির দরকার হয়, তাদের এই দুই 'জ্বলন্ত' সমস্যার একটি নিয়েও মাথাব্যথা না থাকবারই কথা। আশু সমাধান জরুরি এরকম সমস্যা তাদের ঢের –বাল্যবিবাহ, পিতৃতান্ত্রিকতা, পণপ্রথা, গার্হস্থ্য হিংসা, এমনকি শৌচাগার সমস্যাও। তারা ভালোই জানে ঋতুকালে শরীরের অবস্থা যাইই হোক না কেন, তার ছুটি পাবার নিয়ম হবে নেহাতই বেনিয়ম। আর ফ্রক বা শাড়িতে রক্তের দাগ পুংলিঙ্গের সম্মানহানি করে, যার ফলে অজস্র টিটকিরি ও নির্যাতন ধেয়ে আসতে পারে তার সাময়িক ভঙ্গুর শরীরটির দিকে।

তবে কি এসবই সর্বার্থে অপচয়? লিঙ্গচেতনার উথালপাতাল সমুদ্র-ইতিহাসে কেবল ছোট ছোট ঢেউয়ের ওঠাপড়া ? শ্রেণীচেতনাহীন সুবিধের বুদবুদ ? সার্বিক পরিবর্তন ঝোড়ো হাওয়া, চুইয়ে পড়া কৃপাকণা নয়, একথা মনে রেখেও বলা যায় যে কোনও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নীরবতা সেই বৈষম্যকেই তীব্রতর করে। অনলাইন প্রতিবাদ আরো জোরদার হোক, যেন গুরমেহর কাউরের মতো কাউকে অন্যায়ভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া না যায়। সাইবার হিংসার আইনসম্মত শাস্তি বলবৎ হোক। প্রযুক্তি হোক জনমত গঠনের হাতিয়ার। সরকারি প্রজেক্টে স্বনির্ভর দলের মেয়েদের দিয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করানোও আর এক 'কন্যাশ্রী প্রকল্প'। দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মহিলাদের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। "গুঞ্জে"র মতো এন জি ও বা অরুণাচলম মুরুগানের মতো ব্যক্তি-উদ্যোগ সব ধরণের সাহায্য পাবার অধিকারী। এই ছাত্রীর প্রতিবাদে যদি স্কুল কলেজের কর্তৃপক্ষ ভেন্ডিং মেশিন বসাবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতন হন, সেটাও হবে একধরণের অর্জন।

উনবিংশ শতক থেকে শুরু যত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন যেমন সতীদাহ এবং বিধবাবিবাহ বিরোধী আন্দোলন, তার শুরু হয়েছিল শহরে। রাজা রামমোহন বা বিদ্যাসাগর মশাইয়ের আন্দোলনকেও তাহলে শহুরে ও সৌখিন তকমায় চিহ্নিত করতে হয়। আসলে, উৎসের চেয়েও বড় কথা সে প্রভাব কীভাবে ও কতদূর কার্যকর হলো।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নিখুঁত নারীবাদ আকাশ ফুঁড়ে পড়বে না এতো জানা কথাই। নারীবাদ যাতে শহুরে কৃত্রিমতা, স্বার্থপরতা ও সুবিধেভোগীর তকমামুক্ত হয় তার জন্যও আরও একরকম সচেতনতা ও আন্দোলনমুখিনতা গড়ে তুলতে হবে নারীবাদের প্রবক্তা ও সমর্থকদের মধ্যে।

স্মরণে থাকুক একসময় নারীর ভোটাধিকার নিয়ে কম সমালোচনা, বিরোধিতা হয়নি। সেসব পেরিয়ে এসে আজ সে অধিকার কিন্তু সব নারীর করায়ত্ত।

অলংকরণ- পার্থ দাশগুপ্ত

Developed by DXDasia