
মিঠুন চক্রবর্তীর একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম কোনও এক কালে। সেই সাক্ষাৎকারে উনি দক্ষিণ ভারতীয় ছবির নায়িকাদের সম্বন্ধে একটা অদ্ভুত তথ্য দিয়েছিলেন। হতে পারে সেটা শ্রীদেবীকে কটাক্ষ করে। তিনি বলেছিলেন, ওঁদের যৌবন বয়সে অর্থাৎ যখন তিনি সবে মুম্বাই গেছেন তখন দক্ষিণ ভারতের মেয়েদের সেখানে একটা রমরমা শুরু হচ্ছে। সেই মেয়েদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যে সামনাসামনি দেখতে তাঁরা অতি সাধারণ কিন্তু সেজে, মেকআপ নিয়ে যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন তখন আর চেনাই যাবে না। এই ‘চেনাই যাবে না’ বাক্যটা নরম হয়ে গেল, বলতে হয় তাঁদের দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। মনে হবে এত সুন্দরীও কেউ হয়? হতে পারে?
আমার সঙ্গে অনেকেই সহমত হবেন যে ওডিসি নৃত্যের রিনা জানা (Odissi Dancer Rina Jana) অনেকটা ওই দক্ষিণী নায়িকাদের মতোই। রিনাদি দিনের আলোয় সাধারণ সরকারি চাকুরে, জামাকাপড়ের তেমন আতিশয্য নেই। যেন সরকারি স্কুলের বাংলার দিদিমণি। চশমা-পরা নিবিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ওই রিনাদিই যখন তাঁর ‘পেটেন্ট’ সাদা-কালো ওডিসি কস্টিউমটা পরে মঞ্চে দাঁড়াবেন আর মুখে পড়বে অপার্থিব আলো, তখন যে-কোনও দর্শক সে সৌন্দর্যে বিবশ হয়ে যাবে। নাচের জগতে রিনাদির চরম শত্রুও পেছনে একটা কথাই বলে থাকে- রিনাদি মানে ওডিসি নৃত্যের ভানুরেখা গণেশন। আর ওই সৌন্দর্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হল ঘন কালো মেঘের মতো উজ্জ্বল দুটি চোখ। গানলিখিয়ে বোধহয় রিনাদির মতো কাউকে দেখেই রচনা করেছিলেন, “ওগো কাজল নয়না হরিণী/ তুমি দাও না ও দুটি আঁখি!”

রিনাদির কথা আমি প্রথম শুনি অনিন্দিতাদির মুখে। অনিন্দিতাদি গুরু গিরিধারী নায়েকের প্রথমদিকের শিষ্যা। অনিন্দিতাদির কাছে আমি ছোটোবেলায় ওডিসির পাঠ নিয়েছি। খুব ভালো শেখাতেন অনিন্দিতাদি আর তেমন ওঁর ব্যক্তিত্ব। কোনও ছাত্রছাত্রী সারা বছর নিয়মিত না শিখলে অনিন্দিতাদি তাকে পরীক্ষায় বসতেই দিত না। আর নেচে অনিন্দিতাদিকে খুশি করা যেত না। যতই আমরা পরিশ্রম করতাম না কেন অনিন্দিতাদি একটাই কথা বলতেন, ‘আরও প্র্যাকটিস করতে হবে!’ এহেন অনিন্দিতাদি যখন শ্রদ্ধার সঙ্গে রিনাদির নামোচ্চারণ করতেন আর ওঁর চোখগুলো চিকচিক করে উঠত, আমরা রিনাদির একটা ছবি এঁকে নিতাম নিজেদের মনে। কিন্তু ক্যালকাটা স্কুল অফ মিউজিকে এক অনুষ্ঠানে রিনাদিকে প্রথম যেদিন দেখি, তার সঙ্গে আমাদের মনে আঁকা ছবিটা মেলাতে পারি না। ওই যে বলেছি রিনাদি সাধারণত খুব সাধারণ শুধু ওই ঘনকালো চোখ দুটো বাদে। সেবার ক্যালকাটা স্কুল অফ মিউজিকে রিনাদির দুই ছাত্রছাত্রী ‘বটু’ নেচেছিল। কী তৈরি দুটি ছেলেমেয়ে!
রিনাদি দিনের আলোয় সাধারণ সরকারি চাকুরে, জামাকাপড়ের তেমন আতিশয্য নেই। যেন সরকারি স্কুলের বাংলার দিদিমণি। চশমা-পরা নিবিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ওই রিনাদিই যখন তাঁর ‘পেটেন্ট’ সাদা-কালো ওডিসি কস্টিউমটা পরে মঞ্চে দাঁড়াবেন আর মুখে পড়বে অপার্থিব আলো, তখন যে-কোনও দর্শক সে সৌন্দর্যে বিবশ হয়ে যাবে।

এরপর রিনাদিকে দেখি মঞ্চে। ওডিসি ডান্সার্স ফোরামের অনুষ্ঠানে। রিনাদি সেবার খাম্বাজ পল্লবী নাচবেন। খাম্বাজ পল্লবী ওডিসি নৃত্যের কঠিনতর পদগুলির একটি। যেমন পায়ের ঘন ঘন কাজ, বিশ্রামহীন চলাফেরা তেমন তালের চড়াই-উৎরাই; গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের অনন্য সৃষ্টি কিন্তু ভীষণই খটমট। তাও রিনাদি তো রিনাদিই! কী অপূর্ব একেকটা হাত-পায়ের কাজ তাঁর! কী অভিব্যক্তি! কী সূক্ষ্ম তাল-জ্ঞান! আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছি রিনাদি মঞ্চে কেমন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের পলক পড়ছে না। কিন্তু দশ-বারো মিনিট চলবার পর হঠাৎ সিডি গেল বন্ধ হয়ে। বিচ্ছিরি রকমের ছন্দপতন। রিনাদির ছাত্রছাত্রীরা অডিওরুমে দুদ্দাড় করে ছুটে গেলেও কোনওভাবেই আর সিডি চালানো গেল না। তাহলে উপায়? তবে কি বরিষ্ঠ শিল্পীকে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে হবে? সেটা হলে মারাত্মক কষ্ট পাবেন রিনাদি। আমরা প্রমাদ গুনলাম। আমি বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি বড়ো শিল্পীর পরিচয় অন্য শিল্পীদের প্রতি তাঁর সাহচর্য ও ব্যবহারে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সুপুত্র গুরু রতিকান্ত মহাপাত্র বোধহয় সেই মানেরই শিল্পী। সবাইকে অবাক করে তিনি প্রথম সারি থেকে খাম্বাজ পল্লবীর বোল বলা শুরু করলেন হঠাৎ। সমগ্র আইসিসিআর হল নিশ্চুপ। শিবুদা (রতিকান্ত মহাপাত্র) ক্রমাগত বোল বলে চলেছেন আর রিনাদি নেচে চলেছেন। সে কী দৃশ্য! এমন স্বর্গীয় নৃত্যদৃশ্য কলকাতা সত্যিই খুব কম দেখেছে। যেন বড়োপর্দার সিনেমা চলল এতক্ষণ। রিনাদি আর শিবুদা খাম্বাজ শেষ করতেই হাততালিতে হলের সমস্ত দিক ভেসে গেল। আনন্দে আপ্লুত হল সকলে। আজও গর্ব বোধ করি এমন মানের একটি অনুষ্ঠানের সাক্ষ্য বহন করতে পেরে।

কিন্তু তখনও আমার রিনাদির সঙ্গে তেমন আলাপ জমেনি। তার কয়েক বছর পর আমাদের এক অনুষ্ঠানে রিনাদিকে আমন্ত্রণ জানাই আর রিনাদি সেবার ‘ব্রজ কু চোরা’ যেটি গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের আরেকটি অনন্যসাধারণ সৃষ্টি, সেটি অভিনয় করে দেখায়। মাতা যশোদার কানুর প্রতি যে বাৎসল্য তা রিনাদি যে কী মায়াময় ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তোলে সে যে না দেখেছে তাকে বোঝানো মুশকিল। সেদিন থেকে রিনাদির সঙ্গে আমার শ্রদ্ধামিশ্রিত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আমি সেটাই চেয়েছিলাম কারণ রিনাদির মতো পণ্ডিত নৃত্যশিল্পীর সাহচর্য মানে নৃত্যশিল্পকেই অন্য দৃষ্টিতে দেখতে চাওয়া ও পাওয়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ। কিন্তু যত রিনাদির কাছাকাছি যাই তত তাঁর জীবন সংগ্রামের বেদনাবিধুর ছবি মাঝে ভেসে ওঠে। মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত জেলা থেকে যে মেয়েটি কলকাতায় পড়তে এল, যে মেয়েটি আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে পড়ালেখা করল, যে মেয়েটি তখনও কথকনৃত্য অধ্যয়ন করত আর যে মেয়েটির পদাতিকে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সঙ্গে একদিন দেখা হয়ে গেল আর গুরুর সান্নিধ্যে এসে যার জীবন গেল বদলে, সেই মেয়েটির আজকের রিনা জানা হবার পথটা খুবই কষ্টের, যুদ্ধের। আসলে রিনাদি বোধহয় একটা প্রতীক মাত্র। বাংলার যে-কোনও ছেলেমেয়েরই কোনও রকম সরকারি-বেসরকারি সাহায্য বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আজও শাস্ত্রীয় নৃত্য অধ্যয়ন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া একটা অসম্ভব অসম লড়াই। কিন্তু সেটাই তো হয়। তার সঙ্গে যদি দারিদ্র্য থাকে তবে সে সংগ্রাম আরও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। পরিবারের মুখ চেয়ে সেই ছেলেমেয়েগুলোকেই একটা চাকরি করতে হয় কিন্তু মন পড়ে থাকে নাচে। কাউকে সংসারে প্রবেশ করতে হয় নৃত্যচর্চার সুতো হয়ে পড়ে হালকা। তার ওপর বাঙালি সমাজে নাচ শেখার প্রতি নানা টিকা-টিপ্পনি তো আছেই। রিনাদিকেও সরকারি চাকরি করতে হয়েছে বহু বছর যে চাকরির সঙ্গে নৃত্যের বিশেষত ওডিসির যোগ সামান্যই। অথচ রিনাদি নাচ চালিয়ে গেছে নিরলস ভঙ্গিমায়। নিজেকে এতটুকু ক্লান্ত হবার সময় দেয়নি। সে-কারণেই তো রিনা জানার নাম ভারত সরকারের আইসিসিআর শিল্পী তালিকা-য় ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ বিভাগে আজও জ্বলজ্বল করে। রিনাদির এই সাফল্য বাংলার গর্ব।
এখন রিনাদিকে ফেসবুকের পাতায় দেখি। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের ছবি শেয়ার করছেন রিনাদি। অথবা শান্তিনিকেতনে তাঁর ঝুমুর বাড়িতে এলাকার পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের নাচ শেখাচ্ছেন। কলকাতায় নানা রকম শিল্পীদের নিয়ে কত রকম ওয়ার্কশপ সংগঠিত করছে রিনাদি কিংবা নিজেও এখনও ওডিসি করছেন কোনও মঞ্চে। সেইসব ছবিতে রিনাদি কী সুন্দর চুল ছেড়ে রাখেন, ওই গভীর দুটো চোখে কাজল পরে আর আমরা মুগ্ধ হতে থাকি ওডিসি নৃত্যের রেখাকে দেখে। মনে মনে বলি- “আপ কি আঁখো মে কুছ ম্যাহেকে হুয়ে সে রাজ হ্যায়/ আপ সে ভি খুবসুরত আপ কে আন্দাজ হ্যায়!…”
চলবে…
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।
