তীর্থক্ষেত্রে কিছুটা সময়

টানা বারান্দার প্রবেশের পর সেই ঘর যেখানে নেতাজী বাস করেছেন। কোন অজান্তেই দুই চোখ বুজে প্রণাম করলাম

সুপর্ণা ঘোষ
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু – নামেই এক অপার শ্রদ্ধা, নামেই এক প্রাণ গর্ব আমাদের। তাঁর জন্য অহঙ্কারেরও শেষ নেই আপামর বাঙালির। আর যেখানেই তাঁর পদার্পণ হয়েছে সেই জায়গা তো তীর্থক্ষেত্র আমাদের কাছে! বাংলার এমনই এক জায়গায় এই কিছুদিন আগে পৌঁছে গেছিলাম। জায়গার নাম কোদালিয়া, কলকাতা থেকে খুব কাছেই, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায়। বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই গায়ে কাঁটা দিল। এই পৈতৃক বাড়িতে এসে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু দু-বার থেকেছেন। কম কথা নাকি? সে বাড়ির ইতিহাস বলতে শুরু করলে শেষ হবে না তাই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে না গিয়ে বাস্তবটুকু নিয়ে এগোই।

দোতলা বাড়ির একতলার এক কোণে এক ভদ্রলোককে রান্না করতে দেখে গেলাম তাঁর কাছে। জানলাম তিনি এই বাড়ির কেয়ারটেকার। ভগ্নদশা বাড়িতে তেমন কাউকেই আর প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না –মন্দির কিন্তু তীর্থ-মন্দির দর্শন না করে চলে যাওয়ার তো কোনও মানেই নেই, নিজের পরিচয় দিয়ে আবার অনুরোধ করলাম। এক্ষেত্রে আমি বারবার অনুনয়-বিনয় করতেও প্রস্তুত। অবশেষে প্রধান দরজার তালা খুলে দিলেন তিনি। প্রবেশমাত্র গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আবার, এই বাড়িতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু থেকেছেন কিছুদিন! সিঁড়ি দিয়ে খুব সাবধানে উপরে উঠলাম। ভারী অদ্ভুত এক দরজা প্রবেশের মুখে, দেখতে কেমন হেলে পইড়া! এটাই বৈশিষ্ট্য এই দরজার, হেলানো। না, আমি তো আগে কখনও দেখিনি এইরকম দরজা। টানা বারান্দার প্রবেশের পর সেই ঘর যেখানে নেতাজী বাস করেছেন। কোন অজান্তেই দুই চোখ বুজে প্রণাম করলাম। শিহরিত মনে স্পর্শ করলাম ঘরের দরজা – ভাবলাম, নিশ্চয় এইখানে হাত রেখেছিলেন নেতাজী! মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু চেয়ে দেখা আর স্মরণ করা সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যাঁরা দেশ শ্বাধীন করার জন্য একসময় হাসতে হাসতে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন। আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই তাঁদের প্রতি। কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলাম, কেয়ারটেকার স্যারের কথায় বাস্তবে ফিরলাম – ‘না না, একদম ঘরে ঢুকবেন না, বহুদিন কোনও রক্ষণাবেক্ষণ নেই, যে-কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে মেঝেটা, বাইরে থেকে দেখুন!’ কেন নেই এই তীর্থক্ষেত্রের রক্ষণাবেক্ষণ? তার উত্তর বড় বেদনাদায়ক। ভারাক্রান্ত মনে তাই বাইরে থেকেই দর্শন করলাম। দুই রকমের খাট, কাঠের চেয়ার, কাঠের আলমারি টেবিল ইত্যাদি সব বড় অযত্নে, বড় অবহেলায় রয়েছে, যেন এক ইতিহাসের স্মৃতিভার বহন করছে এখন, কিন্তু তা তো হওয়ার কথা নয়! প্রণাম করলাম আবার। দোতলা থেকেই সামনের বাগানটা ভালো করে দেখলাম, রয়েছে একটি গোলাঘর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সময় তার উল্লেখযোগ্য কার্যক্ষমতা থাকলেও এখন সে নিশ্চুপ। অনর্গল পাখির কলকাকলিতে এক আশ্চর্য পরিবেশ। বাড়ি থেকে একটু এগোলেই দুর্গাবাড়ি, যেখানে একসময় খুব রমরম করে দুর্গাপুজো হত, এখনও হয় তবে সেই জৌলুস নেই।

বেশ বড় জায়গা করে নিয়েছে কোদালিয়া হরনাথ বীণাপাণি লাইব্রেরি। স্থাপিত সেই ১৯২০ সালে। হরনাথ বসু ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দাদু। রয়েছে ভারত সরকারের একটি ডাক ও তার বিভাগ যা বসু পরিবারেরই আর একটি লজে। ঘুরে ঘুরে দেখতে বড় ভালো লাগে, কথা বলতে মোটেই মন চায় না। কানে যেন ভেসে আসে সেই বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ – ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’ বা ‘জয় হিন্দ’। ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সব তীর্থক্ষেত্রেই বারবার যাওয়া উচিৎ আমাদের প্রতিটি ভারতবাসীর। প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করা উচিৎ তাঁদের, যাঁদের জন্য আজ আমরা স্বাধীন, যাঁদের জন্য পরাধীন ভারতের লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি আমাদের। আর সেই সব বীর যোদ্ধারা যেখানে বাস করেছেন বা পায়ের ধুলো রেখেছেন সেই জায়গা হোক আমাদের মনের মন্দির, আমাদের পুণ্যভূমি। তাই ভারী অন্যরকম এক বিরল পাওনা মনে হয়েছে কোদালিয়ায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বাড়িটি দেখে এসে।

ট্রেনে গেলে শিয়ালদহ থেকে দক্ষিণ শাখার ট্রেনে করে সুভাষগ্রাম স্টেশনে নেমে যেতে হয়।

সড়কপথে গেলে কোদালিয়া স্টপেজ, সেখান থেকে একটুখানি পায়ে হাঁটা পথেই এই তীর্থভূমি।

Developed by DXDasia