১৯শে মে’র প্রেক্ষাপট

বরাকের ভাষা আন্দোলনের পশ্চাতে নিহিত প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাস ও বঞ্চনার কাহিনি

অঞ্চলের মানুষজনের আকাঙ্খা, আর স্বকীয় পরিচিতির তোয়াক্কা না করে, ১৮৭৪ সালে বাংলার থেকে শ্রীহট্টকে এবং গোয়ালপাড়া জেলাকে উত্তরবঙ্গ থেকে কেটে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কেননা রেভিনিউ স্টেট হিসেবে আসাম স্বনির্ভরতা পাবে। অর্থাৎ কাল পর্যন্ত যারা বাংলার অধিবাসী ছিল নেহাৎ-ই প্রশাসনিক কারণে তারা হয়ে গেল আসামের বাসিন্দা। গোয়ালপাড়া ও শ্রীহট্ট জেলার অধিবাসী বলতে প্রায় সবাই তখন বাংলার ভাষাভাষী। আপার আসামের মটক ও মরান নামে দু’টো ক্ষুদ্র রাজ্যও ইংরেজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে শ্রীহট্ট কাছাড় আর গোয়ালপাড়া সহ গোটা ব্রহ্মপুত্র এলাকাই বৃটিশ সাম্রাজ্যের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। ১৮৩৫ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি খাসিয়া এবং জয়ন্তিয়া রাজ্যও ইংরেজের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ১৮৫৪ সালের কোনও এক সময়ে লর্ড ডালহৌসি স্বাধীন নাগারাজ্যকেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তগুলি ওপর থেকে চাপানো। মানুষের ইচ্ছা দলন করে প্রভুর সিদ্ধান্তই আজ্ঞাবহদের কাছে ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান হলেও সামাজিক বিরোধের বীজ উপ্ত হল এখানেই। বাঙালি জনসংখ্যার চাপে নিজেদের বিপদাপন্ন বোধ করল অসমীয়া জনগোষ্ঠী।

বৃটিশ সাম্রাজ্যের কুক্ষি থেকে অধীনতামুক্তির সময়ে সমস্যা দেখা দেয় শ্রীহট্ট জেলাকে নিয়ে। ১৯৪৬ সালের বৃটিশ ক্যাবিনেটের এক প্রতিনিধি দল ভারতে আসে। এবং ভারতের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাথে অনেক আলাপ আলোচনা, অনেক ঘটনার ঘনঘটার পর দেশভাগের সিদ্ধান্ত হয়। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শ্রীহট্টকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার সপক্ষে কোনও দাবি তোলেননি। কিন্তু সিলেটের মুসলীম লীগের নেতারা শ্রীহট্টকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলে। কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃত্বর এ নিয়ে কোনও মাথা ব্যাথা ছিল না।

আসামের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী চায়নি সিলেট আসামে থাক। ১৯৩৩ সালের ১৬ এপ্রিল আসাম অ্যাসোসিয়েশন-এর এক বিশেষ রাজনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, কুলধর চালিহার সভাপতিত্বে। সম্মেলনে শ্রীহট্টকে আসাম থেকে পৃথক করার দাবি করা হয়।

১৯৩৫ সালের  ৭ সেপ্টেম্বর আসাম উপত্যাকা মুসলিম পলিটিক্যাল কনফারেন্সের এক সভায় জয়ন্তিয়া পরগণা ও কাছাড় শ্রীহট্টের চা-বাগিচা অঞ্চল আসামে রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু আসাম কংগ্রেসও শ্রীহট্ট জেলাকে আসাম থেকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাইয়ের গণভোটে শ্রীহট্ট ভাগ হয়ে যায়। গণভোটের আগেই যে বিরাট মিছিল বের হয় সে মিছিলে স্লোগান ছিল, ‘ হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, সোনার সিলেট ভাঙব না’ । স্থানীয় নয় বলে চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার ছিল না। তা না হলে ভারতবর্ষের অন্য ইতিহাস লেখা হত, মানচিত্রও। দেশভাগের পর সীমান্ত নির্ধারণের জন্য যে রেডক্লিফ ভোয়োদাদ নামের কমিশন বসে তাতেও কংগ্রেস কিছু দায়সারা মামুলি বক্তব্য রেখেছিল মাত্র।

করিমগঞ্জ মহকুমা শহরের তিন থানা, বেশ কিছু চা-বাগান, বর্তমান বরাক উপত্যকা ভারতে থেকে যায়।

কিন্তু উল্লাসে ফেটে পড়েছিল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতারা। দেশভাগ ও সীমানা নির্ধারণের প্রাক মুহূর্তে আসাম জাতীয় মহাসভার প্রায় মুখপত্র, তখনকার একমাত্র ইংরেজি দৈনিক ‘আসাম ট্রিবিউন’ লিখল, য তাড়াতাড়ি সম্ভব সিলেট পাকিস্তান চলে যাবে। সেই সঙ্গে মন্তব্য ছিল-“The Assamese Public seem to feel relieved of a burden.”

সীমানা ঘোষিত হওয়ার পর আহোম জাতীয় মহাসভার চার নেতা শিলং টাইমস পত্রিকায় এক বিবৃতি ছাপে। যাতে বলা হয়, “with Sylhet joining Pakistan, Assam has grown smaller in area, but attained greater homogenecity which has promoted Assam to be free and sovereign.”

লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হল নাগা জাতিসত্তার একাংশ প্রথম থেকেই ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐক্যবদ্ধ না হওয়ার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং স্বাধীন নাগাল্যান্ডের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যায়। আজও নাগা জাতির একটি গোষ্ঠী ভারতকে বিদেশ বলেই উল্লেখ করে।

শেষ পর্যন্ত আসাম রাজ্য দাঁড়াল মূলত আহোমরাজ এলাকা, কামতারাজ এলাকা, কাছাড়ীরাজ এলাকা এবং গোয়ালপাড়া, এককালীন শ্রীহট্টের সাড়ে তিন থানা। এবং সেই সাথে ছিল গারো, খাসিয়া, জয়ন্তীয়ারাজ অঞ্চল, নাগা পাহাড়, লুসাই পাহাড় ও উত্তরপূর্ব সীমান্ত এজেন্সি। কিন্তু এর প্রেক্ষিতে বহু ভাষার, বহু ধর্মের বহু জাতিসত্তার আধিপত্য বিস্তার মোহ এবং একের পর এক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ি জনজাতির অনেকগুলো গোষ্ঠীই ভারতের অভ্যন্তরেই পৃথক রাজ্যের দাবির মাধ্যমে আসাম থেকে বেরিয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু চাপ। নির্মিত হতে থাকে আজকের আসামের অস্থিরতার প্রেক্ষাপট। প্রাক স্বাধীনতাপর্বে  আসামের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বড়দলৈ-এর ঘোষণা, “ আসাম শুধুমাত্র অসমিয়াদেরই”।

আসামের সকল সাইন বোর্ডেই অসমিয়া ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক-এই দাবির ভিত্তিতে ১৯৪৮ সালেই শুরু হয় আসামের জাতিদাঙ্গা। ১৯৫০ সালে দাবি ওঠে দেশভাগের পর আসামে আগে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আসাম থেকে তাড়াতে হবে। ১৯৫৫ সালে গোয়ালপাড়া জেলা, যা ১৮৭৪ সালে বৃটিশ উত্তরবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, তা আসামে রাখার দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। ১৯৬০ সালে ঘোষণা করা হল আসামের রাজ্যিক ভাষা হবে অসমিয়া এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে সংখ্যা গড়িষ্ঠ বাঙালি অঞ্চল। ভাষা দাঙ্গার নৃশংসতা চরমে পৌঁছয় প্রায় গোটা রাজ্য জুড়ে। বরাক উপত্যকায় তারই প্রতিবাদে গড়ে ওঠে ১৯-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। ১৯ মে, ১৯৬১, শিলচরে গুলি এবং এগারো জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে অধ্যায়ের আপাত সমাপ্তি।

Developed by DXDasia